Monday, 10 July 2017

খাদ্য খাদক

"স্যার, এই বিষ্টিতে জীপ বের করবো কীকরে বলুন তো? মাঠ ঘাটে একহাঁটু জল দাঁড়িয়েছে, অন্ধকারে বাইচান্স খানা খন্দে চাকা পড়ে গেলেই তো লাফরা হয়ে যাবে স্যার।ʼʼ "ঠিক আছে। তোমরা হেঁটে চলো, আমি তোমার সাইকেলটা নিয়ে যাচ্ছি।ʼʼ কথাটা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ওসি শেখর দত্ত। বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে একটানা, থামার কোনো বিরামও নেই; বরঞ্চ উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে। কাল সন্ধ্যাতেই আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছিলো, বঙ্গোপসাগর থেকে একটা জোড়ালো নিম্নচাপ উঠেছে; যার প্রভাবে গোটা পশ্চিমবঙ্গে আটচল্লিশ ঘন্টা ভারী বৃষ্টি হবে। আর সে কথার প্রমাণ স্বরুপ আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার, থেকে থেকেই এক এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই একটু আগে নুতনবাজার থানায় খবর এলো আজ বিকেলে ঘোষেদের পুকুরে ভেসে উঠেছে সনাতন কুন্ডুর বৌʼয়ের মৃতদেহ। তিনদিন আগে পুকুরে বাসন মাজতে গিয়ে আর ফেরেনি ও, পরেরদিন সন্ধ্যায় থানায় মিসিং ডায়েরী করেছিলো মালতির বর আর শ্বশুর। বলা বাহুল্য এইসব ছোটোখাটো গন্ডগ্রাম এলাকায় উল্লেখযোগ্য ঘটনা তেমন ঘটেনা, তাই সামান্য চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটলেই সারা এলাকায় সেই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এই দুʼদিন ধরে পাড়ার বৌ ঝিʼদের দুপুরের মজলিশে, সন্ধ্যায় চন্ডীমন্ডপের তাসের আড্ডায়, সকালে বুধবারের হাটে এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ তোলপাড় হলো। বলা বাহুল্য, বাইশ বছরের সুন্দরী বৌ, তার ওপর যৌবন একটু বেশী বেশীই যার শরীরে; তার চরিত্র নিয়ে গ্রামাঞ্চলে রগরগে গল্প রটবে, এটাই তো স্বাভাবিক। পুকুর পাড়ে বাসন সব পড়েছিলো, শুধু মালতিকে পাওয়া যায়নি....এই ধরণের একটা ডায়েরী করেছিলো সনাতন কুন্ডু আর তার বাপ দেবদুলাল কুন্ডু। সনাতনের কথায় স্পষ্ট ছিলো ওর বৌয়ের চরিত্র নিয়ে সন্দেহ, "অমন ভরন্ত শরীরের মেয়েছেলে, দেখুন স্যার; নির্ঘাৎ ভেগেচে কারোর সাথে।ʼʼ শেখর খবর নিয়েছিলেন আশেপাশে, সনাতন লোকটা সুবিধের নয়। প্রায় দিন রাতেই মদ খেয়ে বাড়ি এসে মালতিকে সন্দেহ করতো, পেটাতো। হয়তো সেই কারণেই মালতির হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ায় ওদের খুব একটা মাথাব্যথা ছিলোনা; আজ ঘটনাটার তিনদিন পরে থানায় খবর এলো বিকেলে পুকুরে ভেসে উঠেছে মালতির বডি। এই মূষলধারে বৃষ্টির মধ্যে একহাতে ছাতা ধরে কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে পুকুরপাড়ে পৌঁছলেন শেখর; কনস্টেবল বাবুদার সাইকেল এটা। অন্ধকারে যাওয়া আসা করতে হয় বলেই সাইকেলের সামনে একটা টিমটিমে হলুদ বালব লাগিয়েছে বাবুদা; তবে ওতে পথঘাট সেভাবে কিছু দেখা যায়না বললেই চলে। যাইহোক, পুকুরপাড়ে পৌঁছে অবাক হয়ে গেলেন শেখর; এই ভীষণ বৃষ্টিতেও সারা গ্রাম প্রায় ভেঙে পড়েছে এখানে। এই গেঁয়ো মানুষগুলো সত্যিই খুব অদ্ভুত মানসিকতার, পুকুরে ভেসে ওঠা তিনদিনের মৃতদেহও দেখার জিনিষ! ভরা বর্ষার পুকুরে প্রায় সব সিঁড়ি ডুবে গেছে, টইটম্বূর জল। পচা পানার গন্ধ আর আঁশটে গন্ধের সাথে পচা মৃতদেহের গন্ধ পাক খাচ্ছে বাতাসে; প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও গন্ধটা ঢাকা পড়ছেনা। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে শেখর গাঁয়ের লোকদের দিকে হাত নেড়ে বললেন, "আঃ! ব্যাপার কী? সরুন সরুন।ʼʼ মৃতদেহটা ভ্যানে তুলছিলো বাবুদাʼরা, তিনদিনের মৃতদেহটা ফুলে উঠেছে বেশ; চুলে, পায়ে, শরীরের এখানে ওখানে শ্যাওলা। বাবুদা মাথার ছাতাটা আড়াল করে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললো, "স্যার, এই বিষ্টিতে বডি সারারাত থানার বাইরে দাঁড় করানো থাকবে?ʼʼ শেখর ফরাসী স্টাইলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, "উপায় নেই তো বাবুদা, কাল ভোর অবধী তো ওয়েট করতেই হবে।ʼʼ বাবুদা বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে খক খক করে কাশতে কাশতে বললো, "স্যার, থানার ওদিকের বাঁশবনে তো শেয়ালও আছে। শেয়াল নেড়ি কুত্তায় যদি বডি নিয়ে টানাটানি করে?ʼʼ শেখর মাথার ভিজে চুলে আঙুল চালিয়ে ব্যাকব্রাশ করতে করতে বললেন, "আচ্ছা,ভ্যান নিয়ে চলো পুলিশ স্টেশনে; তারপর দেখছি।ʼʼ বডি নিয়ে পুলিশ স্টেশনে পৌঁছনোর পরেও যথারীতি বৃষ্টি কমার কোনো চান্স দেখা গেলোনা, মাঝে মাঝে বেগুনী বিদ্যুতের শিরা উপশিরা এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত আকাশটাকে ফালা ফালা করে দিচ্ছে। থানার সামনে এসে শেখর শেডের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছাঁট আর জোড়ালো হাওয়ার ঝাপটা বাঁচিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, "বাবুদা, একটা কাজ করো। বডিটা একটা প্লাস্টিক চাপা দিয়ে ভ্যানেই রেখে দাও; আজ রাতটা এখানে রাখা ছাড়া তো অন্য উপায়ও নেই। থানার সামনে প্লাস্টিক জড়িয়ে রাখো।'' বাবুদা ঝোড়ো হাওয়ায় ছাতা সামলাতে সামলাতে বললেন, "ক্কি....কিন্তু স্যার; শেয়াল-টেয়াল বা কুকুর-টুকুর যদি...!'' শেখর থানার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, "দুজন কনস্টেবল বসিয়ে দাও, ওই শেডের নীচে বসে থাক সারারাত। কাল ভোর চারটের আগে তো গাড়ি আসবেওনা।'' শেখর ভেতরে ঢুকে চেয়ারে বসেই কপালটা টিপে ধরলেন, রোদ লাগলে বা বৃষ্টি ভিজলেই ওঁর বিরক্তিকর মাইগ্রেন রোগটা কপালের একপাশে ছড়িয়ে যায়। সিগারেটটায় দুটো লম্বা টান দিয়ে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের একটা টোকা দিয়ে পোড়া সিগারেটটা টেবিলের পায়া তাক করে ফেলে দিয়ে বেলটা দু'বার প্রেস করলেন। একজন কনস্টেবল এসে দাঁড়ালো, "স্যার?'' "মাসুদ, শোনো। আজরাতে বডিটা তুমি আর জয়ন্ত পাহারা করে; ঘুম পেলে অল্টারনেটে গার্ড দেবে। কিন্তু সজাগ থেকো, শেয়াল কুকুরে যেন বডি নিয়ে টানাটানি করতে না পারে। নেগলিজেন্স করলে কিন্তু কাল ইন্সপেক্টর স্যারের কাছে জবাবদিহি তোমরা করবে। বুঝতে পেরেছো?'' মাসুদ জোড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিলো, ও ভালোমতোই বুঝতে পেরেছে। শেখর বললেন, "আচ্ছা, এখন যাও।আর..... সজাগ থেকো।'' মাসুদ বেড়িয়ে গেলো। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে অনবরত, ঝোড়ো হাওয়ার দাপট কমলেও মাঝে মাঝেই আকাশের বুক চিরে দিচ্ছে বেগুনি বিদ্যুতের শিরা উপশিরা; আর তারসাথে কানফাটানো বাজের শব্দ। থানার পেছনদিকে বিশাল এলাকা জুড়ে বাঁশবাগানে 'শর শর' শব্দ হচ্ছে, আজ রাতে আর কমার কোনো চান্স নেই। রাতের খাবার খাওয়ার ইচ্ছেও করছিলোনা শেখরের, ভোরে গাড়ি আসবে বডি নিতে; এই বৃষ্টিতে আর কোয়ার্টারে ফিরতে ইচ্ছে করছিলোনা ওঁ্র। কাঠের চেয়ারেই গা এলিয়ে দিলেন শেখর, সারাদিনের পরিশ্রমে শরীরটাও টায়ার্ড লাগছিলো খুব; মাথার যন্ত্রণা বাড়ছে। কখন দু'চোখে ঘুমের আঠা জড়িয়ে এসেছে বুঝতে পারেননি শেখর, হঠাৎ একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো ওঁর। বাইরে ঝড়, বজ্রপাত থেমে গেছে; ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ আসছে আলতো। শেখর হাতঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলেন রাত সাড়ে এগারোটা; এতোক্ষণ ঘুমিয়েছেন! বাবুদাও ফিরে গেছে কোয়ার্টারে; বাইরে একটা শব্দ হচ্ছেনা? হ্যাঁ, ঠিক! একটা ঘরঘরে শব্দ, গোঙানির মতো; তারসাথে প্লাস্টিকের মত খড়খড়ে শব্দ। শেয়াল আসেনি তো? সর্বনাশ! টর্চটা হাতে তুলে নিয়ে উঠে পড়লেন শেখর, চেয়ার ছেড়ে ওঠার সাথে সাথেই হঠাৎ---একটা মরণপণ আর্তনাদ শুনতে পেলেন। কুকুরের চিৎকার না? হ্যাঁ...মনে হচ্ছে খুব যন্ত্রণা থেকে আর্তনাদ করছে যেন! ব্যাপারটা কী দেখার জন্য টর্চটা হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন শেখর, আর বাইরে এসেই যা দেখলেন তাতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভ্যানের ওপর বডি নেই, প্লাস্টিকটা মাটিতে একপাশে পড়ে আছে। আর---মাসুদ আর জয়ন্ত শেডের নীচে মুখ হাঁ করে ঘুমোচ্ছে; রক্ত উঠে গেলো শেখরের মাথায়! মাসুদের কোমরে একলাথি মারলেন সজোরে, হাঁউমাঁউ করে জেগে উঠলো ও; জয়ন্তও ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালো। শেখর চিৎকার করে উঠলেন, "শালা হারামি, শুয়োরের বাচ্চা...... এই তোমাদের ডিউটি? গার্ড?? ঘাড় ধরে বের করে দেবো দুটোকে।'' জয়ন্ত আর মাসুদ হাতজোড় করে কঁকিয়ে উঠলো, "স্যা....স্যার!! ভুল হয়ে গেছে স্যার....ক্ষমা করে দিন স্যার!'' শেখর ভ্যানের কাছে ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বললেন, "বডি কোথায়? বলো!! বডি কোথায়? শালা হারাম...'' কথাটা থেমে গেলো ওঁর, কুকুরের গলার বীভৎস একটা রক্তজল করা আর্তনাদ শোনা গেলো খুব কাছেই। চমকে উঠে টর্চটা জ্বেলে বাঁশবনের দিকে ছুটলেন শেখর, পেছনে পেছনে মোবাইল টর্চ জ্বেলে মাসুদও। কিন্তু বেশীদূর যেতে হলোনা, দশ-বারোহাত গিয়েই পেছন থেকে শুনতে পেলেন মাসুদের আর্তনাদ। থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে দেখলেন ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে একপাশের বাঁশগাছগুলোর নীচের মাটিতে মোবাইল টর্চের আলো ফেলে দাঁড়িয়ে আছে মাসুদ, যেন একটা মূর্তির মতো। ওর মুখটা হাঁ হয়ে গেছে, চোখদুটো বিস্ফারিত; শেখর দ্রুত ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, "কি ব্যাপার কি মাসুদ? হঠাৎ এভাবে..." কথাটা শেষ করতে পারলেননা ওঁ; কারণ মাত্র আড়াই-তিনহাত দূরের জিনিষটা উনিও দেখেছেন, ওঁর বড় টর্চের আলো সরাসরি পড়েছে ওখানে। শেখরের মুখটা হাঁ হয়ে গেলো প্রবল বিস্ময়ে, ওঁর শিরদাঁড়া যেন একটা বরফের কুচি গলে পড়লো! তিনহাত দূরে পড়ে আছে মালতির মৃতদেহটা, তারপাশেই একটা বড়মাপের নেড়িকুকুরের দেহ। আর....নেড়ি কুকুরটা বেঁচে নেই! ওর মাথায় গভীর ক্ষত! চারপাশে রক্ত ছড়িয়ে আছে মাটিতে! মালতির মৃতদেহের মুখে ঠোঁটে রক্তমাখা, মুখটা হাঁ; আর....এখনো দাঁতে কামড়ে ধরে আছে কুকুরটার ছেঁড়া কান।।

                   -----------------------

                                 অলঙ্করণ- সুদীপ্ত ধর

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...