ঝড়ের উত্তাল দাপটে জাহাজটা কেঁপে কেঁপে উঠছে বারংবার। চারʼপাশে কোনো কিনারা কোনো চর দেখা যাচ্ছেনা; বিদ্যুতের উদ্যত শিখা আকাশটাকে চিরে দিচ্ছে ফালা ফালা করে। অন্ধকারে বিদ্যুতের ঝলকে মাঝে মাঝে দৃশ্যমান উঠছে জাহাজটার নাম, ঈউনিকর্ণ! জাহাজের নাবিক, খালাসিরা পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে; চেহারা আর পোশাক দেখলেই বোঝা যায় এরা পর্টুগীজ জলদস্যু। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করোটি পতাকাটা জাহাজের মাথায় তখনো নির্লজ্জের মতো উড়ছিলো; দুজন খালাসি একটানা জল ছেঁচে ফেলছে। ক্যাপ্টেন চিৎকার করে বললেন, "ঝড়ের ধাক্কায় জাহাজ ডুবে যাবে; অপ্রয়োজনীয় জিনিষ ফেলে দাও সমুদ্রে...... এক্ষুণি!!" দলে দলে টেবিল চেয়ার বাক্স সব সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করলো খালাসিরা। এক একটা পাগলাটে ঢেউ এর ধাক্কায় সজোরে উল্টে আসছিলো ঈউনিকর্ণ! অভিজ্ঞ নাবিক বুঝলেন; আর বেশিক্ষণ বাঁচা যাবেনা। তিনি ছুটে বেড়িয়ে এলেন তাঁর ঘর থেকে; চিৎকার করে ডাকলেন, "ফ্র্যা--ন্সি--স!!" পরক্ষণেই বিশাল একটা পাহাড়ের মতো অন্ধকারকে আরো অন্ধকার করে একটা ছায়ামূর্তি নেমে এলো দড়ির সিঁড়ি বেয়ে। পরণে আপাদমস্তক জলদস্যুর পোশাক; কালো কাপড়ে একটি চোখ ঢাকা, বোঝাই যায় ওই কালো কাপড়ের নিচে যেখানে একটা চোখ থাকার কথা সেখানে আছে শুধু কালো গহ্বর। তবে সেই চোখটা কেমন ছিলো বোঝা যায় অক্ষত চোখটা দেখে; একটা সরু বাজপাখির মতো ক্রুর চোখ। মুখে লালদাড়ি, বিশাল পাথরের মতো বুক। এই মানুষটা যে এই জলদস্যুদের সর্দার, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। জীবন্ত বিভীষিকার মতো মানুষটা জলদগম্ভীর স্বরে বললো, "কী ব্যাপার কাপ্তান? কি বুঝছো?" ক্যাপ্টেন লোকটি ইহুদি, তিনি বললেন, "ফ্র্যান্সিস, পরমপিতা যিশুর নাম করো; আমরা কেউ আর বেশিক্ষণ বাঁচবোনা!" ফ্র্যান্সিস হিংস্র দাঁত বের করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "মানে? এই সামান্য ঝড়ের তুমি মোকাবিলা করতে পারবেনা কাপ্তান?" ক্যাপ্টেন হাতজোড় করে বললো, "ফ্র্যান্সিস; অসম্ভব! জাহাজের মাস্ত্তল ভেঙেছে, বিভিন্ন জায়গায় ফুটো হয়েছে। জল ঢুকছে ক্রমাগত, এর পরেও বাঁচার আশা করা অসম্ভব!" ফ্র্যান্সিস দানবের মতো বিরাট বুকে চাপড় মেরে গর্জন করে উঠলো, "কোনো উপায় কি নেই কাপ্তান? বলো!!! কোনো উপায় নেই?" ক্যাপ্টেন বললেন, "হ্যাঁ, একটা শেষ চেষ্টা করে দেখতে পারি ফ্র্যান্সিস; যদি রাজি থাকো।" ফ্র্যান্সিস চিৎকার করে উঠলো, "কি কি কি??? কি উপায়?" ক্যাপ্টেন কাঁপা গলায় বললেন, "লুঠ করা ধন সম্পত্তির বাক্সগুলো সমুদ্রে ফেলে দিলে কিছুটা ভার কমতেও পারে জাহাজের....!" "কা-প্তা-ন!"ক্যাপ্টেনের কলার চেপে ধরে গর্জন করে উঠলো ফ্র্যান্সিস। ভয়ে চমকে উঠলেন প্রৌড় ক্যাপ্টেন, টাকমাথা মোটাসোটা মানুষ! কপালের ঘাম মুছে বললেন, "ফ্র্যা-ফ্ফ্র্যান্সি-স! কেউ যদি নাই বাঁচলাম, অর্থের লোভ করে কি হবে?" ফ্র্যান্সিস ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টি, সমুদ্রের গর্জনের উপরে হিংস্র গর্জন করে উঠলো, "আমার সাত বছরের লুঠ করা বিরাট খাজ়ানা!! ফেলে দেবো? সমুদ্রে ফেলে দেবো আমি? কক্ষণো না! এই খাজ়ানা যেখানে.....আমি সেখানে!! শুনে রাখো কাপ্তান, যদি মরি.....ওই খাজ়ানা বুকে নিয়ে মরবো!ʼʼ এই সময় একজন কাফ্রি জলদস্যু খালাসি ছুটে এলো, কানে মাকড়ি, সাদা হাতকাটা বেনিয়ান পরিহিত, কষ্ঠি পাথরের মতো শরীর! লোকটি হাতজোড় করে চিৎকার করে উঠলো, "হুজুর.....সব্বোনাশ হয়েছে হুজুর!" ফ্র্যান্সিস আর ক্যাপ্টেন দুʼজনেই একসাথে বললেন, "কী-ক্কী? কী হয়েছে মবোগো?" মবোগো নামের লোকটি বললো, "জাহাজের একদিক ধ্বসে পড়েছে হুজুর...." কথাটা শেষ হলোনা; বিরাট একটা ঢেউ আছড়ে পড়ে পুরো জাহাজকেই গিলে নিলো এক নিমেষে। সমস্ত দুর্যোগের শব্দকে ছাপিয়ে অজস্র অসহায় আর্ত মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিলো তখনো। ১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের সেই দিনটায় এক ঐতিহাসিক সলিল সমাধি হয়েছিলো আটলান্টিক মহাসাগরে!
টিভির পর্দায় একটি স্মার্ট আইরিশ মেয়ে বলছিলো খবরটাঃ ʼগত ১৮ই অগস্ট, ২০১৫ একটি অভিযাত্রী জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগরের বুক থেকে নিরুদ্দিষ্ট। জাহাজটির কোনো হদিশই আর পাওয়া যায়নি। এর আগে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী এভাবেই আরেকটি অভিযাত্রী জাহাজও আটলান্টিক মহাসাগরের বুক থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছিলো। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, দুটি জাহাজই তাদের শেষ তারে জানিয়েছে তারা একটা ভগ্ন প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পেয়েছে সমুদ্রের মাঝখানে। অদ্ভুত ভাবে সেই ধ্বংসাবশেষ ডুবোপাহাড়ের মতো সমুদ্রের বুকের উপর দাঁড়িয়েছিলো।ʼএই অবধী শুনে চুরুটটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে প্রফেসর রোজ়ারিও বললেন, "জাহাজের ধ্বংসাবশেষ? ঈউনিকর্ণ নয় তো?" পাশের সোফায় বসেছিলেন তাঁর স্ত্রী ডরোথি, তিনি বললেন, "ঈউনিকর্ণ? সেটা কী রোজ়ারিও?" প্রফেসর সোফায় মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চুরুটে একটা বড় টান দিয়ে বললেন, "আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এ এক বহুদিনের কিংবদন্তী ডরোথি। কেউ বলে প্রবাদ, কেউ বলে মরীচিকা; অনেকটা বারমুডা ট্র্যাঙ্গলের মতো।" প্রফেসর সোফা ছেড়ে উঠে ওঁর লাইব্রেরী ঘরে ঢুকে গেলেন, ডরোথি জানেন এই মানুষটাকে; একবার একটা বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করলে সহজে ছাড়বেননা। প্রফেসর রোজারিও আসলে একজন ইতিহাসবীদ, ইতিহাসের যে কোনো ঘটনা ওঁর নখদর্পণে। ওঁর ইতিহাসের যেকোনো ঘটনার প্রতি পাগলাটে আগ্রহের জন্য অনেকে ওঁকে বলে ʼপাগলা প্রফেসর।ʼ ডরোথিও সোফা ছেড়ে উঠে লাইব্রেরী ঘরে গিয়ে দেখলেন টেবিলে একটা পুরোনো জীর্ণ পৃষ্ঠার বইতে একাগ্রে মনোনিবেশ করেছেন প্রফেসর। ডরোথি বললেন, "রোজ়ারিও, ব্যাপারটা কি বললেনা?" প্রফেসর সিগারে লম্বাটে দুটো টান দিয়ে বললেন, "ষোলোশো ছাপ্পান্ন খ্রিস্টাব্দে আটলান্টিক মহাসাগরে এক প্রবল ঝড়ে ঈউনিকর্ণ নামে একটি জলদস্যু জাহাজ ডুবে গেছিলো। সেই জাহাজ ছিলো এক দুর্ধর্ষ পর্টুগীজ জলদস্যু ফ্র্যান্সিস ডেসার্টের। এক সময় তার অত্যাচারে বহু বানিজ্যিক জাহাজ সর্বস্বান্ত হয়েছিলো। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে চলমান বিভীষিকার মতো ঘুরে বেড়াতো ফ্র্যান্সিস। তবে এরপর থেকে বহুবার বহু জাহাজ ওই ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অদ্ভুত ভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। আমার কাছে প্রচুর পেপার কাটিং আছে। প্রথম ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে একটা অভিযাত্রী জাহাজ হারিয়ে গেছিলো। তখন সেভাবে হইচই হয়নি; তারপরে ১৭১৪, ১৭৩২, ১৭৪৫ এ ও একই ঘটনা। শেষ তারে জানাচ্ছে তারা একটা জাহাজের ধ্বংসাবশেষের কাছে। অবশেষে আরো বাইশটি একই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে ১৮৬৭ তে অধ্যাপক ফ্রেডরিক একহার্টের অভিযাত্রী জাহাজও যখন একই ভাবে হারিয়ে যায়, তখন খুব হইচই হয়েছিলো। একহার্টের শেষ তারে জানা গেছিলো জাহাজের ধ্বংসাবশেষের গায়ে অস্পষ্ট লেখা ছিলো ʼঈউনিকর্ণ।ʼ ওই সময়ই বেশ কয়েকজন গবেষক, ইতিহাসবিদ প্রচুর গবেষণা করে ফ্র্যান্সিসের ঈউনিকর্ণের যুক্তি খাড়া করেন। কিন্তু এসবই তো কানামামার মতো....!তবে...." প্রফেসর থামলেন, বৃদ্ধ আর্দালি কফি আর টোস্ট এনেছে। ডরোথি উঠে গিয়ে ফায়ার প্লেসের আগুনটা একটু উসকে দিলেন। প্রফেসর আবার শুরু করলেন কফিতে চুমুক দিয়ে, "ডরোথি, আমার এই বিষয়ে একটা অভিজ্ঞতা আছে। প্রায় বছর দশেক আগে আমি এরিজ়োনার একটা জাহাজঘাটায় এক বদ্ধ উন্মাদের দেখা পেয়েছিলাম। সেও ক্যাপ্টেন ছিলো এক জাহাজের, তার জাহাজও হয়তো কখনো ঈউনিকর্ণের চক্রব্যুহে পড়েছিলো। ভাগ্যের ফেরে শুধু সে ফিরে এসেছিলো কোনোভাবে....! একমুখ সাদা দাড়ি, মাথায় নাবিকের টুপি, পরণে শতচ্ছিন্ন পোশাক। লোকটার গলা আজো আমার কানে বাজে, ও চেঁচিয়ে বলছিলো, ʼঈউনিকর্ণের কাছে কেউ যাসনা! কেউ না! ভুত.....ভুত! ফ্র্যান্সিসের ভুত!ʼ লোকটি এই হাসছে হা হা করে, আবার পরক্ষণেই হাউ হাউ করে কাঁদছে। কিন্তু পাগলের কথা কে শুনবে?" একটানা কথা বলে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রফেসর। ডরোথি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "ঈউনিকর্ণের সঠিক ভেন্যু কি কেউ জানেনা?" প্রফেসর দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন, "নাঃ! তবে হিসেব মতো জায়গাটা গ্রিনিচ মধ্যরেখা অনুসারে পশ্চিম দিকে। কারণ; ওইদিকেই ঘটনাটা প্রত্যেকবার ঘটেছে।" ডরোথি বললেন, "কিন্তু......এর কি কোনো প্রতিকার নেই রোজারিও? চিরকালই কয়েকটা নির্দোষ প্রাণ এভাবে এই চক্রব্যুহে শেষ হয়ে যাবে?" প্রফেসার ভ্রু কুঁচকে বললেন, "কে জানে!" ডরোথি একমুহুর্ত ভেবে নড়েচড়ে বসে বললেন, "আচ্ছা রোজ়ারিও, তোমার সূদুর ভারতবর্ষে সিক্রেট এজেন্সি 'কল্কি'র এসিপি অনঙ্গদেব কিছু করতে পারেননা?" প্রফেসারের চোখ মুহুর্তে চক্ চক্ করে উঠলো; তিনি সোজা হয়ে বসে একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, "ঠি-ঠিক বলেছো ডরোথি। করলে অনঙ্গই এখন কিছু করতে পারে। অনঙ্গ.....অনঙ্গদেব রয়!"
ঘরটার দেওয়াল অনেকটা আয়নার মতো। চারদিকের দেওয়ালের কাঁচে ভেতরের ছায়া পড়বে, কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কিছু দেখা যাবেনা; ঘষা কাঁচ। এই চৌকো ন্যানো লেন্সার ঘরে একটা কাঠের টেবিলের পেছনে চেয়ারে যে মানুষটা বসে আছেন, তাঁর বয়স পঞ্চাশ বাহান্ন; মাথার চুলে রুপোলি ছোঁয়া, চোখে স্টিলের ফ্রেম চশমা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো তাঁর পরণের স্যুট স্টেইনলেস স্টিলে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি, কোনো ভাঁজ নেই। তাঁর সামনের টেবিলে একটা ল্যাপটপ, একটা আইট্যাব, একটা টেলিফোন। এই ব্যাক্তির পরিচয় বোঝা যায় স্যুটের ডান বুকের লোগো দেখে, এসিপি অফ 'কল্কি'। এঁর নাম অনঙ্গদেব রায়; সিক্রেট এজেন্সি 'কল্কি'র এসিপি। দিল্লির সিবিআইও বিশেষ রহস্য সমাধানে এঁর সাহায্য নেন। অনঙ্গদেব রিসিভার তুলে নিয়ে তিনটি নম্বর ডায়াল করলেন; রিং হওয়ার আগেই ওপাশে একটি মেয়ের গলা, "স্যার!" অনঙ্গ বললেন, "এজেন্ট জিরো জিরো এইট;নাওউ।" মেয়েটি ওপারে বললো, "ইয়েস স্যাʼর।" রিসিভার নামিয়ে রাখলেন অনঙ্গ। মিনিট পাঁচেক বাদেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা তিন ডিজিটের নাম্বার ফুটে উঠলো, ʼজিরো জিরো এইট।ʼ অনঙ্গদেব পরক্ষণেই আরেকটা তিন ডিজিটের নম্বর প্রেস করলেন; সাথেসাথে মিরর ডোর খুলে গেলো দুভাগে, আর ঘরে এসে ঢুকলো যে যুবকটি; তার ছিপছিপে লম্বা চেহারা, চোখে ব্ল্যাক সানগ্লাস, পরণে ন্যানো মেটালে তৈরী ফুলস্লিভ ব্ল্যাক কস্টিউম, হাতে মেটালের গ্লাভস। গোঁফ দাড়ি কামানো, ব্যাকব্রাশ চুল, পায়ে হাঁটু অবধী জুতো। অনঙ্গদেব বললেন, "এসো ক্যাপ্টেন নীল। তোমার জন্য একটা কাজ আছে। দাঁড়িয়ে কেন? বোসো।" ক্যাপ্টেন মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বললো, "বলুন স্যার, কি করতে হবে?" ফোল্ডিং চেয়ারে হেলান দিয়ে সোনার হোল্ডে সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে অনঙ্গ বললেন, "গতকাল আমার বন্ধু প্রফেসর রোজ়ারিও আমাকে একটা অদ্ভুত ঘটনা মেল করে জানালো। আটলান্টিক মহাসাগরে একটা অদ্ভুত ঘটনা দুশো বছর ধরে ঘটে চলেছে; যার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজো পাওয়া যায়নি।" অনঙ্গদেব ক্যাপ্টেন নীলকে যা বললেন, তা আমরা আগেই শুনেছি প্রফেসর রোজারিওর মুখে। ক্যাপ্টেন সব শুনে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভেবে বললো, "আমি কি করবো বলুন?" অনঙ্গ বললেন, "তুমি কালই ইভনিং ফ্লাইটে এরিজ়োনা চলে যাও, ওখানে জাহাজঘাটায় হার্বার মাস্টারের কাছে খবর নাও কোন জাহাজ আটলান্টিকে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে। যদি কেউ নিজস্ব বোট নিয়ে ওদিকে যায়, তাদের কাছে লিফট নেওয়া সবচেয়ে ভালো। যেমন মৎসজীবী বা ওইরকম কিছু; তোমার পরিচয় তুমি ফটোগ্রাফার, ফ্রিল্যান্স। এরিজোনার বিভিন্ন পত্রিকায় তোমার তোলা ফটো বেরোয়।" ক্যাপ্টেন নীল উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বললো, "ফটোটা এমনিতে খুব একটা খারাপ তুলিনা। ওকে স্যার, আই উইল ট্রাই মাই লেভেল বেস্ট।"
