Monday, 10 July 2017

বাদাবনে, চাঁদের আলোয়....

"এই বাদাবনের সব বাঘ....বাঘ নয় কর্ত্তা! কখনো কখনো আসলের সাথে নকলও মিশে থাকে কিছু; আলাদা করে চেনা যেতি পারেনা।" ভাঙা খসখসে গলায় চোখ বড় বড় করে বললো জয়নাল মিঞা। বয়স হয়েছে মানুষটার, গালে অজস্র হিজিবিজি বলিরেখা; মাথার একরাশ কোঁকড়ানো চুল সম্পূর্ণ সাদা, তালঢ্যাঙা মানুষটার দড়ির মতো পাকানো শরীর। বয়স সত্তরও হতে পারে, নব্বইও হতে পারে; তবে বেশ শক্তসমর্থ। মিশকালো রঙের মানুষটা শার্টের ওপর একটা হাতকাটা সোয়েটার পড়েছে, গলায় মাফলার, আর লুঙ্গি। লোকটার কি শীতও করেনা? জানুয়ারির হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় গৌরীশঙ্করের পরণে শার্টের ওপরে ফুলহাতা জ্যাকেট, মাথায় টুপি, তাও ঠান্ডাটা জ্যাকেট ভেদ করে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। কথা হচ্ছিলো নৌকায় বসে, রায়মঙ্গল নদীর বুকে জয়নাল মিঞার নৌকা বইছে। মাথার ওপর পিচকালো আকাশ, চিকচিকে তারা, চারপাশে ঘন কুয়াশার আচ্ছাদন; হলুদ ত্রয়োদশীর চাঁদটা পশ্চিমদিকে ঢলে এসেছে। লন্ঠনটা চাবি ঘুরিয়ে আস্তে করে দিলো জয়নাল, দুʼপাশে টানা জঙ্গল; আলো দেখে নদীতে সাঁতরে বাঘ চলে আসতে পারে নৌকায়। আর, জলদস্যুদের ভয় তো আছেই। আসলে গৌরীশঙ্কর বসু বনদপ্তরের লোক, এখানে ওঁর আসার কারণ হলো---একটা বাঘ। গত দুʼমাস ধরে কলসের কাছে এই মৌলেদের গ্রামটায় একটা ম্যানইটারের উপদ্রব হয়েছে প্রবল; যার ভয়ে গোটা গ্রাম তটস্থ। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গ্রামবাসীদের মতে; এই বাঘ নাকি মাপে অতিরিক্ত ʼবড়ʼ! যারা প্রত্যক্ষদর্শী, তারা বলেছে বাঘটা মাথায় অতিরিক্ত লম্বা; কেউ কেউ আবার বলেছে--- বাঘটা চারপেয়ে নয়, দুʼপেয়ে। তবে এসব উদ্ভট কথায় বিশেষ কান দেননি গৌরীশঙ্কর; এইসব গ্রামের অশিক্ষিত মৌলে লোকদের অবাস্তব গল্প বানানো, সবকিছুকে অতিরঞ্জিত করার স্বভাব থাকেই, এ জিনিষ তিনি আগেও দেখেছেন। তবে---আজ, এই নৌকার বুড়ো মাঝি যা বললো, এমন কথা গৌরীশঙ্কর কক্ষণো শোনেননি। তিনি পোড়খাওয়া লোক, গত ষোলো বছর চাকরি করছেন বনদপ্তরে। অন্ধকারেই দেশলাই জ্বেলে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভ্রু কুঁচকে জয়নালকে বললেন, "সব বাঘ বাঘ নয়....মানে?" জয়নাল সিগারেট আগেই রিফিউজ করেছিলো, এবার একটা বিড়ি ধরিয়ে ও ফিসফিস্ করে বললো, "কর্ত্তা, এসব আমাদের বাপ পিতেমোর মুখে শুনিচি ছেলেবেলায়! এই বাদাবনের.....সব সিংগি নাকি সিংগি নয়। সিংগি মানে বোজেন তো কর্ত্তা? রাতবিরেতে বাঘʼকে আমরা সিংগি বলি! মাঝরাতে দক্ষিণ রায় মাঝেমধ্যি খিদে মেটাতে সিংগি সেজে ঘুরে বেড়ান; পূণ্ণিমার রাতে। হিসেব করে দ্যাহেন কর্ত্তা, সিরাজের বৌ যেদিন মʼলো ও গাঁয়ে....সেদিনও পূণ্ণিমা ছেলো। আবার---গতমাসে যেদিন কালামের ব্যাটা মʼলো; সেও পূণ্ণিমা ছেলো! মৈনুদ্দিন দেখেছেলো কর্ত্তা, সিরাজের বৌʼটারে টেনে নিয়ে যাচ্চে সিংগিটা---দুʼপেয়ে!!" গৌরীশঙ্কর সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠলেন; কথাটা ভুল বলেনি জয়নাল। হিসেব মতো দুʼটো ʼখুনʼই হয়েছে পূর্ণিমায়, আর.....সত্যিই কি সাধারণ বাঘ ওই ভাবে দাঁতে নখে ছিঁড়তে পারে মানুষের শরীর? তাছাড়া......বাঘ সাধারণত শিকার মুখে করে ঘেঁষটে নিয়ে যায়; কিন্তু এক্ষেত্রে সেসবের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি! তবে কি মৈনুদ্দিনরাই ঠিক বলেছিলো? প্রাণীটা দুʼপেয়ে! পরক্ষণেই চিন্তাটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন গৌরীশঙ্কর; এই অন্ধকার রাতে, মাঝনদীতে মন দূর্বল হয়েছে তাঁর। মন সংযত করতে রাইফেলটা ভালো করে হাতে চেপে ধরে চোয়াল কঠিন করে বললেন, "জয়নাল, আমি আগামীকাল তোমাদের গ্রামের সীমান্তে মাচা করবো! যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তাহলে কাল পূর্ণিমাতেই হয়তো দেখা পাবো তোমার দুʼপেয়ে বাঘের!"

