একমিনিট; আপনাকে বলছি
সৃষ্টির অদ্ভুত সব রহস্য, বিস্মৃতপ্রায় প্রবীণদের, আমার বাবা মা'য়ের, কিছু আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের মুখে শোনা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও তাঁদের পরিচিতজনদের অভিজ্ঞতার গল্প নিয়ে এই লেখাটা শুরু করলাম আজ; মূলতঃ ফেসবুকের বন্ধুদের জন্যই শুধু। সবার ভাল লাগলে পরে কোনো বইতে স্থান পেতেও পারে হয়তো। কিছু গল্প আমার নিজেরও অভিজ্ঞতা, আমি যুক্তিবাদী মানুষ; তবু আমার কাছেও ঘটনাগুলো 'বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা' গোত্রের।
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-১
বিজ্ঞানের অনেক রহস্য আজ উন্মোচিত হয়েছে, তবুও মানুষ আজো রহস্যপ্রেমী; আমার কাছে রহস্য ব্যাপারটা অনেকটা শীতের ভোররাতে লেপটা ভালো করে গায়ে টেনে নেওয়ার মতো। পৃথিবী এখনও রহস্যময়, মিসির আলি বলতেন, "প্রকৃতি রহস্য চায়না''; কিন্তু আমার ধারণা প্রকৃতি সবসময় রহস্যের ঘেরাটোপে নিজেকে মুড়ে রাখতে ভালবাসে। যাকে মানুষ মাইথোলজি পুরাণ ধর্মীয় ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেয়, তার পেছনে যে কতবড় বিজ্ঞান ছিলো; তা ক'জন জানে? মানুষ যদি সেই রহস্য ভাঙার চেষ্টা করতো, তাহলে জ্ঞান বিজ্ঞানের এক নতুন দিক খুলে যেতো; কিন্তু মানুষ মাথা ঘামায়না। সিন্ধুসভ্যতা কি সেইযুগের অনভিজ্ঞ মানুষদেরই সৃষ্টি? নাকি অন্য এক জগতের দান? প্রাচীন মেলুহা, মিশর, সিন্ধুর অনেক রহস্যই বিস্মৃতির অতলে ঢাকা রয়েছে। বারমুডা ট্র্যাঙ্গল এর রহস্য কী? আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় রহস্য সৃষ্টিকর্তা। এই বিশ্বকে সৃষ্টি করলেন কে? সবকিছুর আদিতে কি ছিলো? কে প্রাণ দিলো? প্রথম শ্বাস কে দিলো? প্রকৃতি বলে উড়িয়ে দিতেই পারি, কিন্তু.....তাতে খটকাটা কমেনা; বরং বাড়ে। একাধিক আবরণ বিশিষ্ট একটা কালচে লাল থকথকে হৃদপিন্ড, অহরাত্র পাম্প দিচ্ছে সেখানে স্প্রিং এর মতো পাম্প; শরীর জুড়ে রাস্তা করে করে রক্ত আট আউন্স বা দশ আউন্স হৃদপিন্ডটায় এসে মিশছে, আবার বেড়িয়ে যাচ্ছে অন্য রাস্তায়। এই পাম্প দিচ্ছে কে? রক্তবাহী এই রাস্তা কার তৈরী? সবকিছু ভুলভালও হতে পারত না? এও সেই 'বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না'।
কর্ণাটক হাম্পির বৈতাল মন্দিরের বিশেষ এক থামের ভেতর কান পাতলে এক অদ্ভুত গানের মতো সুর শোনা যায়; যেন আদিযুগের 'অউম'। ইঞ্জিনিয়ারিং এ নিশ্চয়ই এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করেছিলেন সেইযুগের মানুষরা, কিন্তু কি কৌশল? কিংবা ১৯৯৭ তে মল্লিকার্জুন স্বামী মন্দিরের সামনের মাটি খুঁড়ে এক প্রাচীন মন্দির ওঠে, যার নাম নন্দীকেশ্বর মন্দির। মন্দিরের নন্দীমূর্তির মুখ থেকে জল এসে ফুটদশেক নিচে শিবলিঙ্গের ওপর পড়ে, মজার ব্যাপার হাজার হাজার বছর আগের সেই জলের ধারা আজো প্রবাহমান। সাইফোন পদ্ধতিতে ভূ গর্ভস্থ কোনো জলভান্ডারের সাথে এগুলো সংযুক্ত; কিন্তু কীকরে? এও রহস্য। কিংবা অন্ধ্রের যোগান্তস্বামী মন্দির; কুরনুম ডিসট্রিক্টে অবস্থিত। ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হরিহর বুক্কারালু প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির।
মন্দিরের মাঝখানে একটা ছোট্ট পুষ্করিণী হাজার হাজার বছর আছে, সবসময় যা কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার এই জল অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুস্বাদু। কীকরে? সত্যিই কি মহাদেব শিব শুধুই কিংবদন্তী? নাকি শিব একজন নন? অনেক! আমার ব্যাক্তিগত মত গণ ট্রাইবদের মধ্যে যোগ্যতা অনুসারে যুবকরা 'মহাদেব' উপাধী লাভ করতো। এরকম বহু রহস্য এই সৃষ্টিকে আচ্ছাদন করে রেখেছে।।
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-২
বুদ্ধির বাইরে ব্যাখ্যাতীত আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে; সেটাও সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটা লিখতে গিয়ে আমি নিজেও বিভ্রান্ত, একজন মানুষের কতগুলো জীবন? আরেকটা জীবন যদি থেকেও থাকে, তবে সেটা কোন জগতে? আদৌ কি দুটো জীবনের কখনো দেখা হয়? প্যারানর্মাল সায়েন্সের একটা জার্নালে এই ঘটনাটা প্রকাশিত হয়েছিলো। অ্যারিজোনা শহরের ডেভিড লংম্যান নামের এক ছুতোর মিস্ত্রির ঘটনা, উনবিংশ শতাব্দীর কথা। ডেভিড লংম্যান গরীব ছুতোর মিস্ত্রি, এমনিতে সাদাসিধে নিপাট ভালমানুষ হলেও লোকটি ছিলো চরম মদ্যপ; প্রায়দিন রাতে মদ্যপান করে এসে নিজের স্ত্রী ও পুত্রদের ওপর দৈহিক নির্যাতন করতো। মোটামুটি পঞ্চাশ বাহান্ন বছর বয়সে ডেভিডের মৃত্যু হলে তাকে তার বাড়ির নিকটবর্তী একটি কবরস্থানে সমাধি দেওয়া হয়। কিন্তু আসল চমকটা ঘটে দু'বছর পরে; ডিসেম্বর মাসের এক সন্ধ্যায়। সেদিন গোটা অ্যারিজোনা শহর বরফে ঢেকে গিয়েছিলো সন্ধ্যার পরে, হঠাৎ নিজের বাড়িতে এসে দরজায় ধাক্কা দিলো ডেভিড লংম্যান। দরজা খুলে ভয়ে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলো ডেভিডের স্ত্রী, তার ছেলেরা ভয়ে পেয়ে গিয়ে প্রতিবেশীদের খবর দিলো; সবাই মিলে ঘিরে ধরে জেরা করতে লাগলো ডেভিডকে। এ যে সেই ডেভিড, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই; কপালের কাটা দাগ, ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা নেই। ডেভিডকে সবাই প্রশ্ন করলো, "তুমি তো মারা গেছিলে, কোথা থেকে এলে?'' ডেভিডের চাহনি অসংলগ্ন, সে একভাবে বলছিলো, "আমি তো এখানেই ছিলাম..! তোমরা আমার সাথে এরকম ব্যবহার করছো কেন?'' ডেভিড লংম্যানকে স্থানীয় শেরিফ গ্রেফতার করলেন, কিন্তু তার অসংলগ্ন আচরণ দেখে কিছুদিনের মধ্যেই ছেড়েও দিলো। ডেভিডকে তার স্ত্রী পুত্র, প্রতিবেশী কেউ গ্রহণ করলোনা; সে পাগলের মতো পথে পথে ঘুরে বেড়াত, আর বিড়বিড় করে বলতো, "আমাকে চিনতে পারছোনা কেন কেউ? আমিই ডেভিড লংম্যান!'' শেরিফের নেতৃত্বে কবর খুঁড়ে চমকে উঠলো এলাকার লোকেরা, দেখা গেলো সেখানে ডেভিডের কঙ্কাল একইরকম রয়েছে। এর দু'বছর পরে অনাহারে রোগে পথের ওপরেই দ্বিতীয়বার মৃত্যু হলো ডেভিডের। তবে কি কোনো কোনো মানুষের দু'বার জন্ম হয়? আর যদি দু'বার জন্ম ও মৃত্যু হয়ও, তবে আরেকজন মানুষ কোন জগতে থাকে? 'আরশিনগর'?