মেঘমুক্ত আকাশ, বেশ পরিষ্কার দিন। নির্বিঘ্ন ছন্দে আটলান্টিকের ঢেউয়ের ফেনা কেটে এগিয়ে যাচ্ছিলো ক্রুজ বা প্রাইভেট জাহাজটা। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন নীল; এই ক্রুজটা পশ্চিম সমুদ্রে কোনো এক্সপিডিশনে যাচ্ছিলো, নীলকে লিফ্ট দিয়েছেন কাপ্তান। নীল ডেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলো নীলচে ছাইরঙ মেশানো ঢেউগুলো ফেনা হয়ে আছড়ে পড়ছে জাহাজটার গায়ে, যেন ক্রুজটার পায়ে মাথা খুঁড়ছে ঢেউগুলো। মাথার ওপর কয়েকটা সীগাল ক্রমাগতই উড়ছে! নীলের পরিচয়, ও একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার; এরিজোনার বিখ্যাত দুটি পত্রিকায় ওর তোলা ফটো নিয়মিত ছাপা হয়। বলা বাহুল্য, গলায় ব্যান্ডে ঝোলানো ক্যাম আর পরণের ন্যানো মেটাল কস্টিউমের ওপর জ্যাকেট চাপাতে হয়েছে। তবুও হাতের মেটাল গ্লাভস আর সর্বক্ষণ চোখে সানগ্লাস দৃষ্টি আকর্ষণ করেই। অনঙ্গদেব বলেন, "চোখ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়; সিক্রেট এজেন্টের উচিত সবসময় চোখ ঢেকে রাখা।" তাই তাঁর কথায় আত্মগোপন করেই আছে নীল। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কন্ঠস্বরে চমক ভাঙলো নীলের, "হ্যাল্লো মি.নীল।" নীল পেছন ফিরে দেখলো এই জাহাজের ক্যাপ্টেন; প্রৌঢ় মানুষ, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, বেঁটে খাটো চেহারা, সোনালি চুল। ক্যাপ্টেন বললেন, "মি.নীল, আপনাকে আমাদের ক্রুজের মালিক ব্রেকফার্স্টে ইনভাইট করেছেন। আসুন প্লিজ!" নীল হেসে বললো, "ওঃ, শিওর; চলুন।" ব্রেকফার্স্ট টেবিলে তিনজনের সাথে দেখা হলো, ক্যাপ্টেন বললেন, "আলাপ করিয়ে দিই, ইনি এই ক্রুজের কমান্ডার ব্র্যান্ডন, আর ইনি ওঁর সহকারী এক্সেল। আর....ইনি হলেন ব্র্যান্ডনের বিশেষ বন্ধু ইয়ার হুসেন।" নীল দক্ষ চোখে জরিপ করছিল তিনজনকে। ব্র্যান্ডনের ছোটো খাটো একটা পাহাড়ের মতো চেহারা, ন্যাড়া মাথা, থুতনিতে চৌকোনা দাড়ি, কালো স্লিভলেস জ্যাকেট আর কালো ক্লথ প্যান্ট পরণে, পায়ে হাঁটু অবধী জুতো, আর একটা চোখ.....কালো কাপড়ে ঢাকা। ঈগল পাখির মতো তীক্ষ্ম এক চোখে লোকটা তাকিয়ে ছিলো নীলের দিকে। ব্র্যান্ডনের সহকারী লোকটা বেঁটে, রোগা, সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষক চেহারা নয়। তবে ইয়ার হুসেনের চেহারা দেখলেই মনে হয় লোকটা ভয়ঙ্কর; সাদা লম্বা চুলগুলো মুখের ওপর এলোমেলো পড়ে আছে। রোগা, কিন্তু বোঝা যায় বেশ শক্তিশালি, লম্বা তালঢ্যাঙা শরীর, কালো কষ্টি পাথরের মতো শরীর, চওড়া সাদা গোঁফ, ক্রুর দুটো চোখ। সাদা স্লিভলেস গেঞ্জি আর নীল জিন্স পরণে। নীল তিনজনের সাথেই করমর্দন করলো; ব্র্যান্ডন বললো, "আলাপ করে খুশি হলাম, বসুন। হুইস্কি চলবে তো?" নীল একটা চেয়ার দখল করে মৃদু হেসে বললো, "না মি.ব্র্যান্ডন, আমার পানীয়টা একটু অন্য....দুধ।" ইয়ার হুসেন বিদ্রুপের ভঙ্গিতে হেসে বললেন, "দুধ? মজার লোক তো আপনি!" নীল একবার তাঁর দিকে চেয়ে ঠান্ডা স্বরে বললো, "আপনার মনে হয় যে দুধ খাওয়াটা মজার ব্যাপার?" ইয়ার হুসেন দুʼদিকে মাথা নেড়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই ব্র্যান্ডন দুʼবার তুড়ি দিয়ে চেঁচিয়ে বললো, "ওয়েটার, একগ্লাস দুধ...এখানে।" নীল বললো, "আপনার কি ধরণের এক্সপিডিশন মি. ব্র্যান্ডন?" ব্র্যান্ডন হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো, "পশ্চিম সমুদ্রের দিকের ছোটো ছোটো দ্বীপগুলোর বালিতে শোনা যায় সোনা মিশে থাকে, আমাদের এক্সপিডিশন সেটা খুঁজতেই।" নীল বললো, "যুগ যুগ ধরে বহু জায়গার বালিতেই শুনছি সোনা মিশে থাকে, কিন্তু বাস্তবে পাওয়া যায় কি?" ইয়ার হুসেন টেবিল চাপড়ে বললো, "আলবত্ যায়। আপনি জানেন, কতবার কত ভাগ্যান্বেষী কত সোনাবেলার বালিতে সোনা পেয়ে ধনী হয়ে গেছে?" নীল দুধের গ্লাসে ছোট চুমুক দিয়ে বললো, "কিন্তু মি. হুসেন, পৃথিবীতে সত্যিই এরকম জায়গা থাকলে রাতারাতি বহু মানুষ বড়লোক হয়ে যাবে.... তাইনা?" ইয়ার হুসেন একটা মোটা চুরুট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, "বেশির ভাগ মানুষ বোকা এই দুনিয়ায়....যদি সবাই বুদ্ধিমান হতো, তাহলে তো ইয়ার হোসেনের সাথে আর পাঁচজনের তফাৎ থাকতোনা।" নীল বললো, "বেশ, তবে কি জানেন মি. হুসেন? আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে কোনো কোনো জায়গায় খুঁজলে বালির মধ্যে সোনা পাওয়া যায়, কিন্তু সারাদিন খুঁড়লে হয়তো এককণা সোনা পাওয়া যায়। সুতরাং......!" ব্র্যান্ডন এবার কঠিন স্বরে বললো, "আপনার বড় বেশি কৌতুহল মি. নীল, আপনি তো ফটো তুলতে এসেছেন! ফটো-টটো তুলুন, চলে যান। এসব ব্যাপারে নাক গলানোর কি প্রয়োজন?" নীল মৃদু হেসে দুধের গ্লাসে চুমুক দিতে যাচ্ছিলো, হঠাৎ একটা জিনিষ দেখে চমকে উঠলো.....! ব্র্যান্ডনের হাতের কবজির নীচে একটা ট্যাটু......একটা গোল বৃত্তকে ঘিরে পাঁচটা ছোটো সার্কল। ওই ট্যাটুটা তো ওর পরিচিত...ওটাতো সিং জলদস্যুদের চিহ্ন!
সমুদ্রে সন্ধ্যা আগত; জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে নীল ভাবছিলো ঈউনিকর্ণের ব্যাপারে। হিসেবমতো এরিজোনা জাহাজঘাটা থেকে গ্রিনিচ মধ্যরেখা ধরে বর্তমান জলস্থানের কাছাকাছির মধ্যেই আগের দুʼটো জাহাজ হারিয়ে গেছিলো। ডেকের ওপর একটা চেয়ারে বসে একটা কাগজের ওপর এই ভৌগোলিক হিসেবটা করছিলো ও; আর মাঝে মাঝে দুরবীন চোখে লাগিয়ে এদিক ওদিক দেখছিলো। পশ্চিম আকাশে কোনো এক অদৃশ্য ঐন্দ্রজালিক যেন অজস্র রঙের চ্ছটা ছড়িয়ে দিয়েছেন, লাল আর হলুদে যেন রঙ্গোলি চলছে; আর তার চারপাশে বেগুনি, নীল, লাল মেঘ গুলো বিভিন্ন আকার নিয়ে ঘনীভুত হচ্ছিলো, আর ঢলে পরা সুর্যের লাল কিরণ তেরচা হয়ে পড়ে সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে যেন অজস্র সোনা হীরে মুক্তো অবহেলায় ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ আকাশ থেকে। নীলের কাঁধে হঠাৎ একটা শক্ত হাতের চাপড় মারলো পেছন থেকে কেউ, "কি ফটোগ্রাফার মশাই?" নীল পেছন ফিরে চেয়ে দেখলো, ব্র্যান্ডন। ও বললো, "হুম, গুড ইভনিং।" ব্র্যান্ডন চটুল হেসে বললো, "আপনি ফটো তোলা ছেড়ে চোখে দুরবীন লাগিয়ে অত কি দেখেন ফটোগ্রাফার মশাই? আর এসব হিসেব নিকেশই বা কিসের?" নীল ব্যঙ্গটা অগ্রাহ্য করেই স্মিত হেসে বললো, "দেখছি, দুʼএকটা হাঙরের দেখা পাই কিনা। হিসেব মতো এদিকের সমুদ্রে খুব হাঙর।" ব্র্যান্ডন চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "হাঙর দেখার খুব শখ বুঝি? বড় ভয়ানক প্রাণী, ওদের মুখে পড়লে বাঁচা খুব কষ্টকর। দেখবেন; একটু সাবধানে থাকবেন! বলা তো যায়না।" কথাটা যে তীব্র শ্লেষ আর হুমকি মেশানো সেটা বুঝতেই পারলো নীল। উঠে দাঁড়িয়ে কঠিন হেসে বললো, "আপনার চিন্তা নেই মি. ব্র্যান্ডন, বিপদ নিয়ে খেলতে বেশ ভালো লাগে আমার। হাঙরের মুখে পড়লেও আত্মরক্ষা করতে আমি জানি!" ব্র্যান্ডনের ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো, নীলের কাঁধ চাপড়ে বললো, "ভালো ভালো, বেশ ভালো। আচ্ছা আসি।" হনহন করে হেঁটে নিচের কেবিনে চলে গেলো ও; নীলের ভ্রু আপনা থেকেই কুঁচকে গেলো। এদের সন্দেহ হয়েছে, আরো সতর্ক হতে হবে! আর বলা বাহুল্য, যে এরা মোটেও সুবিধের লোক নয়। কিন্তু এরা আসলে কী? নীল দুʼদিকে মাথা নাড়লো, নাঃ! পরিবেশ জটিল হয়ে যাচ্ছে ক্রমেই।