গ্রামের শেষপ্রান্তে বুড়োঠাকুরের তেঁতুল গাছটায় মাচা বেঁধে বসেছিলেন গৌরীশঙ্কর। শীতটা পড়েছে জাঁকিয়ে; শার্ট,উলের সোয়েটার আর লেদার জ্যাকেট ভেদ করে শীতটা যেন কামড়ে ধরছে ওঁর শরীরটাকে। চোখের পুরু লেন্সের চশমাটা নাকের ওপরে ভালো করে বসিয়ে গৌরীশঙ্কর বললেন, "তোমার মনে হয়; এতে আমি রক্ষা পাবো?" প্রশ্নটা যার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলেন, সে তখন গাছটার চারপাশে লাল সিঁদুর আর আলতা ছড়িয়ে দিচ্ছিলো বিড়বিড় মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে। লোকটার নাম সনাতন বা সনা বাউলে; বাউলে শব্দের অর্থ ʼরোজাʼ। আজই সকালে আলাপ হয়েছে গৌরীশঙ্করের সাথে, এখানে পাঁচ-ছʼটা গ্রামের মানুষ লোকটাকে মান্য করে; বলা যায় এদের কাছে এইসব বাউলেʼরা ঈশ্বর সমতুল্য। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রবাদ, বাউলেʼরা নাকি মন্ত্র পড়ে বাঘের মুখ বন্ধ করতে পারে; সঙ্গে বাউলে থাকলে বাঘ কাছে ঘেঁষেনা। এমনকি জেলে নৌকাদের মাছ ধরতে যাওয়ার সময় বা মৌলেদের মধু আনতে যাওয়ার সময়ও এইসব বাউলেরা নাকি মন্ত্র পড়ে ʼগাত্রবন্ধনʼ করে দেয়। তবে গৌরীশঙ্কর তাঁর ষোলো বছরের চাকরী জীবনের অভিজ্ঞতায় জানেন, যে অধিকাংশ বাউলের মরণ বাঘের মুখেই হয়েছে। সনা বাউলে কিছুটা জোড় করেই এসেছে ওঁর সাথে, ও সঙ্গে থাকলে নাকি গৌরীশঙ্করকে বাঘ স্পর্শও করতে পারবেনা। গাঁয়ের লোকেরাও বললো, "কর্ত্তা, বাউলে ঠাকুরʼকে সঙ্গে নে যান গো। তাʼইলে দক্ষিণ রায় আপনার কোনো ক্ষেতি করতি পারবেনিকো।" অগত্যা, সনাকে সঙ্গে এনেছেন গৌরীশঙ্কর। লোকটা বিড়বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়ে মাচাʼর আশপাশে আলতা সিঁদুর ছড়িয়ে দিচ্ছিলো; তাই এই প্রশ্নটা ওকে করলেন গৌরীশঙ্কর। সনা ওঁর দিকে চেয়ে চোখ গোলগোল করে বললো, "রক্ষা কি বলেন কর্ত্তা? এই সনা বাউলে সঙ্গে থাকতি দক্ষিণ রায়ের বাপের সাধ্যি নেই---এ তল্লাটে ঘেঁষ নেয়! আমার বাপ পিতেমোর কাছে শেখা এই বিদ্যে!" গৌরীশঙ্করের হাসি পাচ্ছিলো, ঠোঁট টিপে হাসি চেপে বললেন, "তাহলে সনা....সিরাজের বৌ আর কালামের ছেলেটাকে বাঁচাতে পারলেনা কেন?" সনা একটু থতমত খেয়ে গলা খাঁকড়ে বললো, "আসলে কর্ত্তা....