Tuesday, 11 July 2017

আরাকু

ভদ্রলোক, তাঁর স্ত্রী আর বছর পাঁচেকের ছোট্ট মেয়েকে দেখে প্রথম দর্শনেই বুঝেছিলাম বাঙালি। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে এসে বাঙালির মুখ দেখলে বেশ ভালো লাগে। আর এই বিশাখাপট্টনমে এসে অবধী একটিও বাঙালির মুখ দেখিনি; সবাই দক্ষিণী, সর্বত্র তেলুগু। যেচে আলাপ করাটা কোনোদিনই আমার ধাতে পোষায়না; ভদ্রলোক নিজেই যেচে আলাপ করলেন আমার হাতে বাংলা বই দেখে, "বাঙালি?"
"হ্যাঁ, নমস্কার।"
"কোথা থেকে আসছেন?"
"কলকাতা, আপনি?"
"হাওড়া; এখানে কি শুধুই ট্যুর নাকি...?"
"না না; নেহাৎ হলিডে। আপনি কি কোনো কাজে?"
"নাঃ! আমিও....হলিডে। এই যে আমার স্ত্রী শ্রুতি; আর মেয়ে শেলি; আর...আমি বোধি; বোধিসত্ত্ব মুখার্জি।"
নিজের পরিচয়টা দিলাম; আমি লেখক শুনে স্বামী স্ত্রী দুজনেই অবাক। শ্রুতি বললেন, "আপনার লেখা যদিও পড়িনি, কিন্তু সামনে থেকে একজন লেখককে দেখছি এইতো বড় কথা।"
বিনয় করে হাসলাম একটু। বোধিসত্ত্বর বয়স সম্ভবত ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে; যুবক মানুষ। বলিষ্ঠ শরীর, চওড়া কাঁধ; এরকম কাঁধ দায়িত্ব নিতে পারে মনে হয়। এলোমেলো চুল মাথায়, গাল একটু ভাঙা; মানুষটার মোটের ওপর সুদর্শন চেহারা বলা যায়। শ্রুতি ছাব্বিশ-সাতাশের ওপরে হবেননা; ফর্সা ছিপছিপে চেহারা, তিক্ষ্ম নাক, সাদা কালো প্রিন্টেড শালোয়ার কামিজ আর ওড়না পরিহিত। কপালে হাল্কা সিঁদুরের ছোঁয়া, হাতে সরু শাঁখা পলার সাথে ঘড়ি, গলায় সরু সোনালি চেন। সুন্দরী বলা না গেলেও সুশ্রী বলাʼই যায়; ওঁদের মেয়েটির বয়স পাঁচ ছয় বছর হবে। ওঁরা দুজনেই অনেক কথা বলছিলেন; মাঝে মাঝে মেয়েটার অনর্থক বকবকের সাথে সামালও দিচ্ছিলেন। রিস্টওয়াচে সবে সাতটা; আরাকু পৌঁছতে এখনো পাঁচঘন্টা। ট্রেনের দুলুনিতে চোখে ঘুমের আঠা জড়িয়ে আসছে; শ্রুতি এখন মেয়েকে কেক খাওয়াচ্ছেন, আর বোধি চোখ বড় বড় করে মেয়েকে তার ফেভারিট ʼছোট্টা ভীমʼ এর গল্প শোনাচ্ছেন। আমি দেখছিলাম এই সুখী পরিবারটাকে.....এক দম্পতি, তাঁদের ছোট্ট মেয়ে, হাওড়ার ছোটো একটা ফ্ল্যাট। আর্থিক অবস্থা মধ্যবিত্ত; তবু এই অভাবের বাজারেও এরা দুʼবেলা ভাত খায়, প্রতি রবিবার মাছ বা চিকেন। মাসের প্রথমে হয়তো একটু বিলাসিতা.....একদিন রান্না না করে কোনো ছোটো রেস্টোব়্যান্টে ডিনার করা, বা বিগবাজারে টুকটাক কেনাকাটা। মধ্যবিত্ত গৃহস্থের ছোটো ছোটো ঘটনার মধ্যে দিয়ে সুখ খুঁজে নেওয়া; অল্পে সুখ অল্পে দুঃখ; ছোটো খাটো মান অভিমান! বিয়ে হয়েছে কʼদিন? বড়জোড় বছর সাতেক। প্রেমের বিয়ে নিশ্চয়ই...একটা দৃশ্য দেখছিলাম চোখ বুজিয়ে সিগ্রেটে টান দিয়ে; কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা। হাত ধরাধরি করে দুটি তরুণ তরুণি হেঁটে যাচ্ছে; মেয়েটির নাম শ্রুতি, ছেলেটির নাম বোধি। মেয়েটি কলেজ থেকে ক্লাস কেটে বেড়িয়ে এসেছে, ছেলেটি অফিসে মায়ের অসুখ বলে ছুটি চেয়ে! ওদের জন্য চুরি করা দুর্লভ এক একটা বিকেল; পকেটে পয়সা বেশি থাকলে একটা ট্যাক্সি ডেকে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘোরা। তারপর.....তারপর বাড়িতে জানাজানি! শ্রুতির গালে বাবা চড় মারলেন; সেই প্রথম। ছোটো থেকে গায়ে হাত তোলেনি বাবা; সেই বাবা কিনা আজ ওকে...! কঠিন গলায় বাবা বলছেন, "ছেলেটাকে ভুলে যাও। পড়াশোনা করো; এসব আমি মেনে নেবোনা!" বাবার মুখ চোখ কঠিন; মা চোখ মুছে পাশের ঘরে চলে গেলেন। শ্রুতি বাবার ওপর অভিমানে হাতে ছুরি চালালো.....