মাঝরাতে জাহাজটা হঠাৎ সজোরে দুলতে শুরু করলো। তার সাথে প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি, এক একবার মনে হচ্ছে জাহাজটা এক্ষুণি উলটে যাবে; ডুবে যাবে সমুদ্রে! কেবিনের ভেতর সচমকে ঘুম ভেঙে উঠে বসলো নীল, কেবিন থেকে ছিটকে পড়ে যাবে বুঝি এক্ষুণি। কি হলো হঠাৎ? ঝড়? দুর্যোগ? নীল কস্টিউমের ওপর একটা জ্যাকেট চাপিয়ে ছুটে বেড়িয়ে এলো ডেকে, সেখানে এখন সব্বাই জড়ো হয়েছে। ভয়ে, আতঙ্কে আর্তনাদ করছে সবাই; খালাসিরা বার বার বুকে ক্রুশচিহ্ন আঁকছে! এক একটা ঢেউয়ের ধাক্কায় উলটে আসছে জাহাজটা, সবাই কোনোভাবে দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়ার হুসেনের সাদা চুলগুলো উড়ছে পাগলাটে হাওয়ায়, কাঁপা গলায় চিৎকার করছেন তিনি, "হা আল্লাহ....! হে পয়ভর দিগারে আলম! দোয়া করো আল্লা; দোয়া করো। হা আল্লাহ বিসমিল্লা...রহিম!" সমুদ্রের গর্জন, ঝড়ের শব্দে কন্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়। কিন্তু নীল তীক্ষ্ম চোখে জরিপ করে চমকে উঠলো! আকাশে গোল চাঁদ, মেঘমুক্ত আকাশ, আর দুরের সমুদ্র শান্ত। তবে কিসের এই দুর্যোগ? নীল চিৎকার করে বললো, "ব্র্যান্ডন, এ-সব কি হচ্ছে?" ঝড়ের ঝাপটায় কথা আটকে যাচ্ছিলো মুখের! ব্র্যান্ডন মাস্তলটা ধরে কোনো ভাবে স্থির হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলো, ও চেঁচিয়ে বললো, "জা-জ্জানিনা মি.নীল! তবে জাহাজ কাপ্তেনের হাতছাড়া হয়ে গেছে।" নীলের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো; হাতছাড়া...মানে? কোনো এক অদৃশ্য শক্তি কি তবে টানছে জাহাজটাকে? অপার্থিব শক্তি? চোখে দুরবীন লাগিয়ে ক্যাপ্টেন দূরে কিছু দেখার চেষ্টা করছিলেন, হঠাৎ চরম আতঙ্কের স্বরে চিৎকার করলেন, "দুরে একটা ডুবো পাহাড়ের মতো কিছু দেখা যাচ্ছে, আর....আমাদের ক্রুজ়টা ওদিকেই এগোচ্ছে!" খালাসিরা ভয়ে চিৎকার করে উঠলো; নীল ক্যাপ্টেনের হাত থেকে দুরবীনটা নিয়ে নিজে দেখলো। হ্যাঁ, একটা কিছু দেখা যাচ্ছে বটে! অন্ধকার সমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে কিছু একটা ; তবে ডুবোপাহাড় নয়! ওটা....একটা জাহাজ। জাহাজটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে! ব্র্যান্ডন পাগলের মতো হাত-পা ছুঁড়ে বললো, "কাপ্তান....! কিছু করো কাপ্তান!" এক একটা বড় ঢেউ এসে সকলকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে একেকবার। ক্যাপ্টেন মাথার চুল মুঠো করে ধরে চেঁচালো, "কি করবো চিফ? কি করবো আমি?? ক্রুজ় অন্য কোনো অদৃশ্য শক্তি চালিত করছে।" জাহাজটা ততক্ষণে ঢেউয়ের এক একটা সজোর ধাক্কায় ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসছে দুরের জাহাজটার, দূরত্ব ক্রমেই কমছে। ক্যাপ্টেন পাগলের মতো নিজের কেবিনে গিয়ে হুইল ঘোরাতে লাগলো সজোরে...কিন্তু বিধি বাম ; জাহাজের নিয়ন্ত্রণ এখন কোনো অপার্থিব শক্তির হাতে। দেখতে দেখতে জাহাজটা এসে পড়লো ওই জাহাজটার কাছে; আর বোঝা গেল এটা একটা প্রাচিনকালের পালতোলা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। আর সাথে সাথেই এতো দুর্যোগ, এতো ঝড়, ঝঞ্ঝা সব....একনিমেষে থেমে গেলো। সমুদ্র একেবারে শান্ত! অবাক বিস্ময়ে সবাই ডেকে ছুটে এলো; একি অদ্ভুত ঘটনা? পূর্ণিমা চাঁদের আলো সরাসরি পড়েছে ওই ধ্বংসাবশেষের ওপর, আর তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে জাহাজের গায়ে খোদাই করে ডাচ ভাষায় লেখা ʼঈউনিকর্ণ।ʼ নীল চমকে উঠলো; ওর যাত্রা তবে সফল? কিন্তু ও তো নিজে আসেনি, বরং ঈউনিকর্ণ নিজেই টেনে এনেছে! তবে এর চেয়েও বড় চমক অপেক্ষা করছিল ওর জন্য; সহসা খালাসিরা চিৎকার করে উঠলো উল্লাসের স্বরে, "ঈউনিকর্ণ! ঈউনিকর্ণ!" ব্র্যান্ডন আর ইয়ার হোসেন ছুটে এলো ডেকের ধারে, নীল অবাক বিস্ময়ে দেখলো, ওদের দুʼজনের চোখে মুখে পৈশাচিক একটা উল্লাস! ব্র্যান্ডন চিৎকার করলো, "ইউরেকা! ঈশ্বর নিজে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন এখানে, চলো! বোট নামাও, এক্ষুণি।" নীল বুঝতে পারছিলো, এদের অভিসন্ধি অন্য কিছু ; আর এটাও বেশ বুঝছিলো এবার ওকে নিজে থেকে পোজিশন নিতে হবে, নইলে সমূহ বিপদ আসন্ন, আর আত্মগোপন করা অসম্ভব। ও ছুটে এসে ব্র্যান্ডনকে বললো, "কি ব্যাপার বলুনতো? এসবের মানে কি?" ইয়ার হোসেনই ব্র্যান্ডনের বদলে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "মি. ফটোগ্রাফার, আপনি কেবিনে যান। আমাদের ব্যাপারে নাক গলানোর প্রয়োজন নেই!" নীল বজ্র কঠিন স্বরে বললো, "মানে? আপনারা আসলে কে? কি করতে চান? এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষই বা কিসের?" ব্র্যান্ডন এবার সরাসরি কোমরের কাছ থেকে একটা রিভলবার বের করে নীলের কপালে ঠেকিয়ে বললো, "আমাদের ব্যাপারে নাক গলাসনা ফটোগ্রাফার, তার ফল খুব ভালো হবেনা; ভদ্র ভাবে বলছি কেবিনে চলে যা।" ক্যাপ্টেন নীল নিজের কস্টিউমের ওপর থেকে জ্যাকেটটা খুলে ফেলে আলতো হেসে বললো, "আর লুকিয়ে লাভ নেই ব্র্যান্ডন, তোমাদের পরিচয় আমি অনেক আগেই বুঝে গেছি। তুমি আর ইয়ার হোসেন সিং জলদস্যু; প্রথম দিন তোমার হাতের উল্কি দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিলো। তারপর আজ সন্ধ্যায় আমি লুকিয়ে নিচের কেবিনে ঢুকে প্রচুর আর্মস পেয়েছি।সোনাবেলা মিথ্যা গল্প!" ইয়ার হোসেন এবার চটুল হেসে বললো, "তোমার হাঙড়ের ফটো তোলাও মিথ্যা গল্প। আমারও প্রথম দিন থেকেই তোমায় সন্দেহ হয়েছিলো, তুমি টিকটিকি। কিন্তু ওহে, তোমার মতো খুদে টিকটিকি কে শায়েস্তা করতে আমার জাস্ট দুʼমিনিট লাগবে। সানতিনি, এক্সেল! ওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধো।" তিনজন খালাসি এগিয়ে এলো নীলের দিকে, কিন্তু নীলকে ওরা চেনেনা ; বিদ্যুৎ গতিতে লাফ কেটে ও সবুট এক লাথি মারলো একজনের মুখে, আরেকজনের চোয়ালে সজোরে লৌহ মুষ্টির আঘাত। এক্সেলের ঘাড় মেটালের হাতের চাপড়ে বেঁকে গেলো বোধহয়! ব্র্যান্ডন একটা লাফ দিয়ে স্প্রিং এর মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো নীলের ওপর, নীল সাথে সাথে ন্যানো টেকনোলজি গ্লাভস থেকে ২৫০ ভোল্ট রে ছাড়লো ব্র্যান্ডনের ওপর, ব্র্যান্ডন গুলি খাওয়া চড়ুইপাখির মতো ছিটকে পড়লো মাটিতে, সারা শরীরটা কেঁপে উঠলো ওর। নীল বুঝতে পারছিলনা ওর কি করা উচিত, সামনে রাইফেল উঁচিয়ে পাঁচ-ছয়জন সিং জলদস্যু; আর পাশে ইয়ার হোসেন। ও জানে, ওর মেটাল কস্টিউম ভেদ করতে পারবেনা বুলেট, কিন্তু এতোজন বন্দুকধারীর সাথে একা পেরে ওঠা....! ইয়ার হোসেন একটা মোটা চুরুটে কড়া ধোঁয়া ছেড়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বললো, "বাঃ, টিকটিকির এলেম আছে বলতে হবে, হ্যাঁ? কিন্তু আমাদের পেছনে লেগে এই জাহাজে তো এসেছো,কিন্তু ফিরবে কীকরে হে?" নীল মৃদু হেসে বললো, "আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলি, আমি অন্য একটা রহস্য সমাধানের জন্য এখানে এসেছি; আপনাদের সাথে যোগাযোগটা নেহাতই কাকতালীয়। আর দ্বিতীয়ত, একবার আমার ন্যানো টেকনোলজির পাওয়ার দেখেও কি বুঝতে পারেননি আমার ক্ষমতা....?" ইয়ার হোসেন ওর কপালে রিভলবার ঠেকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, "যদি মেরে এই সমুদ্রে তোমার লাশটা ভাসিয়ে দিই.....