তখন আমি তৈরী ছেলুম না! আমি তৈরী থাকলে কর্ত্তা---জঙ্গল দেইখ্যা বলে দিতে পারি; সেখেনে বাঘ ওৎ পেতে আচে কিনা! গব্ব কচ্ছিনে কর্ত্তা, কিন্তু এই সনা বাউলে বাঘের মুখ বন্ধ করবার মন্তর জানে।" দুর থেকে শেয়ালের কোরাস ভেসে আসছে; কানে তালা লাগানো ঝিঁঝিঁর কনসার্ট শুরু হয়ে গেছে গোটা বাদাবনে। ফুলকপির মতো সাদা মেঘের আস্তরণ কাটিয়ে পূর্ণিমার গোল চাঁদটা উন্মুক্ত হচ্ছে আকাশে। সেদিকে আনমনা ভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে গৌরীশঙ্কর বললেন, "আচ্ছা, সনা! জয়নাল মিঞা বলছিলো সুন্দরবনের সব বাঘ নাকি বাঘ নয়। এ ব্যাপারে তোমার কি মত?" সনা বাউলে একটু শিউরে উঠে কপালে হাত ঠেকিয়ে বললো, "ওরেবাবা....সেতো আর যে সে ব্যাপার নয় কর্ত্তা! স্বয়ং রাজা দক্ষিণ রায় মাঝে মধ্যি খিদে পেলি বিরাট দুʼপেয়ে বাঘ হয়ে গাঁয়ে ঢুকে তাঁর খিদে মেটান। এরে আমরা বলি বাবার দয়া!" গৌরীশঙ্কর ঠোঁটের কোণে চটুল হেসে বললেন, "তা তিনি তোমাকে শিকার করতে পারেননা?" সনা এতক্ষণ মাটিতে উবু হয়ে বসেছিলো, এবার উঠে দাঁড়িয়ে বুকে চাপড় মেরে বললো, "শুনে রাখেন কর্ত্তা!! এই সনা বাউলের গা বেঁধি রাখা আছে! কোনো দক্ষিণ রায়ের সাধ্যি নেই...আমায় খায়।" গৌরীশঙ্করের চোখদুটো হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠলো যেন, ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে অন্যরকম গলায় বললেন, "সনা বাউলে.....তুমি কিস্যু জানোনা! এটা একটা পিক্যুলিয়ার রোগ---চাঁদের আলোয় যেকোনো সাধারণ মানুষের হতে পারে! পূর্ণিমার ফুল মুন দেখলে নিজেকে তখন কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যায়....রক্ত মাংসের জন্য তখন পাগলের মতো খিদে পায়!" সনার চোখদুটো প্রবল আতঙ্কে বড় বড় হয়ে যাচ্ছিলো, মুখটা হাঁ, এই শীতেও ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিলো! চোখের সামনে গৌরীশঙ্করের শরীরটা দ্রুত বদলে যাচ্ছিলো, অতিরিক্ত বড় হয়ে যাচ্ছিলো ওঁর শরীরটা, গায়ের চামরা হলুদ হয়ে আসছিলো, কালো ডোরাকাটা কালশিটের মতো দাগ ফুটে উঠছিলো সারা শরীরে; গায়ের হলুদ লোম বড় হয়ে উঠছিলো দ্রুত; আঙুলের নখ আর চোয়ালের দাঁত সাজানো ছুরির মতো বেড়ে উঠছিল। শরীরের শার্ট, সোয়েটার, জ্যাকেট ছিঁড়ে গেলো মুহূর্তে! সনা বাধা দেওয়ার আগেই মাচা থেকে বিরাট বাঘমানুষটা আকাশ কাঁপিয়ে গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর ওপর। সনার বারম্বার আর্তনাদ চাপা পড়ে যাচ্ছিলো দানবটার প্রবল গর্জনে! বাদাবনের আকাশে তখন পূর্ণিমার গোল চাঁদ আলোছায়ার ম্যাজিক শুরু করে দিয়েছে।।           
                  ------------------------

                                     অলঙ্করণ-সুশোভন রফি

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...