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৩
আমার চারপাশেও এমন অনেক ঘটনা শুনেছি বুদ্ধিতে সত্যিই যার ব্যাখ্যা করা যায়না। যেমন দিল্লীতে এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রত্নতত্ত্বের কাজে গিয়ে আমার দাদাই(মায়ের মামা) এক অদ্ভুত রহস্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন; প্রত্নতত্ত্বের কাজে ছোটখাটো দল নিয়ে ওখানে গিয়েছিলেন দাদাই দিলীপ চক্রবর্তী(অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)। সারাদিন খোঁড়াখুঁড়ির পরে টেন্টে শুয়ে ঘুমের মধ্যে মাঝরাতে আর্তনাদ করে ওঠে ওঁর একজন সহকর্মী; বলা বাহুল্য ওই প্রত্নতত্ত্ব দলের কেউই মদ্যপান করতেননা, সুতরাং ইল্যুশন ভাবার কারণ নেই। তা অন্যেরা উঠে বসে তাকে প্রশ্ন করে, "কি হলো মিহির? এরকম করছো কেন?'' সকলে ভেবেছিলো মিহির নাম্নী জনৈক যুবক বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু মিহির বলে, "চোখ বুজতে পারছিনা দিলীপদা, বিশ্বাস করুন, চোখ বুজলেই একজন দরবেশ হাত বাড়িয়ে আমার গলা টিপতে আসছে।'' সকলে তাকে অনেক করে বোঝায়, "তুমি দুঃস্বপ্ন দেখেছো মিহির, ওরকম কেউ নেই এখানে; দ্যাখো।'' মিহির চোখে মুখে জলের ছেটা দিয়ে আবার চোখ বোজে, কিন্তু আবার মিনিট দশেক পরেই ওরকম বিকট আর্তনাদ। কুলকুল করে ঘামতে ঘামতে উঠে বসে বলে, "বিশ্বাস করুন দাদা, একজন দরবেশ.....বিশাল চেহারা, লম্বা দাড়ি, কালো আলখাল্লা, চোখদুটো যেন ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে, ও আমার দিকে এগিয়ে আসছিলো দুটোহাত বাড়িয়ে! গলা টিপে মারবে আমায়।'' মিহিরকে ধমক দিয়ে কিছু একটা বলতেন ওঁরা, কিন্তু তখনই বাইরে ভারী গলায় শুনলেন ফিসফিস করে কেউ মন্ত্রোচ্চারণ এর মতো কিছু বলছে। মানিক রায়চৌধুরী কানখাড়া করে শুনে বললেন, "আয়াতুল কুরসি পাঠ করছে কেউ....!'' পরক্ষণেই টেন্টের পর্দায় অল্প আলোছায়ায় সিল্যুয়েটের মতো বিশাল লম্বা একটা ছায়া মূর্তি দেখা গেলো; অনেকেই আর্তনাদ করে উঠলো আতঙ্কে। লম্বা মানুষটা আয়াতুল কুরসি পাঠ করে তিনবার হাততালি দিলো; তারপরেই কর্পূরের মত উবে গেলো সিল্যুয়েটটা। দাদাইরা দু'তিনজন টর্চ হাতে টেন্টের বাইরে এসে দেখলেন ধূ ধূ করছে, কেউ নেই। মানিকবাবু মিহিরকে চেপে ধরলেন এবার, "ঠিক করে বলোতো, কোনো গোলমাল করেছো কিনা? তোমারই কেন গলা টিপতে গেলো?'' মিহির মাথা চুলকে বললো, "মানিকদা, আজ ওই গোরস্থানের ওখানে কাজ করতে করতে হঠাৎ ছোট এসেছিলো; তখন ওখানেই পূবদিকের গোরস্থানের মাঠটার ওখানে আমি...!" দাদাই চমকে উঠে বললেন, "তুমি মনে মনে ক্ষমা চাও মিহির! নইলে ওই ছায়া সহজে আমাদের পিছু ছাড়বেনা।'' মিহির কপালে হাত ঠেকিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলো মনে মনে, পরদিন থেকে আর কোনো সমস্যা হয়নি; নিরুপদ্রবে কাজ সেরে ফিরে গিয়েছিলেন ওঁরা। দাদাই আমাকে বলেছিলেন, "আজো ওইরাতটা ভাবলে মনে মনে শিউরে উঠি! পাম্প দেওয়া ল্যাম্প জ্বলছে টেন্টের ভেতর, সেই আলো অন্ধকারে কাপড়ের দেওয়ালে বিশাল ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে বাইরে.....ফ্যাসফ্যাসে গম্ভীর গলায় আয়াতুল কুরসি পাঠ.....!!''
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৪
সার্জন ড্যানক্যান ম্যাকডুগালের কথা বলতে ইচ্ছে করছে খুব। ওঁর গবেষণাটাও এককথায় 'বুদ্ধির অতীত বা ব্যাখ্যাতীত; একসময় ওঁর গবেষণা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসক মহলে প্রভূত হইচই হয়েছিল। অষ্টাদশ শতকে বস্টনের ডরচেস্টারের ব্লু হীল এলাকায় একটি ম্যানশনে একটা চ্যারিটি হসপিটাল ছিলো, ওই হাসপাতালটা ছিলো যাকে বলে টিবি রোগীদের শেষ আশ্রয়। রোগটা যখন চিকিৎসার বাইরে চলে যেতো, তখন জীবনের শেষ কয়েকটাদিনের জন্য এইসব মানুষদের তাদের স্ত্রী-স্বামী-পুত্র-কন্যা পরিবারের লোকরা এই হাসপাতালে রেখে যেতো; চিকিৎসা সেভাবে কিছুই হতোনা, একটি জিনিষই হতো, সেটা হলো রোগীদের জন্য প্রার্থনা করা। ওই হাসপাতালেরই একজন প্রবীণ সার্জন ছিলেন ড্যানক্যান ম্যাকডুগাল; অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তিত্ব। জীবনসায়াহ্নে তিনি হঠাৎ এক অদ্ভুত গবেষণা শুরু করলেন, যা গোটা বস্টন শহরকে কাঁপিয়ে দিলো; ওই সার্জন রোগীদের চিকিৎসাও করতেননা, তাদের জন্য প্রার্থনাও করতেননা। তিনি রোগীদের একটি আনুপাতিক ওজনের বেডে রেখে মৃত্যুর আগে ও পরে তার ওজন পরীক্ষা করতেন; অবাক কান্ড যেটা তা হলো মৃত্যুর পরমুহূর্তেই ওজন মেপে তিনি দেখেন মানুষটির ওজন মৃত্যুর আগের থেকে কুড়ি গ্রাম কম। এভাবে অনেক জন রোগীর ওপর এই পরীক্ষা করে তিনি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখেন; কিন্তু প্রশ্ন হলো মৃত্যুর আগে ও পরের ওজনে এই কুড়ি গ্রামের তফাতটা কিসের? যদি শরীর থেকে ওই দু'তিন মিনিটের মধ্যে কিছু লসও হয়, তাহলেও তো তা বেডেই থাকবে; তবে মৃত্যুর পরমুহূর্তে কী বেড়িয়ে যায় শরীর থেকে? যার ওজন কুড়ি গ্রাম.....! ম্যাকডুগাল গোটা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেন যে আত্মা আছে, সেই 'স্পিরিট'ই আমাদের শরীরকে চালিত করে। যদিও অনেক সমালোচক ও বিজ্ঞানী ওইসময় তাঁকে 'উন্মাদ' ও 'হাস্যকর' বলে বিদ্রুপ করেন; কিন্তু তাঁরাও এই রহস্য উদ্ভাটন করতে পারেননি। আরেকটি আশ্চর্য ব্যাপার, ম্যাকডুগাল নিম্নশ্রেণীর প্রাণী হিসেবে পনেরোটি কুকুরের ওপর এই পরীক্ষা করে দেখেন এদের ওজনে কিন্তু মৃত্যুর আগে বা পরে কোনো তারতম্য দেখা যায়না! তবে কি স্পিরিট শুধুই মানুষের শরীরে? এইসব প্রাণীদের জীবনীশক্তির উৎস তবে কি? কোনোদিন কেউ কি এই রহস্যের সঠিক কিনারা করতে পারবেন?