রক্তারক্তি কান্ড। এই সব সময় বাংলার সব বাবা আর মেয়েকে একরকম লাগে; জীবনের একটা অধ্যায়। হাসপাতালে মেয়ের বেডের পাশে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক নিশ্চয়ই বলেছিলেন, "তোর ভালো চাই বলেই বলি রে মা! আমার মারʼটা দেখলি? ভালোবাসাটা দেখলিনা? আমি আর তোর মা কত কষ্ট করে বড় করেছি তোকে....!" বাবা ভদ্রলোকটির চোখে জল এসে গেছিলো; মা কাঁদছিলেন ডুকরে ডুকরে.....তারপরে সেইদিন। বোধির সাথে ফাল্গুনের এক শুভ দিনে শুভ পরিণয়; কেউ দিলো ডিনার সেট, কেউ দুল, কেউ চুড়ি দুʼগাছা, কেউ শাড়ি, আংটি। মালা বদল; বাসরঘরে কয়েকজন বন্ধু বান্ধব, হাসি ঠাট্টা; বিরিয়ানি কবিরাজি চিকেন চাঁপ। তারপর হনিমুন.....হয়তো পুরী। সমুদ্রের ধারে হোটেল; বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখা, ঝিনুক কুড়োনো, চাঁদের আলোয় বিরাট একটা আয়নার মতো বঙ্গোপসাগর; এক সপ্তাহ স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে কেটে গেল! তার দেড় বছর পরে......ঘন ঘন ডক্টরের কাছে যাওয়া; তারপর....এলো এই শেলী। বিরক্ত হলেন হয়তো বোধির বিধবা মা; তিনি চেয়েছিলেন আর পাঁচটা গল্পের মতো ছেলে হোক। তারপর....মায়ের সাথে ছেলে আর ছেলের বৌয়ের বনিবনা নেই! অফিস থেকে বাড়ি ফিরে বোধির রোজ দেখা জানলার ধারে শ্রুতি দাঁড়িয়ে, চোখে জল, ঠোঁট কামড়ে কান্না চাপতে চাপতে বলে, "তুমি অন্য কোথাও আমায় নিয়ে চলো প্লিজ; আর ভালোলাগছেনা এখানে। মা রোজ রোজ এরকম ব্যবহার করেন কেন আমার সাথে!" বোধি শ্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করতো হয়তো; ফিসফিস করে বলতো, "একটু গুছিয়ে নিই..." তারপর একদিন হয়তো অফিস থেকে ফিরে বলেছিলো, "শ্রুতি, হাওড়ায় এক কলিগ কম দামে ফ্ল্যাট দেখেছে; ডিসেম্বরে ওখানে চলে যাবো আমরা সব্বাই..." তারপর বিছানায় শোয়া শেলিকে কোলে তুলে নিয়ে "....কি শেলি? আমার বুচকু, আমার ফুচু, আমার ঘুচু, ভুত্তু...যাবে তো?" তারপর আরেকটি দৃশ্য; সেই কলেজ স্ট্রিট, শেলি হাত ধরে আছে একটি যুবকের। এর নাম এখনো কেউ জানেনা; আমি দিলাম সিদ্ধার্থ, সিড! তারপরের দৃশ্যে, বোধির চোখে চশমা; মাথার চুলে অল্প রুপোলি ছোঁয়া, শেলির গালে চড় মারলো টেনে; শ্রুতি চোখ মুছে ঘর থেকে পাশের ঘরে চলে গেলো........সব একরকম! শেলি আর সিদ্ধার্থও একদিন তাদের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এরকমই বোররা গুহালূ দেখতে যাবে আরাকু ভ্যালির ট্রেনে চেপে; কিন্তু সেদিনও কোনো লেখক ওদের সহযাত্রী হবে কি?...........
"দেববাবু...উঠুন; আরাকু স্টেশন এসে গেছে।" ধড়মড় করে উঠলাম; দুপুরের রোদ চুঁইয়ে পড়ছে ট্রেনের জানলা দিয়ে, বোধিই ডেকে দিলো। শ্রুতি হেসে বললো,
"ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তো? তা তো পড়তেই পারেন...এতো ভোরে!"
হাতের বইটা মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলো, তুলে দিলো বোধি। লজ্জিত ভাবে বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ মি.মুখার্জি!" ছোট্ট পাহাড়ে ঘেরা ভ্যালি স্টেশনটায় নেমে কোনো গাড়ির জন্য হাঁটা দিলাম; ওরাও বাইরের বাস স্ট্যান্ডটার দিকে এগোলো। দাঁড়িয়ে পড়ে চেয়ে রইলাম এই সুখী ছোট্ট পরিবারটার দিকে; যতক্ষণ না ওরা হারিয়ে যায় চোখের বাইরে। দৃশ্যটা চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে তারপরেই; কিন্তু একটা গল্প রয়ে যাবে আমার জন্য, কলকাতায় ফিরেই লিখতে হবে; নাম দেবো, আরাকু।।
                         ------------------

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...