কিছু করতে পারবে? আমি ইয়ার হুসেন, এই জাহাজের কমান্ডার ব্ল্যাকহোল ব্র্যান্ডনের জিগরি দোস্ত; এই হাতে বাইশটা মার্ডার করেছি, কিন্তু...." কথাটা শেষ করলেননা ইয়ার হোসেন, নীলের মাথায় পেছন থেকে একটা শক্ত আঘাত লাগলো, ও অজ্ঞান হলোনা বটে; কিন্তু আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। পেছনে দাঁড়িয়ে ʼহাঃ হাঃʼ করে হাসছে ব্র্যান্ডন, বন্দুকের কুঁদোর ঘা। ইয়ার হোসেন চুরুটে লম্বা টান দিয়ে কথাটা শেষ করলো, "...তোমার জন্য অন্য ব্যবস্থা!" ব্র্যান্ডন হিসহিসে গলায় বললো, "হাঙর দেখার খুব শখ হয়েছিল না? হাঙরের সাথেই দেখা হবে!" এক্সেল নীলের হাতদুটো শক্ত করে বেঁধে দিলো দড়িতে। নীলের জ্ঞান থাকলেও মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা, তাই বাধা দেওয়ার চেষ্টাও করলোনা। চারজন বলিষ্ঠ মানুষ ধরাশায়ী নীলের শরীরটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো সমুদ্রে।
সমুদ্রে পড়েই নীলের মনে হলো ও আর বাঁচবেনা। চারদিকে সবুজ অন্ধকার, সেভাবে কিছু দেখা যায়না। প্রথমে চোখ দুটো বুজে ফেলেছিলো নীল, ওর মনে হলো এই ওর শেষ মুহূর্ত; এখান থেকে বেঁচে ফেরা এককথায় অসম্ভব। একফোঁটা দমের জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো ওর, নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলো শরীর। "তবে কি পারবোনা আর ঈউনিকর্ণের রহস্য সমাধান করতে? পারবোনা ফিরে যেতে অনঙ্গস্যারের কাছে....?" নীলের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন ছলকে উঠে বিদ্রোহ করে উঠলো; না! না! না! কক্ষণো না! ওই শয়তান গুলোকে উচিত শিক্ষা দেওয়া বাকি আছে; কিন্তু কীইবা করবে ও? নীলের এতক্ষণে মনে পড়লো ওর ন্যানো টেকনোলজির গ্লাভসের কথা, বাঁধা হাতের দড়ির ওপর ক্রমাগত শক দিতে লাগলো ও। ভেজা দড়ি....মিনিট খানেকের মধ্যেই কেটে গেলো হাত থেকে; দ্রুত সাঁতার কাটতে শুরু করলো নীল। দম ফুরিয়ে আসছে, আর বেশিক্ষণ পারা যাবেনা! কিন্তু....বিপদের এখনো অনেক বাকি ছিলো। সাঁতরে পিছন ফিরেই চমকে উঠলো ও; একটা আতঙ্কের হিমস্রোত শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে গেলো যেন! মাত্র দশহাত দুরে ও কিসের বিভীষণ মূর্তি? সাক্ষাৎ মৃত্যুদুত....বিশাল চেহারার একটা হাঙর! আরো ভয়ের কথা....দানবটা দেখতে পেয়েছে নীলʼকে ; ঘোলাটে হলুদ চোখে চেয়ে আছে ওর দিকে। আর প্রাণীটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওর দিকে...! বাঁচার সব পথই এবার বন্ধ হলো তবে? নীলের একটা বড় গুণ, ও চিরদিনই বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে। বিদ্যুৎ গতিতে কোমরবন্ধ থেকে লম্বা ঝকঝকে একটা ছুরি বের করলো নীল, ঝুঁকি একটা নিতেই হবে ; যদিও এতে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রবল! কিন্তু.....এমনিতেও তো বাঁচার সম্ভাবনা কম। নীল পাগলের মতো সাঁতরে হাঙরটার পাশ কাটিয়ে পেছন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলো; কিন্তু প্রাণীটা ওর বিশাল লেজ আছড়ে নীলকে ছিটকে দিলো দুʼহাত দুরে। নীলের হাত থেকে ছুরিটা ছিটকে গিয়ে পড়লো একটু দুরে। আর দম রাখা অসম্ভব! ওর মনে হচ্ছে বুকের ওপর যেন সাতমণ পাথর চাপিয়ে দিচ্ছে কেউ; আর পারা যাচ্ছেনা, হাঙর ওকে খেলে খাক, ওর নিস্তেজ শরীরটা ধীরে ধীরে সাদা বালির ওপর ঢলে পড়ছে ; এ যেন এক আলাদা জগৎ, পরিচিত জগতের সাথে কোনো মিল নেই! সাদা বালির ওপর খেলে বেড়াচ্ছে অসংখ্য শামুক ঝিনুক, মাথা তুলে আছে অচেনা সব উদ্ভিদ; লাল নীল সবুজ বেগুনি কত রকম ছোটো বড় পাথর ছড়িয়ে আছে। এই তবে মৃত্যু? আর খুব দুরে নেই.....ওর থেকে! ওই তো এসে গেছে বিশাল দানবটা ; লাল টকটকে জিভ, সাজানো ছুরির মতো দাঁত। হঠাৎ শরীরে যেন শেষবারের মতো অসুর শক্তি ভর করলো নীলের, হাতের ন্যানো দস্তানার তর্জনি থেকে বেড়িয়ে এলো নখের মতো সুতীক্ষ্ম সূঁচালো মেটাল পিন।সমস্ত শক্তি একজোট করে হাঙরটার দুটো চোখে দুটো হাতের দুই তর্জনি গেঁথে দিলো ও! জল তোলপাড় করে সরে গেলো অন্ধ দানবটা ; দুটো চোখের রক্তে লাল হয়ে গেলো চারদিক। দ্রুত সাঁতরে সমুদ্রের ওপরে মাথা তুলে বুক ভরে একবার দম নিলো নীল।
লাইফবোটে ওঠার সাথে সাথেই আবার শুরু হলো সেই প্রলয়ঙ্কর ঝড়। সমুদ্র ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো উত্তাল হয়ে উঠলো, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যেন বোটটা এদিক ওদিক টাল খেতে লাগলো! ইয়ার হোসেন পাগলের মতো চিৎকার করে বললো, "শুভ নয়! এ লক্ষণ শুভ নয়! ফিরে চলো ব্র্যান্ডন....ঈউনিকর্ণ অশুভ!" ব্র্যান্ডন বললো, "অসম্ভব! বোট আমাদের আয়ত্তে আর নেই; নিজের গতিতে চলছে!" এক্সেল প্রবল ভয় পাওয়া গলায় মোজেসের বাণী বিড়বিড় করছিলো, হাওয়া আর ঢেউয়ের ধাক্কায় কথা কেটে যাচ্ছে। একেকটা বিরাট ঢেউ প্রায় তিন-চার ফুট লাফিয়ে উঠছে; ব্র্যান্ডন হাঁফাচ্ছিলো ক্রমাগত, কাটা কাটা স্বরে বললো, "ইয়ার হোসেন, এসবের মানে কি? তুমি বলছো অলৌকিক, আর আমার মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বর আমাদের এভাবে ঈউনিকর্ণের কাছে পৌঁছে দিলেন। আমাদের উদ্দেশ্য তো এটাই ছিলো, ঈউনিকর্ণের খাজ়ানা লুট করা!" ইয়ার হোসেন কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনি দশ বারো হাত দুরে প্রবল শব্দ হয়ে ওঁদের ক্রুজটা বিস্ফোরণ হলো। প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো বোটের ছʼজনেই, একি অলৌকিক কান্ড? ব্র্যান্ডন হাত পা ছুঁড়ে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলো, "এক্সেল.....এক্সেল! আমার জাহাজ......! বাইশজন খালাসি....বন্দুক, রিভলবার, খাজানা.......সব শেষ!! শেষ!! উউউউফ!" ইয়ার হোসেন মাথার চুল খামচে বললো, "হা খুদা! এবার আমরা ফিরবো কিকরে? স---ব শেষ!" দুʼজন খালাসি বললো, "চিফ....এ-এসব ভূ-ভ্ভূতুড়ে কান্ড!" ততক্ষণে বোট থমকে গিয়েছে ঈউনিকর্ণের ধ্বংসাবশেষের সামনে, ব্র্যান্ডন উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "এসব কিছু পরে ভাবা যাবে। আপাতত চলো ঈউনিকর্ণের ভেতরে ; এক্ষুণি!" খালাসি তিনজন হাতজোড় করে বললো, "মাপ করুন চিফ,কিন্তু আমরা যেতে পারবোনা!" ব্র্যান্ডন ভ্রু কুঁচকে বললো, "যাবেনা.....মানে? কেন যাবেনা?" এক্সেল বললো, "চিফ...এতোকিছু ভূতুড়ে কান্ডর পর আমরা আর....ওখানে যেতে চাইনা!" ইয়ার হোসেন আঙুল উঁচিয়ে বললো, "একটা টাকাও পাবেনা তোমরা!খাজ়ানার....