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৫
কালীপূজোর দিন বলেই এই গল্পটা মনে পড়ছে আজ। এই ঘটনাটা যাঁর মুখে শোনা, তিনি ছিলেন একসময় এই এলাকার অর্থাৎ সোনারপুরের প্রবীণ, অভিজ্ঞ, ও একচেটিয়া ব্রাম্ভণ পুরোহিত ছিলেন; এখানকার বেশীরভাগ পুরনো গৃহস্থ বাড়িগুলোয় পৌরোহিত্য করতেন। তাঁর নাম বলতে একটু সমস্যা আছে, তবে তাঁকে ভটচায মশাই'ই বলা ভাল। তিনি একজন এমন মানুষ, এবং আমি তাঁকে যতটা চিনি; তাতে এটুকু নিশ্চিত বলতে পারি, ভটচায মশাই কখনো মিথ্যা বলবেননা। সুতরাং, লৌকিক অলৌকিক যাই ব্যাখ্যা থাক; এই ঘটনাটি ঘটেছিলো। ভটচায মশাই এই এলাকার চক্রবর্তীদের বাড়িতে পূজো করতেন। চক্রবর্তীরা বেশ অবস্থাপন্ন গৃহস্থ ছিলেন ওইসময়, বড় ও মেজোকর্তা তেজারতির কারবার করে বেশ কিছু পয়সা করেছিলেন; তবে বর্তমানে টিমটিমে প্রদীপের মত বড়কর্তার বিধবা বৃদ্ধা স্ত্রী ছাড়া আর কেউই বেঁচে নেই। ওঁদের ছোটভাইটা ছিলো সন্ন্যাসী গোছের, পাগলাটে ক্ষ্যাপা টাইপ; তার নাম মাধব। মাধব ছোট থেকেই বারবার বাড়ি ছেড়ে পালাতো, সাধুসঙ্গ করে বেড়াতো; লোকে বলতো, কোন এক কাপালিকের সঙ্গ করে মাধব কিছু ব্ল্যাক ম্যাজিক বা নিম্নশ্রেণীর ভেলকি শিখেছে। ওদের বাড়ির প্রতিষ্ঠিত অষ্টধাতুর তারা কালী বিগ্রহের নিত্য পূজারি ছিলেন ভটচায মশাই; আর সত্যি বলতে কি অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা সেখানে হতোই মাঝেমধ্যে। শোনা যায়, ফুলশয্যার রাতে অন্ধকার ঘরে কোন এক নতুন বৌয়ের মাথার ফুল কেড়ে নিয়েছিলো এক অদৃশ্য হাত; কর্তাদের বুড়ি পিসিমা বাড়ির পুকুরে যেতেন নতুনবৌদের নিয়ে, ভরদুপুরবেলা জলের ওপর কালো কুচকুচে সরু লিকলিকে হাত ভেসে উঠতো একটা, পিসিমা নাকি অদৃশ্য ভূতেদের গালাগালি দিতেন, "পোড়ারমুখো মিনসের দল, আ মরণ! ও নতুন এয়েচে, ভয় দেকাবিনা বলে দিচ্চি।'' পুকুরপাড়ে নতুন বিয়ে হয়ে এসে সন্ধ্যাবেলা বাসন মাজতে গিয়ে নাকি বড় বউ দেখেছিলেন, একটি বৌ পুকুর থেকে উঠে আসছে। লালপেড়ে শাড়ি পরা, পোড়া কাঠের মতো লিকলিকে রোগা আর কালো, চোখদুটো ভাঁটার মতো লাল, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ আর একমাথা সিঁদুর, উস্কোখুস্কো চুল। আবার এ'বাড়ির বুড়োকর্তা গিন্নীর মৃত্যুর দিন সন্ধ্যায় আয়নায় দেখেছিলেন বৃদ্ধা গিন্নী সিঁথিতে সিঁদুর লেপছেন। এরকম হরেক গল্প এই বাড়ির, বলে শেষ হওয়ার নয়; তবে এসবই মূলত পাড়া প্রতিবেশী খুব বুড়ো মানুষদের মুখে ছড়ানো কথা, কিন্তু এখন যেটা বলবো সেটা খোদ ভটচায মশাই আমায় বলেছিলেন। এই অমাবস্যার কালীপূজোর রাতে সেদিনও পূজো করতে এসেছিলেন ভটচায মশাই, এমনিতেও রোজই সকাল সন্ধে এই বাড়িতে নিত্যপূজো করতেনই তিনি। সেদিন রাতে সবেমাত্র পূজো শুরু করেছেন, বাড়ির সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে; হঠাৎ দালানের গর্ভগৃহের মধ্যে এক লাল বিদ্যুতের মতো আগুনের শিরাউপশিরা ঝলসে উঠলো ভটচায মশায়ের চোখের সামনে, আর পরক্ষণেই...... ভারী অষ্টধাতুর তারাকালী প্রতিমা সকলের সামনে 'ঘরঘর' করে পেছনদিকে ঘুরে গেল। ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলো সকলে, মহিলা- শিশুরা কঁকিয়ে কেঁদে উঠলো; ভটচায মশাই থতমত খেয়ে গেলেন, আঙুলে পৈতা জড়িয়ে বিড়বিড় করে গায়ত্রী জপ করতে করতে গর্ভগৃহের বাইরে বেড়িয়ে এসে চমকে উঠলেন সামনে চেয়ে। উঠোনের একপাশের পুরনো গোলঞ্চ গাছের নীচে ছায়ার মতো শরীর দাঁড়িয়ে আছে এক কাপালিক, সূক্ষ্মদেহধারী ভয়ানক চেহারার কাপালিককে দেখে চমকে উঠলেন ভটচায মশাই; দ্রুত গাত্রবন্ধন করে নিলেন মন্ত্র পড়ে। পরক্ষণেই মিলিয়ে গেলো কাপালিক, ভটচায মশাই বড়কর্তাকে বললেন, "মাধবকে ধরো, আমার ধারণা সে নির্ঘাৎ কিছু জানে।'' বাড়ির পুরুষরা মাধবকে একটু চাপ দিতেই সে বললো, কিছুদিন আগেই বিহারের কোন শ্মশানে এক শয়তান কাপালিকের সাথে ঝগড়া হয়েছিলো তার, কাপালিক বলেছিলো শোধ নেবে, তারই শোধ নিয়েছিলো এইভাবে। ভটচায মশাই ওই বাড়িতে আর কোনোদিনও পূজো করেননি।
এসবের অর্থ কি? আমি যুক্তিবাদী মানুষ, তবে আমার ধারণা আজ যা অলৌকিক বলে অভিহিত; কাল তাই বিজ্ঞানের এক নতুন দিক খুলে দেবে। ভটচায মশাই মিথ্যে বলার মানুষ নন, কাপালিকের ব্যাপারটা হ্যালুসিনেশন বলে উড়িয়ে দিতেই পারি; কিন্তু.....বিগ্রহের নিজে থেকে ঘুরে যাওয়ার কারণ!!
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৬
বালক রাজা তুতান খামেনের কথা মনে পড়ছে আজ বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়। আমরা বিজ্ঞানকে হাতের মুঠোয় পেয়েছি মনে করে গর্ব করি, শুক্রাণু বা ডিম্বানুর কৃত্রিম মিলনে শিশুর জন্ম দিতে বিজ্ঞান সক্ষম হয়েছে, মহাকাশের অসীম অন্ধকারে বহু রহস্য উন্মোচিত; অথচ তুতান খামেন রহস্য অধরাই রয়ে গিয়েছে। যুক্তিবাদী বিদগ্ধজনেরা মমির অভিশাপের গল্প এড়িয়ে যেতে চান, কারণ এর উত্তর খোঁজার ক্ষমতা তাঁদের সাধ্যাতীত! অনেকেই কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু তবুও.......কিছুই কি নেই?
লর্ড কারনার্ভন আর হ্যারল্ড কার্টার যৌথ উদ্যোগে ১৯২২ সালের ২৬শে নভেম্বর তুতানখামেনের পিরামিডের রত্নভাণ্ডার আবিষ্কার করলেন, আর এই আবিষ্কারের সাথে সাথেই ইতিহাসের পাতায় একটা মজার অথচ বিষাক্ত লোভের বিপ্লব শুরু হলো। এই রত্নখনির মালিকানা নিয়ে ইংল্যান্ড ও ইজিপ্ট সরকারের মধ্যে বিরোধ বাধলো; তারই সাথে বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা আসা শুরু করলেন এই পিরামিডে, রত্নভান্ডার আর বালক রাজার মমির দর্শনে। কারনারভন এই রাজনৈতিক খেয়োখেয়িতে মাথা গলালেননা, তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন; মন ভেঙে গেছিলো ওঁর। এতোবড় আবিষ্কার, এতো শ্রম.....সব মিথ্যে! শুধু ওই রত্নভান্ডারের মালিকানাই সত্যি! ইংল্যান্ডে ফিরেই অসুস্থ হলেন কারনারভন, স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে কিছুদিনের জন্য চলে এলেন কায়রোতে। শরীর ভেঙে গিয়েছিলো, বারবার জ্বর আসতো; অথচ ডাক্তাররা ধরতে পারলেননা রোগের কারণ। ওই রহস্যময় রোগেই ১৯২৩ এর ৫ই এপ্রিল মারা গেলেন আকস্মিক; মাত্র সাতান্ন বছর বয়েসে। তবে তারচেয়েও অদ্ভুত ঘটনা ছিল সেই মুহূর্তে হঠাৎ গোটা কায়রোর বুকে অন্ধকার নেমে আসা, লোডশেডিং নয়; অথচ গোটা শহরে মৃত্যুর পাঁচমিনিট আগে থেকে মৃত্যু অবধি সমস্ত বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যহত হয়ে যায়, যার কারণ আজো কেউ বলতে পারেননি। অন্যদিকে তাঁর মৃত্যুর সময়েই কায়রো থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে লন্ডনে একই সময়ে তাঁর প্রিয় ফক্স টেরিয়ার কুকুর সুসানও হঠাৎ অস্বাভাবিক ভাবে মারা যায়। অন্যদিকে তার কিছুদিনের মধ্যেই কার্টার ও তাঁদের ফটোগ্রাফার লোকটিরও আকস্মিক বা বলা যায় অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
কারনারভনের মৃত্যুর একবছরের মাথায় তাঁর ছেলে হঠাৎ একদিন স্বপ্নে এক প্রাচীন মিশরীয় পোশাক পরিহিতা রহস্যময়ী নারীকে দেখতে পায়, সেই নারী অদ্ভুত ফিসফিসে গলায় বলে; "খবর্দার! যদি বাঁচতে চাও, কক্ষনো ভুলেও তোমার বাবার সমাধির কাছে যেওনা।'' ভীত সন্ত্রস্ত ছেলেটি কথা রাখে, সারাজীবনে কখনো সে বাবার সমাধির কাছে যায়নি।
গ্লোব ট্রটার লা ফ্লোরের মৃত্যুও একইভাবে রহস্যময়! তবে এরপরে বলবো ড.গ্যামাল মেহরেজের কথা; মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্রাচীন দ্রব্য সামগ্রী বিষয়ের বিভাগীয় প্রধান। তিনি মিশর সরকারের সাথে আলোচনা করে তুতান খামেনের রত্নভাণ্ডার থেকে বেশ কিছু দ্রষ্টব্য বস্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান; যুক্তিবাদী দুঃসাহসী মেহরেজ কোনরকম কুসংস্কারে বিশ্বাস করতেননা। কিন্তু সুস্থ সবল মানুষটি এর মাসদুয়েকের মধ্যেই মাত্র ৫২ বছর বয়সে মারা গেলেন।
১৯৮০ তে ইংল্যান্ডের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল তুতান খামেনের রত্নভান্ডারকে কেন্দ্র করে একটা ডকুমেন্টারি মুভির শ্যুটিং শুরু করে; সিনেমাটির নাম 'কার্স অফ কিং টাট'। কিন্তু যেদিন প্রথম শ্যুট, সেদিনই ঘটে গেলো অঘটন; এই ডকুমেন্টারির মুখ্যাভিনেতা ভয়ঙ্কর কার অ্যাক্সিডেন্টে মারাত্মক জখম হলেন, ওঁর পায়ের হাড় ভেঙে দশটুকরো হয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে পরিচালক অন্য অভিনেতার খোঁজ করেছিলেন, কিন্তু গোটা শ্যুটিং টিম ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ায় প্রযোজক ছবির কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হলেন।
হয়তো এইসমস্ত ঘটনাই কাকতালীয়, একের সাথে অন্য রিলেটেডও নয়; তবুও.........ভয় আর রহস্য ঘিরে থেকেই যায়! এই রহস্যময় পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি আমরা আজো?
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৭
আগের এপিসোডে তুতান খামেনের কথা আর তাঁর অভিশাপের কথা কিছুটা বলেছিলাম। কিন্তু মিশর আর পিরামিড এমনই এক রহস্যাবৃত অধ্যায়, সত্যিই যার অফুরন্ত রহস্যের কথা বলে শেষ হওয়ার নয়। যৌবনকালে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একাকী খুফুর পিরামিডের
ভেতরে কিংস চেম্বারে প্রবেশ করেছিলেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যখন বাইরে বেড়িয়ে আসেন তখন অমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সম্রাট যেন ভিন্ন এক মানুষ, কীসের যেন ভয়ে আতঙ্কে মুখ রক্তশূন্য। তিনি যে কী দেখেছিলেন তা কখনো কারোকে জানাননি(অন্তত জানিয়ে থাকলেও আমরা জানিনা)। টুটান খামেনের পিরামিডে ঢোকার সময়েও অনেক অদ্ভুত সব ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন কারনারভনেরা। ওই কুড়িজনের অভিযাত্রীদলের একজন জানিয়েছিলেন, সেদিন আবহাওয়া ছিলো স্থির, বাতাসের লেশ ছিলনা; নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিলো। তাঁদের দলটি যেই পিরামিডের ভেতরে ঢোকার কয়েকধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করলেন, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে মৃদু ঘূর্ণিঝড় উঠে বালিতে চারপাশ আচ্ছন্ন করে দিলো। সেই ঘূর্ণিঝড় মাত্র মিনিটদশেক স্থায়ী হয়ে বাতাসেই বিলীন হয়ে গেলো। এই সময় হঠাৎ কোথা থেকে একটা বাজপাখি উড়ে এসে পিরামিডের ওপরে চক্কর দিয়ে পশ্চিমদিকে উড়ে গেলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্যঃ মিশরীয়রা বিশ্বাস করে মৃত্যুর পরে সব আত্মা পশ্চিম দিকেই যায়; আর বাজপাখি হচ্ছে মিশরীয় রাজবংশের প্রতীক। ঢোকার মুখে প্রস্তরে লেখা ছিলোঃ 'ডেথ উইল কাম অন সুইফট উইংস টু হিম হু এনটার্স দিস টোম্ব'।
কারনারভন পিরামিডের ভেতরে প্রাপ্ত অ্যালবাস্টারের তৈরি একটি ফুলদানিতে হাত ঢুকিয়েছিলেন। ফুলদানিটি মূল কবরখানার ভেতরে পাওয়া গিয়েছিলো। ফুলদানিটির গায়ে লেখা ছিলো(শোনা যায়)ঃ 'মহান ফারাও এর কবর যে স্পর্শ করবে মৃত্যু তাকে দ্রুত আঘাত করবে।' সেই ফুলদানির ভেতর থেকে হাত বের করে কারনারভন দ্যাখেন, তাঁর তর্জনীতে রক্তের একটি বিন্দু। কোনো অজানা পোকার কামড়? এক্ষেত্রে মনে পড়ে গেলো; এর ছ'বছর পরে ১৯২৯ এর ফেব্রুয়ারিতে কোনো এক অজানা পোকার দংশনে কারনারভনের সৎ মা'য়ের মৃত্যু হয়। হয়তো নেহাতই কাকতালীয় সবটাই, তবু......।
কারনারভনের মৃত্যুর তিনবছর পরে তুতানখামেনের মুখ থেকে সোনার মুখোশ খুলে নিয়ে কিছু পরীক্ষা করার সময় প্যাথলজিস্টরা দেখতে পান, তুতানের গালে ক্ষুদ্র একটি ক্ষতচিহ্ন। অবিশ্বাস্যভাবে মৃত্যুর আগে গালের ওই জায়গাটিতেই কারনারভনকেও একটি মশা কামড়ে ছিলো।
নাইস শহরের একজন দোকানদার অ্যান্টয়েন বভিস একটি আশ্চর্য জিনিষ আবিষ্কার করেছিলেন; তিনি খুফুর পিরামিডে ঢুকে তাঁর নিজের সৃষ্টি রাডিএস্থেসিয়া যন্ত্র দিয়ে ভেতরের শূন্য স্থানের ক্রিয়া প্রক্রিয়া মেপে আসেন; আর এর থেকে তাঁর ধারণা হয় পিরামিডের আনুপাতিক মাপে যদি ফাঁপা পিরামিড তৈরি করা যায়, আর তার নিচে কিছু মৃত প্রাণী রাখা যায়, তাহলে তা পচবেনা; মমি হয়ে যাবে। বভিস সেই পিরামিডের নিচে কিছু মরা ব্যাং, টিকটিকি, সাপ রেখে দেখলেন সেগুলি পচন ধরছেনা; মমি হয়ে যাচ্ছে। এ কী জাদু! এরপরে রাখলেন গোমাংস, ডিম, ফুল; অবাক কান্ড! মাংস পচবার নাম নেই, ফুল বাসি হচ্ছেনা। তখন রেডিও এঞ্জিনিয়ার ড.ক্যারেল জ্রবাল এই খবর পেয়ে বভিসের কাছ থেকে দুটি এরকম মডেল পিরামিড কিনে নিয়ে গিয়ে এক নতুন গবেষণা করলেন। তিনি গিলেট ব্লু ব্লেড বানিয়ে একটি পিরামিডের নিচে রাখলেন; ভেবেছিলেন ব্লেডটি ভোঁতা হয়ে যাবে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে কয়েকদিন পরে ব্লেডটি পিরামিডের নিচে থেকে বের করে দেখলেন, ব্লেডের ধার তো কমেইনি,উলটে বেড়ে গিয়েছে। উপরন্তু একটি ব্লেডে যেখানে পাঁচ ছ'দিন দাড়ি কামালে ধার ক্ষয় হয়; সেখানে ওই ব্লেডগুলিতে পঞ্চাশদিন দাড়ি কামানোর পর তবে অল্প ধার ক্ষয় হলো। জ্রবাল স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি বিক্রিয়া করে পিরামিডের ভেতর। কখনো কী এই রহস্য উদ্ভাটন হবে?
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৮
একেকটি বস্তুকে ঘিরে পৃথিবীতে একেকটি অভিশাপের কথা, দুর্ভাগ্যের কথা প্রচলিত থাকে। এসবের সত্যতা বিচার করা তো আমাদের সাধ্যের বাইরে; তাই কোনো রকম যুক্তি তর্কে না গিয়ে এরকম একটি ঘটনার কথা আজ লিখতে ইচ্ছে করছে।
অষ্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্চ ডিউক ফ্রান্সিস ফার্ডিনান্ডের ১৯১৪ সালে সস্ত্রীক কার অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়, সম্ভবত এ কথা সকলেরই জানা। তবে যে কথা বেশীরভাগ মানুষের জানা নেই, তা হল ওই অভিশপ্ত গাড়িটি পরে কিনে নেন অষ্ট্রিয়ান আর্মির জেনারেল পোটিওরেক। কিন্তু এরপরেই পরপর দুটি বিপর্যয় নেমে আসে জেনারেলের ওপরে; তাঁর স্ত্রীয়ের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে যায়, আর কয়েকমাসের মধ্যেই জেভোর যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। পরপর এই দুটি ঘটনায় তিনি মানসিক ভাবে এতোটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, যে অ্যাসাইলামে একজন উন্মাদ মানুষ হিসেবেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।
এখানেই শেষ নয়; এবারে এক অষ্ট্রিয়ান ক্যাপ্টেনের পালা। গাড়িটি কেনার পনেরো দিনের মধ্যে সেই হতভাগ্য ক্যাপ্টেন মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট করেন, দুজন কৃষকের মৃত্যু হয় সেই অ্যাক্সিডেন্টে; ভদ্রলোক নিজেও গুরুতর জখম হন।
এরপরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গাড়িটি কিনে নেন যুগশ্লোভিয়ার গভর্নর জেনারেল। যতদিন তিনি এই গাড়িটির মালিক ছিলেন, ততদিন তাঁর জীবনে একটির পর একটি দুঃসহ ঘটনা ঘটেছে; চারমাসে চারটি ভয়ঙ্কর অ্যাক্সিডেন্ট হয়। একটি অ্যাক্সিডেন্টে ওই গভর্নর জেনারেল তাঁর একটি হাত হারান; বাধ্য হয়ে গাড়িটি তিনি একজন ডাক্তারের কাছে বিক্রি করে দেন। ডাক্তার ভদ্রলোকও ছ'মাসের মাথায় ওই গাড়ির মধ্যেই দুর্ঘটনায় মারা যান, এবার গাড়িটি কিনে নেন এক বিত্তশালী হীরক ব্যবসায়ী; তিনি ব্যাক্তিগত বিপর্যয়ের কারণে আত্মহত্যা করেছিলেন। এরপর গাড়িটি আসে সুইজারল্যান্ডের এক কার রেসারের কাছে, কার রেসিং'এর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উঁচু পাহাড় থেকে নীচের খাদে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর গাড়িটি আসে সাইবেরিয়ার একজন কৃষকের কাছে, তিনিও এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
এখানেই শেষ গাড়িটির মরণমিছিল, বর্তমানে 'অভিশপ্ত' তকমা পাওয়া গাড়িটি ভিয়েনা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
এই ঘটনাগুলো; এতগুলো মৃত্যু, বিপর্যয়.....সবই কী কাকতালীয়? এডওয়ার্ড রাসেল নামের একজন জার্নালিস্ট ও শখের মনস্তত্ত্ববিদ 'অভিশপ্ত'র ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো কোনো বস্তুর সাথে হয়তো ঋনাত্মক চিন্তার এক ক্ষেত্র যুক্ত থাকে; যে ব্যাক্তি এই বস্তুটির অধিকারী হন তাঁর সমস্ত আত্মা এবং চেতন ওই ঋনাত্মক প্রভাবে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ তিনি আর নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকেননা, তাঁর সমস্ত কাজকর্ম তখন ওই বস্তুর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়।
ডাচ মনস্তত্ত্ববিদ জে গার্দ ক্রুয়েসেট এই 'অভিশপ্ত' বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন, তাঁর মতে; পৃথিবীতে এমন কোনো কোনো বস্তু আছে যা স্পর্শ করা মাত্রই শরীরের মধ্যে এক ভয়তাড়িত অনুভূতির সৃষ্টি হয়, যার কারণ ব্যাখ্যাতীত। এর থেকেই অবচেতনে মানসিক বিকলন, শারীরিক অঙ্গহানি, ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা এসব ঘটতে পারে।
তবুও.....একটা প্রশ্নচিহ্ন তো রয়েই যায় এসব কিছুর পরেও! বুদ্ধিতে কী সত্যিই এইসবকিছুর ব্যাখ্যা হয়?