বখরা চাইনা? একটা টাকাও দেবোনা।" খালাসিদের একজন বললো, "বেঁচে ফিরলে তবে তো খাজ়ানা হুজুর; আমাদের দরকার নেই খাজ়ানার...! আমরা বেঁচে ফিরতে চাই।" চারজনেই বুকে ক্রুশ আঁকলো ভয়ে ভয়ে। ব্র্যান্ডন চাপা হিসহিসে গলায় বললো, "চলো ইয়ার হোসেন; আর অপেক্ষা করতে চাইনা আমি!" বোটের সাথে একগাছা মোটা দড়ি শক্ত করে বেঁধে অন্য দিক ফাঁস লাগিয়ে ব্র্যান্ডনরা ছুঁড়ে দিলো ধ্বংসাবশেষে ওপর। ঝড়ের উত্তাল দাপটে কেঁপে উঠলো বোটটা, প্রবল ঢেউ উপেক্ষা করে দড়ি ধরে লাফ দিলো ইয়ার হুসেন আর ব্র্যান্ডন; একেবারে ধ্বংস জাহাজের ডেকে গিয়ে পড়লো। সাথে সাথেই ঘটলো আরেক ভয়ানক কান্ড! একটা প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় দড়িটা ছিঁড়ে গেলো, আর ঘুর্ণিপাক দিতে দিতে তিনজন খালাসি আর এক্সেলকে নিয়ে বোটটা উল্টে গেলো উন্মত্ত সমুদ্রের বুকে। তাদের পাগলের মতো হাত-পা ছোঁড়া আর চিৎকারও ঢাকা পড়ে গেলো ওই উন্মাদ ঝড় আর সমুদ্রের গর্জনের শব্দে। ইয়ার হোসেন আর ব্র্যান্ডন হতবুদ্ধি হয়ে চিৎকার করে উঠলো ঈউনিকর্ণের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে! ব্র্যান্ডন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো ওখানেই, ফিসফিস করে বললো, "শেষ......সব শেষ!" ইয়ার হোসেন মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে বললো, "কিচ্ছু শেষ নয়; আপাতত আমরা ঈউনিকর্ণের ডেকে আছি, আজ না হলেও কাল নিশ্চয়ই কোনো জেলে নৌকা বা জাহাজ যাবে এই পথে; তারা নিশ্চয়ই সাহায্য করবে আমাদের। ওঠো ব্র্যান্ডন, ওঠো!" ব্র্যান্ডন বললো, "কিন্তু আমার লোকজন, অস্ত্র??লুট করা সম্পদ? সব তো গেলো ইয়ার হোসেন।" ইয়ার হোসেন ঠোঁটের কোণে একচিলতে হেসে বললো, "কিন্তু....খাজ়ানা! ঈউনিকর্ণের খাজ়ানা তো আছে এখনো। চলো...খুঁজে দেখি! এখনো সব শেষ হয়নি!" ব্র্যান্ডনের চোখ দুটো চক্ চক্ করে উঠলো, উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "চলো....চলো তবে!" ইয়ার হুসেন কোমরের কাছ থেকে একটা লম্বাটে সরু পাঁচসেলের টর্চ বের করে জ্বেলে বললো, "চলো ব্র্যান্ডন!" ভাঙাচোরা কাঠের ডেকে পা ফেলে এগিয়ে চললো দুʼজনে, অদ্ভুত ব্যাপার উত্তাল সমুদ্রে এতো বিরাট বিরাট ঢেউ আর ঝড়ের মধ্যেও এই কবেকার জাহাজের ধ্বংসাবশেষ অটুট দাঁড়িয়ে আছে ; একফোঁটাও নড়ছেনা। কখন যে আকাশের পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়ালে ডুবেছে ওরা দেখতে পায়নি, হঠাৎ আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধী বিদ্যুতের বেগুনি শিরা উপশিরা খেলে গেলো, আর সাথে সাথেই প্রবল ঝড়ের সাথে এবার বড় বড় ফোঁটায় নামলো বৃষ্টি। ইয়ার হোসেন নিচের ভগ্ন কেবিনের দিকে টর্চ ফেলে বললো, "ব্র্যান্ডন, চলো। এখানে তো কিছুই নেই, নীচে যাই।" এলোমেলো ঝড়ে বৃষ্টি ফোঁটা গুলো চারদিকে ছড়াচ্ছিল; কাঠের ভাঙাচোরা সিঁড়িতে পা দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো দুজনে। সামনে ইয়ার হোসেন টর্চ হাতে, পেছনে ব্র্যান্ডন রিভলবার নিয়ে। নিচের ধাপে পা রেখেই চমকে উঠলো ইয়ার হোসেন; শক্ত কিসের ওপর পা পড়লো ওর? আরেকটু হলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতো ও, টর্চ ফেলে দুজনেই আঁতকে উঠলো এবার ; একটা নরকঙ্কাল পড়ে রয়েছে কাঠের মেঝেতে। ব্র্যান্ডন ঢোঁক গিলে বললো, "মনে হচ্ছে.....এটা কোনো খালাসির কঙ্কাল এই জাহাজের; বহুদিনের!" ইয়ার হোসেন কেবিনের চারপাশে টর্চের রশ্মি ঘুরিয়ে অবাক হয়ে গেলো! চারপাশে সারী সারী কাঠের, লোহার সিন্দুক ; মেঝেতে পড়ে থাকা জীর্ণ মরচে ধরা তলোয়ার, আর.....তিন চারটি কঙ্কাল এদিক ওদিকে। ব্র্যান্ডনের চোখ দুটো পাশবিক উল্লাসে জ্বলে উঠলো, ও চিৎকার করে বললো, "ইয়ার হুসেন; আর দেরী নয়! চলো...ওইতো সিন্দুক! কতো সিন্দুক! খাজ়ানা...খাজ়ানা!!" ইয়ার হোসেন কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু হঠাৎ কেবিনের একদিকে একটা লম্বা ছায়ামূর্তি দেখতে পেলো ও; আর সাথে সাথেই প্রবল আতঙ্কে বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে একটা প্রবল আর্তনাদ করে উঠলো। অন্ধকারের মধ্যে কে ওই ছায়ামুর্তি? কালো সিল্যুয়েট...আগন্তক! ব্র্যান্ডন কাঁপা কাঁপা স্বরে চিৎকার করে উঠলো, "ইয়ার হো-হোসেন-ন্ন....!টর্চ ফেলো......জলদি!!" ইয়ার হোসেন ভুলে গিয়েছিলো টর্চের কথা; মনে পড়তেই সোজা তুলে ধরলো আগন্ত্তকের ওপর। দেখা গেলো.....আপাদমস্তক ভিজে শরীরে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপ্টেন নীল, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। ইয়ার চিৎকার করে উঠলো, "এ...এক্কি? তু-ত্তুমি!" ব্র্যান্ডন দুʼপা পিছিয়ে এসে ঢোঁক গিলে বললো, "তুমি....বেঁচে আ..আছো?" নীল ফিসফিস করে বললো, "তাইতো মনে হয়; কিন্তু তোমরা বাঁচবে তো?" স্প্রিং এর মতো লাফিয়ে উঠে ও সবুট একটা লাথি মারলো ব্র্যান্ডনের রিভলবার ধরা হাতে, রিভলবারটা ছিটকে গিয়ে পড়লো মেঝেতে; ইয়ার হোসেন বেল্টের কাছে লেদারের খাপ থেকে রিভলবার টেনে বের করতে যাচ্ছিলো, নীল ওর হাতের ন্যানো গ্লাভস থেকে মেটাল বুলেট ছুঁড়ে দিলো ইয়ার হুসেনের দিকে! বলা বাহুল্য; এটা শুধু আহত করার জন্যই ছোঁড়া, অব্যর্থ লক্ষ্য! কাঁধে লাগলো গুলিটা,ইয়ার হোসেন হাত দিয়ে কাঁধ চেপে ধরে বসে পড়লো মেঝেতে। ব্র্যান্ডন লাফ কেটে বেঁজির মতো ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো নীলের ওপর, নীল ব্র্যান্ডনের বিশাল শরীরটার ভার সহ্য করতে না পেরে পড়ে গেলো মেঝেতে ; দুজনেই গোরিলার মতো জড়াজড়ি করে গড়াচ্ছিল মেঝেতে। নীল হঠাৎ ডানহাঁটু ভাঁজ করে দ্রুত লাথি চালিয়ে দিলো ব্র্যান্ডনের তলপেটে, গুলি খাওয়া চড়ুই পাখির মতো ব্র্যান্ডন ছিটকে গিয়ে পড়লো একটু দূরে ; মুখ দিয়ে একটা চাপা আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর। নীল তড়িৎ গতিতে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গিয়ে ওর লৌহমুষ্টির আঘাত হানলো ব্র্যান্ডনের চোয়ালে, ব্র্যান্ডনের ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো। নীল হিসহিসে গলায় বললো, "দ্যাখো ব্র্যান্ডন, কার সাথে লড়তে এসেছিলে!" ততক্ষণাৎ পেছনে কাঁধের দিক থেকে ওকে জড়িয়ে ধরলো দুটো বজ্রকঠিন হাত, নীল কিছু করার আগেই ওর লম্বা ছʼফিটের শরীরটাকে ছিটকে ফেলে দিলো মেঝেতে ; নীল মাথা তুলে দেখলো ইয়ার হোসেন। ও দাঁতে দাঁত চেপে বললো, "ক্যাপ্টেন নীল কারোর ঋণ রাখেনা ইয়ার হুসেন, খুব ভুল করলে!" একটা ছোটো ডিগবাজি খেয়ে নীল ইয়ার হোসেনের থুতনিতে সবুট লাথি মেরে ওকে ছিটকে ফেলে দিলো মাটিতে; পরক্ষণেই কোমরের লেদার খাপ থেকে রিভলবার বের করে উঠে দাঁড়ালো ও। নীলের দিকে চেয়ে ঠোঁটের কোণে আলতো হেসে সাপখেলানো সুরে বললো, "এবার? হাত তোলো টিকটিকি; আর তো বাঁচার উপায় নেই!" নীল কিছু করার আগেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুরু হলো, যাতে নীলের সাথে সাথে ব্র্যান্ডন আর ইয়ার হোসেনও চমকে উঠলো। একটা মৃদু শব্দ, ঘসঘস করে হচ্ছে এই কেবিনের মধ্যেই ; ঠিক যেন কাঠের দেওয়ালে কিছু ঘষার শব্দ! ব্র্যান্ডন দ্রুত মাটি থেকে টর্চটা তুলে কাঁপা হাতে জ্বেলে চারদিকের দেওয়ালে ঘোরাতে লাগলো; সহসা পশ্চিমের দেওয়ালে আলো পড়তে একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে তিনজনেই আঁতকে উঠলো। কাঠের দেওয়ালের গায়ে তাজা রক্তে আপনা থেকেই ফুটে উঠছে লেখা, ঠিক যেন কেউ আঙুল দিয়ে লিখছে ঘেঁষটে ঘেঁষটে, মোটা হরফে ফুটে উঠলো ধীরে ধীরে, ʼDANGER'! নীল বেশ বুঝছিলো এইসব কিছু......