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-৯
আগের এপিসোডে একটি অভিশপ্ত গাড়ির কথা বলেছিলাম, এবারে একটি অভিশপ্ত নীলার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমি জ্যোতিষে বিশ্বাসী নই, তাই সত্যিই এই ঘটনাটা নীলার অভিশাপের কারণ; নাকি নেহাতই কাকতালীয় তা আমি নিজেও জানিনা। কিন্তু এই ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছিলো, আর ঘটেছিলো আমারই এক নিকট আত্মীয়ের মামারবাড়ি; যিনি বলেছিলেন তাঁর কথা অবিশ্বাস করার মতো মানুষ তিনি নন। আসলে, 'নীলা' বা 'ব্লু স্যাফায়ার' পাথর স্বচ্ছ উজ্জ্বল নীল আভাযুক্ত রত্ন; যদিও নীলার এর বাইরেও কয়েকটা ভাগ আছে, যেমন- ইন্দ্রনীলা, অপরাজিতা নীলা, গঙ্গাজল নীলা, রক্তমুখী নীলা ইত্যাদি। বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করলে নীলা আর চুনি দুটোর উপাদানই এক, কোরান্ডাম বা দক্ষিণীরা বলে কুরুবিন্দাম। কিন্তু চুনি বা রুবির ক্ষেত্রে কোরানডামের সাথে কিছুটা ক্রমিক অক্সাইড মিশে থাকে বলে লাল হয়; আর নীলার নীল রঙের কারণ টাইটানিয়াম অক্সাইড, বিশুদ্ধ নীলা দুধে ডুবিয়ে রাখলে দুধের রঙও নীল আভাবর্ণ ধারণ করে।
আমার এতোটা গৌরচন্দ্রিকা করার কারণ কেউ যাতে নীলাকে নিয়ে নিছক ভয় বা অন্ধবিশ্বাস মনে পোষণ না করেন; কিন্তু আমাকে একজন জ্যোতিষ সম্পর্কে জ্ঞানী মানুষ(শখে জ্যোতিষ চর্চা করেছেন, পেশাদার জ্যোতিষী নন) বলেছিলেন, নীলা কিছু মানুষের ওপর যতটাই ধনাত্মক প্রভাব ফেলে; কারোর কারোর ওপরে ততটাই ঋণাত্মক ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তাই, ষাট সত্তর বছর আগেও অধুনাবিস্মৃত একটি প্রথা প্রচলিত ছিলো; নীলা কেনার পরে প্রথম রাতে বালিশের নীচে নিয়ে শুতে হতো, যদি স্বপ্নাদেশে অনুমতি পাওয়া যেতো তবেই নীলা ধারণ করতেন তৎকালীন মানুষরা, অন্যথায় ওই নীলা ত্যাগ করতে হতো।
আজ থেকে আশি নব্বুই বছর আগের কথা; ধরা যাক, ভদ্রলোকের নাম ভৈরব বিশ্বাস। ভৈরবের ভিটে ছিলো নৈহাটির মাদারপুর গ্রামে, মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার; আট-দশ বিঘে আবাদি জমি ছিলো তাঁর। মূলতঃ চাষাবাদ করেই সংসার চলতো ভৈরবের, তবে গোলাভরা ধান, উঠোনে আলপনা দেওয়া তুলসীমঞ্চ সবকিছু মিলিয়ে বেশ সম্পন্ন গৃহস্থের ছোঁয়া ছিলো ভৈরবের বাড়িতে। স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলে ও এক বুড়ি পিসিমাকে নিয়ে সংসার তার। ছোট মেয়েটি একেবারে কোলের, বড় মেয়েটির চোদ্দো পনেরো বছর বয়স; ওইসময়ের নিরিখে বিবাহযোগ্যা, ঘরকন্নার কাজ শিখছে মায়ের কাছে। ছেলেটিই বড়, বাপের চাষের জমি দেখাশোনা করে আর জমিদারের সেরেস্তায় একটা ছোটোখাটো কাজ করে। সবকিছুই ঠিকঠাক, স্বচ্ছল চলছিলো; কিন্তু বিপদটা এলো অন্যদিক থেকে। হঠাৎই একদিন বুধবারের হাট থেকে কোন এক মুসলমান দোকানির কাছ থেকে একটি নীলা কিনে আনলো ভৈরব; তার স্ত্রী বলল, "ওগো, নীলা যে সবার সয়না! এ তুমি কেন আনলে ঘরে?'' পিসিমাও বলল, "ও ভরু, তুই ওই নীলা আজ মাথার নিচে নিয়ে শো', যদি স্বপ্নাদেশ পাস তবে ধারণ করিস!'' কিন্তু ভৈরব মানুষটা চিরকালই একরোখা, গোঁয়ার গোবিন্দ স্বভাবের; আর সত্যি বলতে কী ওইসময়ের অজ পাড়া গাঁয়ের মানুষ হয়েও কিছুটা যুক্তিবাদও ছিলো বোধহয় তার মধ্যে। তাই ওসব কিচ্ছু না করেই ভৈরব একটি আংটিতে ওই নীলাটি ধারণ করলো হাতের অনামিকায়; এরপরেই শুরু হলো আশ্চর্য সব ঘটনা। এর হপ্তাদুয়েক বাদেই একদিন দুপুরের দিকে বাড়ির দুয়ারে হাজির হলো দুজন আগন্তুক, তাদের চেহারা সাপুড়ে মাদারীদের মতো; কাঁধে ঝোলায় ঝাঁপি। তাদের একজন বৃদ্ধ, লম্বা সাদা দাড়ি; আর আরেকজন তুলনায় কমবয়স। বৃদ্ধ মানুষটি বিন বাজাচ্ছিলো বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে; ভৈরবের স্ত্রী সাধারণ ভিখারি ভেবেই এসে সামান্য কিছু চাল আর দুটো পয়সা দিলো তাদের হাতে, তখন পয়সা ফিরিয়ে দিয়ে দাড়িগোঁফের ফাঁকে অল্প হেসে বৃদ্ধ লোকটি বললো, "মা, চালটুকু নিচ্ছি; মা নক্কীর জিনিষ। কিন্তু....এই পয়সাদুটো আমরা নিতে পারবোনাক, আমরা ভিখিরি নই।'' বলাবাহুল্য; ভৈরব বা তার ছেলে তখন বাড়িতে ছিলোনা, ভৈরবের পিসিমা ছোটমেয়েটিকে নিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এসে বললো, "কে তোমরা বাছারা?'' এবার অন্যলোকটি বললো, "মা ঠাকরুণ, আমরা সাপুড়িয়া; গড়খানা গাঁয়ের ওপারে আমাদের ঘর। আপনাদের ঘরের আনাচ কানাচে দুটো গোখরো সাপ আচে, আমরা সাপের উপস্থিতি ঠিক ধরতে পারি। আপনারা অনুমতি দিলে, ওই সাপ'দুখানা আমরা নিয়ে যেতে চাই।'' ভৈরবের বৌ আঁতকে উঠে বললো, "ওমা, এরা বলে কিগো পিসিমা?'' পিসিমা বললো, "তা নিয়ে যাও বাছা, তোমরা এসেইচো যকন!'' বৃদ্ধ মানুষটা উবু হয়ে মাটিতে বসে দুটো ঝাঁপি খুলে দিলো, তারপর গাল ফুলিয়ে অদ্ভুত এক মায়াবী সাপখেলানো সুরে বিন বাজাতে শুরু করলো; কিছুক্ষণের মধ্যেই সুড়সুড় করে ঘরের কোটর থেকে দুটো গোখরো সাপ বেড়িয়ে এসে আশ্চর্য নিশিপাওয়ার মতোন এগিয়ে গেলো ঝাঁপিদুটোর দিকে, মাথায় পদ্ম ছাপ---পদ্মগোখরো। বুড়ো মানুষটা খপ ধরে গলাটা ধরে বিষধর প্রাণীটার মাথায় একটা চুমু খেয়ে বললো, "আঃ; তেজ দ্যাকোনা.....বিষ নেই তার কুলোপানা চক্কর!'' হাসতে হাসতে ঝাঁপিতে ভরে দুজনে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "আসি মা ঠাকরুনরা; পেন্নাম।'' মানুষদুটো বেড়িয়ে যাওয়ার প্রায় পাঁচ ছ'সেকেন্ডের মধ্যেই ওই দরজা দিয়েই এসে ঢুকলো ভৈরব; অবাক হয়ে সবার দিকে চেয়ে বললো, "একী? তোমরা সব এখানে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে? কী ব্যাপার?'' ভৈরবের বৌ সব বলতেই ভৈরব চমকে উঠলো, "কী?? এটা....তোমরা কী করেছো বৌ? আর পিসিমা, তুমিও.....! ওদুটো এই ভিটের বুড়ো বাস্তু গোখরো ছিলো, সেটা কী তুমিও জানোনা? আমার বাবার আমলের দুটো সাপ.....কোনোদিনও কারোর অনিষ্ট করেনি! তারা....কতক্ষণ আগে গিয়েছে?'' বৌ ভয়ে ভয়ে বললো, "এইতো, তোমার আসার একদম আগেই তো; একজন বুড়ো আর একজন কালোপানা মাঝবয়সী লোক! ওই রাস্তা দিয়েই গেছে তুবড়ি বাঁশি বাজাতে বাজাতে.....।'' ভৈরব ভ্রু কুঁচকে বললো, "কই? আমি তো অমন কাউকে দেখিনি; আর বিনের শব্দও শুনিনি।'' বড় মেয়ে চোখ বড় বড় করে বললো, "হ্যাঁ বাবা, কতদূর থেকে ওদের তুবড়ি বাঁশির সুর শোনা যাচ্চিলো!'' ভৈরব বললো, "তাহলে.....এখনো নিশ্চয়ই তারা গাঁয়ের বাইরে চলে যায়নি; এখনো গেলে পাবো!'' ভৈরব ছুটে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে; কিন্তু কাউকে পেলোনা পাশের গ্রাম অবধি খুঁজে এসেও, এই গ্রামেও কেউ দেখেনি তাদের, বিনের শব্দও শোনেনি। ভৈরব গড়খানা গ্রামেও খবর নিলো, কিন্তু সেখানে কোনো এরকম সাপুড়ে বা মাদারী থাকেনা বা কক্ষনো ছিলোওনা। গঞ্জ এলাকাতে এসব খবর চাপা থাকেনা, খুব শিগগিরই এই নিস্তরঙ্গ গ্রাম্যজীবনে এই ঘটনা বেশ সাড়া ফেললো। এর কিছুদিন বাদেই মাঘমাসের ঠান্ডার রাতে হঠাৎ----ধানের গোলায় আগুন লাগলো ভৈরবের; সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার! সারী সারী গোলাভরা ধান দাউ দাউ করে জ্বলছে, শীতের উত্তুরে বাতাসে সে আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত; গ্রামের আট দশজন জোয়ান ছেলে বালতি বালতি জল ঢেলেও কোনো লাভ হলোনা আর.....চোখের সামনে সদ্যকাটা ধান, গোলা সব ছাই হয়ে গেলো। অনেকেই বললো বটে কেউ হিংসেয় আগুন লাগিয়েছে, তবু ভৈরবের বিশ্বাস হলোনা, তার কোনো শত্রু নেই আশপাশের আট-দশটা গ্রামে। শোকে তাপে বিভোর হয়ে গেলো ভৈরবের গোটা পরিবার; পিসিমা আছাড়িপিছাড়ি খেয়ে কেঁদে বললো, "ওরে ভরু, ওই সব্বনেশে নীলা তুই ছাড়; তোর পায়ে পড়ি।'' কিন্তু ভৈরব এতোকিছুর পরেও নিজের জেদে অনড় রইলো, নীলা সে ছাড়বেনা। তবে এখনো নীলার রাক্ষুসে ক্ষিদে মেটেনি, মোক্ষম ঘটনাটা ঘটলো এই বারে।
নিস্তরঙ্গ শান্ত ফাল্গুনের দুপুর, পিসিমা ভাতের কাপড় কেচে স্নান করতে গিয়েছিলো পুকুরে; দিব্যি রোদ আকাশে ঝলমল করছে, কোনো প্রতিকূলতার চিহ্ন নেই প্রকৃতিতে। হঠাৎ গাঁয়ের দুটি বউ ছুটতে ছুটতে পুকুরপাড়ে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে আর্তনাদের স্বরে বললো, "পিসিমা গো; শিগগির চলেন....সব্বোনাশ হয়েচে!'' পিসিমা কাঁপতে কাঁপতে ছুটে ছুটে ঘরের সামনে এসে চমকে উঠল্ক! কোথায় ঘর? ঝড় নেই, জল নেই, গোটা ঘর ভেঙে পড়েছে; কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। পিসিমা গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করলো, "ভরু রে.......!'' ঘরচাপা পড়ে মারা গেলো ভৈরবের স্ত্রী আর দুই মেয়ে; ভৈরব আর তার ছেলে তখন বাড়ি ছিলোনা। ভৈরব এরপরেই উন্মাদের মতো হয়ে গেলো, চুপচাপ একজায়গায় বসে থাকে; নিজের মনেই বিড়বিড় করে, কখনো হাহা করে হেসে ওঠে; কখনো কেঁদে ওঠে। ভৈরব খুব বেশীদিন আর বাঁচেনি, শেষের দিকে পাগল হয়ে নগ্ন হয়ে ঘুরতো রাস্তায় রাস্তায়; নিজে মলত্যাগ করে নিজেই দু'হাতে ঘাঁটতো। ভৈরবের ছেলে পিসিমাকে নিয়ে মামারবাড়ি চলে যায়, মৃত্যুর সময়েও ভৈরবের হাতের আঙুলে ছিলো নীলাটি।
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-১০
আগের দুটো এপিসোডে অভিশাপের কথা বলেছিলাম, এবারে পুতুল নিয়ে কিছু বলতে খুব ইচ্ছে করছে। আপাতদৃষ্টিতে পুতুল নিরীহ খেলনা ছাড়া কিছুই নয়; কিন্তু তবুও...পুতুল নিয়ে আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই কিছু আতঙ্ক, কুসংস্কার রয়ে গিয়েছে। হলিউডের 'কনজিউরিং', 'অ্যানাবেলা', 'চ্যাকি'র মতো ছবিগুলো এই চিন্তাকে আরো উস্কে দিয়েছে। এক্ষেত্রে অনেক ঘটনার কথাই আসতে পারে; এখন দুটো অমীমাংসিত ব্যাপারের কথা বলা যাক।
প্রথম ঘটনাটা ১৯৩৮ সালের, জাপানের এক সেনা যুবক একেচি সুজাইকাই তার মৃত বোন কিকুর অতি আদরের একটা পুতুল জমা দিলো একটি স্মৃতি মন্দিরে। এই পুতুলটা কিকুর ভীষণ প্রিয় ছিলো, তার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিলো ওই ছোট পুতুলটি। একটা সাধারণ ডলপুতুল, যেরকম নিয়ে ছোটমেয়েরা খেলে। সুজাইকাই যতদিন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলো, তার খালিই ওই পুতুলটার কথা মনে পড়তো; তার বোনের একমাত্র স্মৃতি তার কাছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে সুজাইকাই দেশে ফিরে সেই স্মৃতিমন্দিরে যায়, পুরোহিতের সামনে পুতুলের বাক্সটির ডালা খুলেই সাথে সাথে চমকে ওঠে ও। এতবছর কেটে যাওয়া সত্ত্বেও সামান্যতমও বিবর্ণ হয়নি পুতুলটার আকৃতি, আশ্চর্যের বিষয় ওটার মাথায় মানুষের মতো চুল দেখা যাচ্ছে। পুতুলটা পুরোহিত বেদিতে শুইয়ে দেন; দিনে দিনে বাড়তে থাকে ওটার চুলের দৈর্ঘ্য। আজ এতোগুলো বছর পরেও পুতুলটা সেই বেদীতে একইভাবে রাখা আছে, একটুও বিবর্ণ হয়নি; বরং বেড়েছে চুলের দৈর্ঘ্য। বর্তমানে জায়গাটি একটা দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে; নিয়মিত প্রচুর দেশবিদেশের ট্যুরিস্ট আসেন ওখানে। কিকু'র পুতুলের রহস্য আজো সমাধান করতে পারেননি বৈজ্ঞানিকরা।
মেক্সিকোর দক্ষিণে জিওচিমিলকো ক্যানেলের পাশে এক ভয়ঙ্কর দ্বীপ আছে। স্যাঁতসেঁতে, সারীসারী প্রাচীন গাছের ছায়ায় অন্ধকার ওই দ্বীপে জনবসতি নেই, কিন্তু আছে অজস্র পুতুল। চোখ নেই, মাথা ছাড়ানো, হাতভাঙা, পা কাটা বীভৎস চেহারার কয়েকশো পুতুল এই দ্বীপের প্রাচীন গাছের ডালে বসানো, মাটিতে ছড়ানো। দ্বীপটিতে জীর্ণ দীর্ণ ছোট ছোট ভাঙা কুটিরের ভেতরেও রয়েছে সারী সারী পুতুল। কিন্তু কোথা থেকে এলো গা ছমছমে এতো পুতুল?