অতিপ্রাকৃত, পৈশাচিক। কি হবে এরপরে? কি হবে?? নীল কখনো এতটা ভয় পেয়ে যায়নি বড় বড় বিপদের মুখেও, কিন্তু যে শত্রু অজ্ঞাত, যাকে ধরা ছোঁয়া যায়না, তার সাথে মোকাবিলা করা তো....অসম্ভব! ব্র্যান্ডন হঠাৎ উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠলো, "ইয়ার হোসেন....আর দেরী নয়; চলো....কাম অন!" বলতে বলতে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়লো সিন্দুকের ওপর, পাগলের মতো বহুদিনের মরচে ধরা সিন্দুকগুলো খোলার চেষ্টা করলো; কিন্তু প্রায় তিনশো বছরের বন্ধ বাক্স গুলো জ্যাম হয়ে আছে, খুললোনা সহজে! পাগলের মতো বুকে চাপড় মেরে চেঁচিয়ে উঠলো ব্র্যান্ডন, "খুলছেনা কেন?? কেন? কেন?" ইয়ার হোসেন ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো ওর পাশে, উত্তেজিত গলায় বললো, "ব্র্যান্ডন, শান্ত হও....প্লিজ়! ভুলে যেওনা...আমরা যেখানে আছি সেই জায়গাটা প্রেতপুরীর সমান।" ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ব্র্যান্ডন, এ সম্পুর্ণ অন্য মানুষের দৃষ্টি; অসংলগ্ন দৃষ্টি। ব্র্যান্ডন দাঁত কিড়মিড় করে বললো, "এই...আসবিনা! খবর্দ্দার আসবিনা এদিকে! এসব...এসব খাজ়ানা আমার; হ্যাঁ! আমার! আমার!" শেষের কথাটা বলার সময় গরিলার মতো বুকে চাপড় মারলো ও। ইয়ার হোসেন ঢোঁক গিলে ব্র্যান্ডনের একটা হাত ধরে বললো, "এ...সব কি বলছো তুমি ব্র্যান্ডন? আমরা দুʼজনে শুধু এই খাজ়ানার জন্য এতদূর ছুটে এসেছি, ভুলে গেলে?" ব্র্যান্ডন হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে একটা জান্তব গর্জন করে বললো, "নাঃ! এ খাজানা কারোর না! এ শুধু আমার...আমার।" ইয়ার হোসেন এবার ধমকের স্বরে বললো, "ব্র্যান্ডন! পাগল হয়ে গেছো তুমি....? না না! আমি অত বোকা নয়, পাগল সেজে আমাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কোরোনা! ইয়ার হোসেনের সাথে বেইমানি করে কেউ আজ অবধি পার পায়নি.....ইনশাল্লাহ!" ইয়ার হোসেনের সাথে সাথে নীলকেও চমকে দিয়ে ব্র্যান্ডন হঠাৎ কোমরের ব্যান্ড থেকে একটা বেঁটে রিভলবার বের করে ঈগলের মতো একটা চোখ সরু করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "ইয়ার হোসেন.....তোমাকে আমি আর তো সহ্য করবোনা! এই খাজ়ানা শুধু আমার, এদিকে নজর দিয়ে খুব ভুল করলে!" হতচকিত ইয়ার হোসেন হাঁ হাঁ করে উঠলো, "এ....এটা তুমি কি করছো ব্র্যন্ডন? আ..আমরা দিনের পুরোনো বন্ধু!" ব্র্যান্ডন মুচকি হেসে রিভলবারটা চেপে ধরলো ইয়ার হুসেনের কপালে, ইয়ার হোসেন হাত দুটো জড়ো করে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো, "আ..আমায় তুমি ছে..ছেড়ে দাও ব্র্যান্ড..ন্! আমার খাজানা চাইনা!!" ব্র্যান্ডন ফিসফিস করে বললো, "বিদায় বন্ধু" তারপরেই টিপে দিলো ট্রিগার, একটা ফাঁকা আওয়াজ; পরক্ষণেই বারুদের গন্ধ আর মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো ইয়ার হোসেনের রক্তাক্ত শরীর। নীল ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষণিক বিমূঢ় হয়ে পড়লো, কিন্তু পরক্ষণেই স্প্রিং এর মতো লাফিয়ে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়লো ব্র্যান্ডনের পাহাড়ের মতো শরীরটার ওপর, ব্র্যান্ডনের হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেলো রিভলবারটা ; নীলের বজ্রমুষ্টির আঘাত ক্ষিপ্র চিতাবাঘের মতো আঘাত করলো ওর চোয়ালে! ʼকোঁকʼ শব্দ করে মাটিতে কাটা কলাগাছের মতো খসে পড়লো ব্র্যান্ডন, নীল ওকে ওঠার সুযোগ না দিয়েই ন্যানো টেকনোলজির গ্লাভস থেকে ৩০০ ভোল্ট বিদ্যুৎ ছুঁড়ে দিলো ওর ওপর ; থরথর করে কেঁপে উঠলো ব্র্যান্ডনের বিরাট শরীরটা। পরক্ষণেই একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার শুরু হলো, জাহাজটা হঠাৎ সজোড়ে দুলতে শুরু করলো, ঢেউয়ের গর্জন বেড়ে উঠলো খুব বেশি; এক্ষুণি বুঝি ডুবে যাবে এই ঈউনিকর্ণ! নীল বুঝতে পারছিলো আর বেশিক্ষণ এখানে থাকা যাবেনা, কিন্তু ব্র্যান্ডনকে একা ফেলে চলে যাবে ও? ব্র্যান্ডন শত্রু হতে পারে, কাসা জলদস্যু হতে পারে, কিন্তু মানুষ তো! নীল নিজের মন স্থির করে ফেললো, ও ঠান্ডা গলায় বললো, "ব্র্যান্ডন, চলো। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে আমরা দুজনেই মারা পড়বো!" ব্র্যান্ডন প্রাণপণে চেষ্টা করছিলো সিন্দুকগুলো খোলার, হাতের লম্বাটে ছুরি দিয়ে মোচড় দিচ্ছিলো ক্রমাগত ; নীলের কথা যেন শুনতেই পেলোনা ও। নীল উত্তেজিত স্বরে বললো, "ব্র্যান্ডন, দেরী কোরোনা! বেশি দেরী হলে দুʼজনের কেউ বাঁচবোনা।" ব্র্যান্ডন সহসা ঝকঝকে ছুরিটা নীলের দিকে তুলে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলো, "ওইইই! খবর্দ্দার! তুই এক-পা ও এগোবিনা আমার খাজ়ানার দিকে.....আমার খাজ়ানা ছেড়ে আমি একʼপা ও নড়বোনা! নিপাত যা!" কথাটা শেষ করেই নীলকে ওর বলিষ্ঠ হাতে এক ধাক্কা দিলো ব্র্যান্ডন, নীল ছিটকে গিয়ে পড়লো মেঝেতে। অন্ধ রাগে নীলের মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো, কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে ব্র্যান্ডনকে আক্রমণ করার আগেই আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো; একটা মৃদু খট্ খট্ শব্দ হঠাৎ শুরু হলো কেবিনের ওপরে। নীল ধীরে ধীরে ওপরে চেয়ে যা দেখলো তাতে ভয়ে আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো; কেবিনের ওপরের কাঠের দরজা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এক অদৃশ্য অপার্থিব শক্তি খেলা করছে গোটা জাহাজে। ব্র্যান্ডন ওদিকে পাগলের মতো হামাগুড়ি দিচ্ছিলো সিন্দুকগুলোর চারপাশে; নীল বেশ বুঝতে পারলো ব্র্যান্ডনকে বাঁচানোর চেষ্টা করলে এবার ও নিজেও মরবে। একমিনিট ভেবে মন প্রস্ত্তত করে নিলো নীল, পরক্ষণে স্প্রিং এর মতো লাফ দিয়ে কাঠের সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে এলো ও; ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে কাঠের দরজাটা। একটা বদ্ধ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে ভেতরে, তার সাথে সমুদ্রের ধাক্কায় জাহাজের দুলুনি; মাথাটা হঠাৎ টলে গেলো নীলের। কোনো ভাবে সিঁড়ির পাশের দড়ির হাতল ধরে সামলে নিলো ও; কিন্তু এবার কি হবে? কেবিনের ভেতরের বাতাস ক্রমশ ভারি হয়ে আসছে; অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। ব্র্যান্ডন ততক্ষণে একটা সিন্দুকের ডালা খুলে ফেলেছে, তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে পর্টুগীজ প্রাচীন আমলের স্বর্ণমুদ্রা; ব্র্যান্ডন এক ঝটকায় যেন পাগল হয়ে গেলো। ঝাঁপিয়ে পড়লো স্বর্ণমুদ্রার সিন্দুকের ওপরে, দুʼহাতে মোহর নিয়ে পাগলের মতো ছড়াতে লাগলো চারপাশে। ঘোলাটে চোখ, জান্তব স্বরে চিৎকার করছিলো, "শাহেনশা....! আমি শাহেনশা!! এই.....