৯০-৯৫ বছর আগে এই দ্বীপে একটি ছোট্ট গ্রাম ছিলো ট্রাইবদের। এই গ্রামের একটি ছোট মেয়ে তার প্রিয় পুতুল কোলে নিয়ে খালে ডুবে মারা যায়। এরপর থেকেই অলৌকিক ভাবে রোজ মধ্যরাতে খালে এসে জমা হতে থাকে শ'য়ে শ'য়ে পুতুল। কোথা থেকে যে এতো পুতুল এলো, তাও সেই 'বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না'! দ্বীপে এইসময় হঠাৎ করেই মড়ক লাগে, গোটা দ্বীপ উজাড় হয়ে যায় সেই মড়কে। দ্বীপের একমাত্র জীবিত বাসিন্দা আধপাগল বৃদ্ধ ডন জুলিয়ান খাল থেকে পুতুলগুলো সংগ্রহ করে গোটা দ্বীপে সাজিয়ে রাখতে শুরু করে। মৃত্যুর আগে একমাস ধরে প্রতিরাতে খাল থেকে পুতুল তুলে আনতো জুলিয়ান। তার মৃত্যুর আগে ও পরে ওই দ্বীপে আর কেউ বাস করেনি। প্রায় তিরিশবছর পরে দ্বীপটি নজরে আসে মেক্সিকো সরকারের; বুড়ো ডন জুলিয়ানের ডায়েরী অলৌকিকভাবেই অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায় দ্বীপের একটি কুঁড়েঘরে। বর্তমানে সরকারের তৎপরতায় ওই পৈশাচিক দ্বীপে প্রায় রোজই দেশ বিদেশের পর্যটকরা জড়ো হন।।
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-১১
পুতুল সম্পর্কিত মিথ বা কিংবদন্তীর ব্যাপারে বলেছিলাম আগের এপিসোডে, সেই সার্কলটা আজকের এপিসোডে সম্পূর্ণ করবো। পৃথিবীর অন্যতম অভিশপ্ত পুতুল 'অ্যানাবেলা' বর্তমানে ওয়ারেন দম্পতির নিজস্ব মিউজিয়ামে আছে, তার কথা নতুন করে কিছু বলার আর মানে হয়না; 'কনজ্যুরিং' সিরিজের দুটো ছবি আর 'অ্যানাবেলা' ছবিটির দৌলতে এই বিষয়টা সম্পূর্ণ পরিষ্কার দর্শকদের কাছে। কিন্তু আরেকটি পুতুলও এভাবেই কিংবদন্তী হয়ে আছে ইতিহাসে; তার নাম রবার্ট দ্য ডল। আজকের এপিসোডে রবার্টের সম্পর্কে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে; আমি নিশ্চিত নই তবে 'চ্যকি' সিরিজের ছবিগুলি সম্ভবত রবার্টেরই ছায়ায়। এই পুতুলটার মালিক ছিলেন ওয়েস্ট দ্বীপের চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক রবার্ট ইউজিন অটো। ১৯০৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার একজন বাহামা চাকর ছোট্ট ইউজিনকে এই পুতুলটা উপহার দিয়েছিলো; শোনা যায় চাকরটির সাথে ইউজিনের বাবা মায়ের সম্পর্ক কোনো কারণে ভাল ছিলোনা, লোকটি নাকি কালোজাদু ও ডাকিনীবিদ্যায় পারদর্শী ছিলো(কথিত আছে)। ইউজিনের বাবা মা দাবী করেন; ইউজিনের সর্বক্ষণের খেলার সঙ্গী হয়ে উঠেছিলো পুতুলটা। ইউজিন ঘরে একা একা তার সাথে কথা বলতো, আর পুতুলটা নাকি তার উত্তরও দিতো। প্রথম প্রথম ইউজিনের বাবা মা ভাবতেন, ইউজিন নিজেই কন্ঠস্বর পরিবর্তন করে কথা বলে পুতুলটার সাথে; ছেলেবেলায় কতরকম খেয়ালই তো হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে ওঁরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, পুতুলটা নিজে কথা বলে। প্রতিবেশীরা কিছুদিন বাদেই অভিযোগ করা শুরু করেন, ওঁরা কেউ যখন বাড়িতে থাকতেননা; তখন পুতুলটিকে এক জানলা থেকে অন্য জানলায় স্থান পরিবর্তন করতে দেখা যায়, বাড়ির ভেতর থেকে খুনখুনে গলায় হাসির শব্দ আসে। কিছুদিনের মধ্যেই ইউজিনের বাবা মা রাতে টের পেতে থাকেন, পুতুলটা ডাইনিং হল, ড্রয়িং রুমে আবছা ছায়ার মতো হাঁটাচলা করে, খকখক করে কাশে। ইউজিনের ঠাকুমা একদিন পুতুলটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসেন বাইরে; পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সকলে দেখে বিছানায় মরে আছেন বৃদ্ধা, গলায় আঙুলের দাগ ছোট ছোট। চোখদুটো যেন ঠেলে বেড়োচ্ছে আতঙ্কে, মুখটা হাঁ: আর সবচেয়ে আশ্চর্য....বিছানায় মৃতদেহের পাশে হাসিমুখে শুয়ে আছে পুতুলটা।
১৯৭৪ এ ইউজিনের মৃত্যুর পরে বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায়, আর নতুন একটি পরিবার আসে। নতুন পরিবারটিতে একটি দশবছরের ছোট মেয়ে ছিলো; কিছুদিনের মধ্যে মেয়েটি চিলেকোঠার ঘরে পুতুলটা খুঁজে পায়। কয়েকমাসের মধ্যেই শুরু হয় অলৌকিক সব ব্যাপার, মেয়েটি তার বাবা মা'কে জানায়; পুতুলটা জীবন্ত হয়ে মধ্যরাতে ওর ঘরে হেঁটে চলে বেড়ায়। কিছুদিন এইভাবে চলতে চলতে ছোট মেয়েটি মানসিক অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাকে অ্যাসাইলামে ভর্তি করতে হয়। অ্যাসাইলামের ডাক্তার ও নার্সরাও হাসপাতালের ভেতরে পুতুলটির উপস্থিতি অনুভব করেন বলে জানান। প্রায় তিরিশবছর পরে এক সাক্ষাৎকারে মেয়েটি দাবী করে, রবার্ট তাকে খুন করতে চাইতো।
বর্তমানে রবার্ট দ্য ডল কি ওয়েস্ট ফ্লোরিডা মার্টেল্লো মিউজিয়ামে আছে। মিউজিয়ামের কর্মচারীরাও বলেন, অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু হয় মিউজিয়ামে। রবার্টকে যেখানে রাখা হয়েছে, মিউজিয়ামের সেই অংশে সবসময় জোড়ালো আলো জ্বেলে রাখা হয়; কোনো ১৫ বছরের নীচের শিশুকে ওর সামনে যেতে দেওয়া হয়না। শোনা যায়, পুতুলটির ছবি তোলা যায়না; দু'বার মাত্র দুজন ট্যুরিস্ট ওর ছবি তুলেছিলেন, ন'টি ফ্ল্যাশ জ্বলে গিয়েছিলো তখন। আশ্চর্যের ব্যাপার সেই দুজন ট্যুরিস্টই আশ্চর্যভাবে দুর্ঘটনায় মারা যান কিছুদিনের মধ্যে। হয়তো এসব ঘটনা সবই কাকতালীয়, অপ্রাকৃতিক কিছুই নেই পুতুলটির মধ্যে; কিছু মানুষের পুতুলটিকে ঘিরে অহেতুক ভয় আর অন্যের মধ্যে তার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া অবচেতনে, তবুও......প্রশ্নবোধক চিহ্ন কী মুছে যায় পুরোপুরি? রবার্টকে ঘিরে ব্যাখ্যাতীত কিছুই থাকেনা? নাকি এমন কিছু থাকে; বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না!!
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-১২
মিথ বা কিংবদন্তী রহস্যময় চরিত্র! হ্যাঁ; এরকম বহু মিথ বা কিংবদন্তী মানুষ বা চরিত্র পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্নবার দেখা গেছে। এদের কারোর রহস্যভেদ হয়েছে, আবার কারোর হয়নি। গত দশকের কলকাতায় স্টোনম্যান কিলার, বা দিল্লীর নরবানর; অথবা জ্যাক দ্য রিচার এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তিযোগ্য। কিন্তু এসবের বাইরেও গ্রাম-শহরতলি-মফস্বলে এমন অনেক চরিত্র আছে, যাদের কথা মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যম জানতে পারেনা; শুধু গ্রামগঞ্জের মফস্বলের মানুষদের মধ্যেই ঘুরতে ঘুরতে একদিন কালের নিয়মে হারিয়ে যায় ঘটনাগুলো। এক্ষেত্রে ২০০৬-২০০৭ নাগাদ আমারই এলাকাজুড়ে একটা গা ছমছমে ঘটনা সংক্রমণের মতো ছড়িয়ে পড়েছিলো, 'পেঁয়াজ বুড়ি'। অনেকদিন পরে বছরদেড়েক আগে ঘটনাটার সত্যতা খুঁজতে গিয়ে আমি একটি পরিবারের দেখা পেয়েছিলাম, যারা এই ভয়ানক অভিজ্ঞতালব্ধ। এই ঘটনাটা হঠাৎ করেই সুনামীর মতো ছড়িয়ে পড়লো গোটা সোনারপুরে; একজন পৈশাচিক বৃদ্ধার নাকি হঠাৎ করেই আবির্ভাব হয়েছে এখানে, সে কখন কোন বাড়িতে পা রাখে তা ভেবে সবসময় তটস্থ হয়ে উঠলো গোটা শহরতলি। আমি যে ভদ্রলোকের মুখে শুনেছিলাম, তাঁর নাম (পড়ুন ধরা যাক) সৌগত চক্রবর্তী। ওঁর বাড়িতে মোট তিনজন সদস্য, সৌগত, তাঁর স্ত্রী, আর বাবা সৌমেনবাবু। মে মাসের দুপুর, সৌগত বাড়ি ছিলেননা; ছিলেন শুধু ওঁর স্ত্রী অপর্ণা আর সৌমেনবাবু। গরমকালের এই রকম ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে মূলত মফস্বলের পাড়াগুলো নিস্তব্ধ থাকে, একটা ঝিমধরানো ওয়েদার চারপাশে। অপর্ণা লাঞ্চের পরে একটা টেলিফোন কভারে সেলাই করে ফুলপাতার ডিজাইন করছিলেন; ছোট্ট সংসারে বিশেষ কাজ নেই, সময় কাটতে চায়না দুপুরের দিকে। সৌমেনবাবু নিজের লাইব্রেরী ঘরে বসে বই পড়ছিলেন একা একা, হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠলো। শহরতলিতে মূলত দুপুরের দিকে সেলসম্যানের উৎপাত দেখা যায়, অপর্ণাও তাই ভেবে মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে দরজার আইহোলে চোখ রেখে দেখলেন, সেলসম্যান নয়। একজন বৃদ্ধা, ভিখিরি টাইপের। বীভৎস চেহারা, রোগা কালো পাকানো দড়ির মতো চেহারা, শনের মতো সাদা চুল মাথায়, কাঁধে একটা নোংরা পুঁটলি, ময়লা সাদা থান পরণে। দরজা খুলে অপর্ণা বললেন, "কী চাই?'' বুড়ি তার শিরা বেড়োনো জীর্ণ একটা হাত বাড়িয়ে বললো, "খাবো মা, খেতে দাও; একটা রুটি! বড্ড খিদে মা'গো!" অপর্ণা বুড়িকে আপাদমস্তক একবার দেখে বললেন, "আচ্ছা, দাঁড়াও; দেখছি।'' গতরাতের বাসী রুটি একটা রান্নাঘরে ছিলো, সেটা নিয়ে এসে বুড়ির হাতে দিতেই বুড়ি হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বললো, "বেঁচে থাক মা" তারপরেই পুঁটলি থেকে একটা পেঁয়াজ বের করল ছাড়ানো, একটুকরো রুটি ছিঁড়ে মুখে নিয়ে প্রায় দন্তহীন মাড়িতে হাঁ করে পেঁয়াজে একটা বড় কামড় দিতেই মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেড়িয়ে এলো ওর, কষ বেয়ে নামতে লাগলো রক্ত; আর বুড়ি মুখবিকৃত করে পৈশাচিক ভঙ্গিতে চোখ বড়বড় করে ক্ষুধার্ত পশুর মতো পেঁয়াজে আরো একটা কামড় দিলো, রক্ত ঝরে পড়ল ওর সাদা থানের ওপর। ভয়ে আতঙ্কে এবারে গলা দিয়ে একটা প্রবল আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো অপর্ণার, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভেতর থেকে একটা গোঙানির শব্দ ভেসে এলো। অপর্ণা কিছু ভাবতে পারছিলেননা, একটা পাগল করা ভয় তাঁকে জাপটে ধরলো; পৈশাচিক বুড়ির মুখের সামনে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে ছুটে গিয়ে যা দেখলেন তাতে আরো একটা প্রবল ভয়ের ধাক্কা ওঁকে চমকে দিলো, পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন তিনি। সৌমেনবাবু বুক চেপে ধরে কাঠের চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে পড়ে গিয়েছেন, মুখ দিয়ে ভলকে ভলকে রক্ত উঠছে; পাশে বইটা পড়ে আছে মেঝেতে। অপর্ণা ছুটে বাইরে এলেন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে, কোথায় সেই বুড়ি? কোত্থাও নেই; শুধু রক্তমাখা পেঁয়াজ পড়ে আছে একটা। অপর্ণার চিৎকারে পাড়ার লোকেরা ছুটে এলেন, ততক্ষণে মারা গেছেন সম্পূর্ণ সুস্থ সবল হৃদযন্ত্রের এক্স আর্মি অফিসার সৌমেন চক্রবর্তী; রক্তে ভেসে যাচ্ছে তাঁর বুক।
এই ঘটনাটা আমি খোদ অপর্ণা আর সৌগতর মুখেই শুনেছিলাম ওঁদের বাড়ি বসে; তবেসৌগতর বাড়িতেই এই বুড়ির আক্রমণ প্রথম নয়। সৌগত খবর নিয়ে জানলেন, ওই বৃদ্ধার আবির্ভাব, পেঁয়াজ রুটি ও মৃত্যু....প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে খুড়িগাছির কাছেও একটি বাড়িতে তার কিছুদিন আগে। ঘটনাটা দাবানলের মতো দ্রুত সংক্রমণ ছড়ালো গোটা সোনারপুরে, অবশ্যই লোকমুখে বিকৃত রূপ নিয়ে। একসময় সংক্রমণটা এমন রূপ নিয়েছিলো, যে মূল ঘটনাটা হারিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য একটা ঘটনা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। মুখে মুখে প্রচলিত 'পেঁয়াজ বুড়ি' র বিভীষিকায় এলাকার বাসিন্দারা বাড়ির মেনগেটের পাশে লাল আলতা দিয়ে 'ওঁ' লিখে রাখা শুরু করলো। একটা সময়(আমি নিজে প্রত্যক্ষদর্শী) বাচ্চারা ঘুমোতে বা খেতে না চাইলে মায়েরা ভয় দেখাতো, "এক্ষুণি পেঁয়াজবুড়ি আসবে!'' কিন্তু মূল ব্যাপারটা হলো, পেঁয়াজবুড়ির সত্যিই আবির্ভাব ঘটেছিলো অদ্ভুতভাবে; প্রত্যক্ষদর্শী অপর্ণা বা সৌগত আমাকে মিথ্যা বলবেননা। হয়তো দু'তিনবারই সে এসেছিলো, তারপর আবার হারিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সে কে ছিলো? এর জবাব কী কোনোদিন পাওয়া যাবে!!
বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না-১৩
লন্ডনের বেয়ারহাইন্ড রোডের মোড়ে হঠাৎ একটা চিৎকার লোডশেডিং'য়ের মধ্যে, "হ্যাল্লো! শিগগিরি কেউ আলো নিয়ে আসুন; শিগগিরি! আমরা লন্ডন পুলিশের লোক; জাপটে ধরেছি স্প্রিংহিল জ্যাককে! আলো না আনলে পালিয়ে যাবে!! প্লিজ!'' চিৎকারটা শুনে একটা বাড়ির ভেতর থেকে মোমবাতি হাতে ছুটে বেড়িয়ে এসেছিলো জেন অ্যালম্প নামের এক কিশোরী। সাথে সাথে পুলিশদের হাত ছাড়িয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এক বিকট বিভীষণ মূর্তি, আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিলো জেন'কে। তার বাবা আর দু'বোন সাহায্য করতে ছুটে বেড়িয়ে আসার আগেই লাফ দিয়ে তিনতলা বাড়ি পেরিয়ে পালিয়েছিলো এই কিংবদন্তী রহস্যময় দানব---স্প্রিংহিল জ্যাক!
১৮৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সন্ধ্যায় এক ভয়ানক ঘটনাটা ঘটেছিলো। আসলে বেশ কয়েকবছর ধরেই লন্ডনের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো এই রহস্যময় বিকট প্রাণী; মানুষের ওপর হঠাৎ করে কোনো বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে একলাফে দোতলা তিনতলা বাড়ি সমান লাফিয়ে পালিয়ে যায় সে। মাথায় প্যাঁচানো শিং, মুখ দিয়ে নীল রঙের আগুনের হলকা বেড়োচ্ছে, হাতদুটো বরফের মতো ঠান্ডা, সাদাকালো রোমশ শরীর। কিন্তু ওকী সত্যিই কোনো দানব? না কোনো ছদ্মবেশী মানুষ? নাকি অন্যকিছু---- বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা হয়না! ১৮৩০-১৯০৭ বারবার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে স্প্রিংহিল জ্যাকের হাতে; বহুবার পুলিশের হাতের মুঠোয় এসেও একলাফে দোতলা বাড়ি বা উঁচু পাঁচিল পেড়িয়ে পালিয়েছে জ্যাক। দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের বার্নেস কমন অঞ্চলে ১৮৩০ এর গোড়ার দিকে প্রথম আবির্ভাব হয় এই রহস্যময়ের। দক্ষিণ লন্ডনের ব্ল্যাকলিথ এলাকার একটি পানশালার পরিচারিকা পলি অ্যাডামস রাতে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হয়। পেকহ্যাম, ক্ল্যাপহ্যামেও আক্রমণ হয়। কিছুদিনের মধ্যেই টেমস নদীর অপরপাড়েও জ্যাকের আক্রমণ শুরু হয়। লুসি স্ক্যাল নামের এক কিশোরী আর তার দাদা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়। লুসি পুলিশ ও সাংবাদিকদের বলেছিলো, "জ্যাকের মুখ দিয়ে আগুন বেড়োয়, আগুনের হলকায় আমি ভাল করে ওকে দেখতে পাইনি!'' ১৮৩৮ সালের জানুয়ারিতে লর্ড মেয়র স্যার জন কাওয়ান এই আগন্তুক আততায়ীর অস্তিত্ব স্বীকার করে সংবাদ মাধ্যমকে বিবৃতি দেন। জ্যাকের আক্রমণ প্রতিহত করতে পুলিশ নাইটগার্ড বাড়ায়, পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে ওঠে। এমনকি ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নকে যিনি হারিয়েছিলেন, সেই ডিউক অব ওয়েলিংটনও বৃদ্ধ বয়সে রাস্তায় নেমেছিলেন জ্যাককে মারতে; যদিও জ্যাক কখনোই তাঁর সামনে আসেনি। ১৮৫৫'য় দক্ষিণ ডেভেনশায়ারে এক সকালে সেনাক্যাম্পের এলাকায় বরফের ওপর জ্যাকের পায়ের ছাপ পাওয়া যায়। এরপরে ১৯০৭(বিতর্কিত মত ১৯০৪)'য়ে লিভারপুলে শেষবার জ্যাক এক দম্পতিকে ক্ষতবিক্ষত করে পালানোর সময় প্রতিবেশী এক অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল তার ওপর চারবার ফায়ার করেন, জ্যাক পালায়; এরপরে আর কোনোদিনও তাকে দেখা যায়নি। প্রথমে অনেকের ধারণা হয়েছিল মার্কুইস অব ওয়াটারফোর্ড জ্যাক সেজে সবাইকে ভয় দেখান, কিন্তু প্রথমত; তিনি শারিরীক ভাবে অক্ষম ও গাউটে ভুগছিলেন, দ্বিতীয়ত; তাঁর মৃত্যুর পরেও স্প্রিংহিল জ্যাক আরো কুড়িবছর প্রায় উপস্থিত ছিলো। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড একাধিকবার একাধিক ব্যাক্তিকে জ্যাক সন্দেহে অ্যারেস্ট করে, কিন্তু তারপরেও তার বহাল তবিয়ত উপস্থিতি পুলিশের গালে চড় বসিয়ে দেয়। স্প্রিংহিল জ্যাক তাই আজো ব্যাখ্যাতীত এক রহস্যই রয়ে গেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায়।।
অলংকরণ - দিগন্ত চট্টোপাধ্যায়
No comments:
Post a Comment