এই সব মোহর আমার; আ-মা-র!" নীল বুঝতে পারছিলোনা ওর এখন কি করা উচিত; দম বন্ধ হয়ে আসছে এই বাতাসহীন কেবিনে। তবে কিছু একটা করতেই হবে, নইলে আর বেশিক্ষণ বাঁচা যাবেনা এখানে! ঠিক তক্ষুণি একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেলো চোখের পলকে; মেঝের এককোণায় পড়ে ছিলো একটা মরচে ধরা প্রাচিনকালের তলোয়ার। হঠাৎ নীল সচমকে দেখলো শূন্যে ভেসে উঠেছে তরোয়ালটা, ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ব্র্যান্ডনের দিকে। কি ঘটতে পারে এরপর, সেটা বুঝতে পেরেই একটা চাপা আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর মুখ থেকে! আর....পেছন থেকে গিয়ে ব্র্যান্ডনের পিঠে আঘাত করলো অস্ত্রটা, একটা ভোঁতা শব্দ; এঁফোড় ওঁফোড় হয়ে গেল ব্র্যান্ডনের শরীরটা! শুধু ʼওঁকʼ করে একটা ছোটো আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর মুখ থেকে ; সিন্দুকের ওপর লুটিয়ে পড়লো ব্র্যান্ডনের শরীরটা, রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ে লাল হয়ে গেলো স্বর্ণমুদ্রা গুলো। নীল আর একমুহূর্তও দেরী না করে বিদ্যুৎগতিতে বন্ধ দরজাটার কাছে এগিয়ে গেলো; এখন একটাই অস্ত্র সম্বল--ন্যানো টেক-গ্লাভস। নীল দুʼহাতের কবজির বটন প্রেস করলো; দুই তর্জনি থেকে শাঁ করে বেড়িয়ে এলো ঝকঝকে তীক্ষ্ম নখের মতো মেটাল ক্নাঈফ। সমস্ত শক্তি দিয়ে কাঠের দরজায় আঘাত করলো ও; একবার, দুʼবার, তিনবার। হয়েছে! চরচর করে পুরনো আমলের ভিজে কাঠ কেটে আসছে, নীলের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠলো! পেছনে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত, যে মৃত্যুদূত অজ্ঞাত! নীল জিবনের তারণায় সমস্ত শক্তি দিয়ে চর্ চর্ শব্দে গোল করে কেটে ফেললো কাঠের দরজার মাঝখানে অনেকটা জায়গা। দমবন্ধ করে ওপরে মাথা তুললো নীল; সমুদ্রের আঁশটে নোনা গন্ধ নাকে এলো, কানে এলো ঝড়ের ঝাপটা আর সমুদ্রের দাঁতাল শুয়োরের মতো গর্জন! বুক ভরে দম নিলো নীল; তারপর ধীরে ধীরে উঠে এলো ভাঙাচোরা ডেকে। মৃত্যুকে কি সত্যিই ফাঁকি দেওয়া যাবে? সামনে উত্তাল সমুদ্র মৃত্যুর ফাঁদের মতো বেছানো, পেছনে অজ্ঞাত এক মৃত্যুদূত! কিন্তু নীল বরাবরই বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে যে কোনো বিপদে; যে জন্য অনঙ্গদেব বলেন ওর নার্ভ বোধহয় স্টিলের তৈরি। এই মহাসমুদ্রে হাঙর কুমীরের পেটে যেমন প্রাণ যেতে পারে, তেমনই কোনো দিশা মিলতেও পারে কোথাও; কিন্তু এই অভিশপ্ত ঈউনিকর্ণে জিবনের সে আশাটুকুও নেই। সুতরাং উত্তাল সমুদ্র্রের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো নীল; আর সঙ্গে সঙ্গেই বড় বড় দুʼতিনটে ঢেউয়ের ধাক্কায় ছিটকে অনেকটা দুরে চলে এলো ও। নীল প্রবল জলোচ্ছাসে হাঁফিয়ে উঠছিলো, মাথাটা একেকবার ওপরে তুলে বড় করে দম নিয়ে নিচ্ছিলো ও; কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? শরীর ভারী হয়ে আসছে, দমও ফুরিয়ে আসছে; বুকটা বুঝি ফেটে যাবে এবার! তবুও একটা সান্ত্বনাই বোধহয় ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো এখনো; ঈউনিকর্ণ রহস্য আংশিক হলেও ভেদ হয়েছে, ঈউনিকর্ণের সঠিক অবস্থান জানা গেছে। যদি বাস্তবে কোনোভাবে ফিরে যাওয়া যায়; তাহলে সমস্ত জাহাজ ও নাবিকদের ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে দেওয়া যাবে, কিন্তু সত্যিই কী ফিরতে পারবে নীল? সাঁতার কাটার সমস্ত শক্তিও এবার হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে, ভারী হয়ে আসছে শরীর। সব দমও ফুরিয়ে গেছে, ওর অবসন্ন ক্লান্ত দেহটা ক্রমশ ডুবে যাচ্ছিলো সমুদ্রে; হঠাৎ--একটা জিনিষ দেখে চমকে উঠলো নীল! সামনে....বিশ-বাইশ হাত দুরে বালির চর দেখা যাচ্ছেনা? পূব আকাশের প্রথম ভোরের অল্প আলোয় মাত্র কুড়ি হাতের মধ্যে ওই তো কিনারা; ছোট ছোট পাহাড় ঘেরা অস্পষ্ট একটা দ্বীপ। একটা পাগল করা আনন্দ একনিমেষে জাপটে ধরলো ওকে, সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তে ফিরে এলো শরীরে। মাথাটা ওপরে তুলে একবুক দম নিয়ে সাঁতরাতে শুরু করলো নীল; সমুদ্র এখন অনেকটা শান্ত, আকাশেও মেঘ নেই বললেই চলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটা এসে পড়লো চরায়; ভিজে বালির ওপর। নীল উঠে দাঁড়ালো ধীরে ধীরে,প্রথম ভোরের সুর্যের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে দ্বীপের চারপাশে; এই দ্বীপের গাছপালা সবই ওর অচেনা, আমাদের চারপাশের সাথে কোনো মিল নেই। লাল সবুজ বেশ বড়মাপের পাতা গাছে গাছে, মোটা মোটা গাছের গা এবড়ো খেবড়ো, রুক্ষ। কোনো কোনো গাছের আবার শরীর কাঁটা কাঁটা, লালচে টিলা দ্বীপের চারপাশে ঘিরে আছে। অদ্ভুত কোমল, শান্ত লাগছে চারপাশ; পুর্ব আকাশে যেন সহস্র মণি মাণিক্যের মেলা, ঈশ্বরের এই অপার সৌন্দর্যের চেয়েও বড় কোনো সম্পদ কি আছে এই নশ্বর পৃথিবীতে? এতো সুন্দর পৃথিবীতেও মানুষ তুচ্ছ ধনরত্নের জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে! নীল টলতে টলতে এসে ভিজে নরম বালির ওপর বসে পড়লো, খুব ক্লান্ত লাগছে ওর, এখন একটা সলিড ঘুম প্রয়োজন। বালির ওপর বসে ধীরে ধীরে ঘুমের আঠা লেগে যাচ্ছিলো দুʼচোখে; হঠাৎ একটা বিকট শব্দে সচমকে উঠে দাঁড়াল নীল! শব্দটা যেন সারা দ্বীপে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠলো,বাঘের মুখে মরণ যন্ত্রণায় গোরুর আর্তনাদের মতো রক্তজল করা সেই গর্জন! পৃথিবীর কোনো প্রাণী কি পারে এমন গর্জন করতে? নীল বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে তাকালো ওপর দিকে, সেখানে তখন একটা ছোটোখাটো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে; পাখির দল ডানা ঝটপটিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে পাহাড়ের মাথায়! নীল ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়লো ক্ষণিকের জন্য; কোন প্রাণী ডেকে উঠল এমন সমস্ত চরাচর কাঁপিয়ে? কি আছে এই দ্বীপের রহস্য??
অলংকরণ- অতনু ভট্টাচার্য