Wednesday, 9 May 2018

মাতৃপূজা


প্রথম দৃশ্য
(জেলখানার মধ্যে বিপ্লবী বিজয়ের ওপরে অকথ্য অত্যাচার করছেন দারোগা বিধুবাবু আর ডগলাস সাহেব।)
ডগলাসঃ- বলো! ঠিক করিয়া বলো কোথায় আছে ওই মুখুন্ডা ডাস? বলো নিগার! নইলে টোমাকে আমি শেষ করিয়া দিবো।
বিজয়ঃ- জানিনা!
ডগলাসঃ-(ধমকে) স্ক্রাউন্ডেল নেটিভ! সত্য করিয়া বলো-কোঠায় মুখুন্ডা? কোঠায়?
বিধুবাবুঃ-ডগলাস স্যার--এই লোকটা সব জানে। আজই সন্ধ্যায় ও-ওই মুকুন্দ দাশের একটা গোপন ডেরা থেকে এই হতভাগাকে পাওয়া গেচে! মুকুন্দ তার দলবল নিয়ে আগেই পালিয়েচে। তবে--তার ওই হারমোনিয়াম খানা আমরা উদ্ধার করেচি!
ডগলাসঃ-(হিংস্র হেসে)ওওহো! তবে তো এই নিগারকে ছাড়া চলিবেনা। (বিজয়ের কলার চেপে ধরে)হে-হেই! টেল! টেল মি কোঠায় পলাইয়াছে মুখুন্ডা ডাস। (চিৎকার করে) আই ওয়ন্ট ইওর রাইট কনভেঈন্স!
বিজয়ঃ- (হুঙ্কার)বলবোনা! আর একবার যদি নিগার বলো সায়েব....জিব টেনে ছিঁড়ে নেবো তোমার।
(সাহেব মাটিতে হাত বেঁধে পড়ে থাকা বিজয়কে লাথি মারেন)
বিজয়ঃ- (আর্তনাদ)আঃ! আঃ!
ডগলাসঃ- স্ক্রাউন্ডেল নিগার।
বিধুবাবুঃ- বল; বলে দে হতভাগা! কেন ওই হতভাগা খুনে ডাকাতটার জন্য মার খাবি?
বিজয়ঃ- খবর্দ্দার! খবর্দ্দার সাহেব! ও কতা মুখে আনবেনা। মুকুন্দদা খুনী? ডাকাত?
বিধুবাবুঃ- বটেই তো! তিনজন কনস্টেবলকে গুলি করে মেরেচে সে। গান বেঁধে কাঁচা বয়সের ছেলেদের মাতা খেয়েচে! তাদের  দিয়ে একটার পর একটা ডাকাতি করিয়ে চলেচে।
ডগলাসঃ- টুমি যদি না বলো- টুমাকে আমি এমন পানিশমেন্ট দিবো টুমি কল্পনাও করিতে পারিবেনা!
বিজয়ঃ- কি করবে তুমি লালমুখো শয়তান? (ক্রর হেসে) পারবেনা! কিছুতেই পারবেনা আমার মুখ থেকে বের করতে।
ডগলাসঃ- (বিধুবাবুর দিকে চেয়ে)ভটচায্যি, আই ওয়্ন্ট আ নেটিভ ফ্ল্যাগ.....নাঔ! যাও, নিয়া আইসো।
বিধুবাবুঃ- আচ্ছা স্যার!
(বিধুবাবু একখানি ভারতের পতাকা নিয়ে এলেন)
ডগলাসঃ-(বিজয়ের ঘাড় চেপে ধরে দাঁত খিঁচিয়ে) হেঈ নিগার! থ্রোউ স্পিটল ইন দিজ় ফ্ল্যাগ। থ্রো...থ্রোউ নাঔ!
বিধুবাবুঃ- (ক্রর হেসে ভ্রু নাচিয়ে) সায়েব তোকে ওই পতাকার ওপর থুতু ফেলতে বলচে; ফেল হতভাগা! ফেল!!
বিজয়ঃ- (চোখ বড় বড় করে) আমায় তুই মেরে ফেল লালমুখো কুকুর! মেরে ফেল! তবু একাজ আমি করবোনা!(চিৎকার করে) মরে গেলেও না!!
ডগলাসঃ-(লাথি মেরে) আই স্যয় থ্রো স্পিটল---থ্রো!
বিজয়ঃ- (যন্ত্রণাকাতর মুখে) বন্দে......মাতরম!!(ডগলাস পুনর্বার লাথি মারে)বন্দে.......মাতরম!!
ডগলাসঃ- বল তাহলে....বল!
বিজয়ঃ- বললাম তো....বলবোনা!
ডগলাসঃ-(কোমর থেকে রিভলবার বের করে)তো মৃত্যুর জন্য প্রস্ত্তত হও।
বিজয়ঃ- (সচিৎকারে) বন্দে........মাত....রম্!
(ডগলাস পকেট থেকে রিভলবার বের করে বিজয়ের কপালে ফায়ার করে)
বিপ্লবীঃ- (মৃত্যুযন্ত্রণায়) আ-আ-আ-আ-ব-ন্দে-মা-ত-র-ম!!
          (পর্দা নেমে যায়, প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য
    (আবহ সংগীতের সাথে স্টেজে ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠবে, দেখা যাবে চারণকবি গান গাইছেন হারমোনিয়াম বাজিয়ে, দুʼপাশে চারজন বিপ্লবী)
মুকুন্দঃ-(গান) বন্দেমাতরম!
         বন্দেমাতরম! বন্দেমাতরম!
        বন্দেমাতরম বলে নাচো রে সকলে
       কৃপাণ খুইয়া হাতে দেখুক বিদেশী
       হাসুক অট্টহাসি কাঁপুক মেদিনী
        ভিম পদাঘাতে বন্দেমাতরম!
      বাজাও দামামা ধরো ধামসা ঢোল
       শঙ্খ কলতান; জয়ডঙ্কা খোল!
       নাচুক ধমনী শুনিয়া সে বোল
      হোক নুতন খেলা শুরু এ ভারতে!
       বন্দেমাতরম বন্দেমাতরম
             বন্দেমাতরম!!
    এখনো কি তোদের আছে ঘুমঘোর?
    গেছে কূলমান মোছো আঁখি লোʼর;
     হও আগুয়ান ভয় কিরে তোর?
   বিজয় পতাকা তুলে নিয়ে হাতে---
              বন্দেমাতরম্!!
(হঠাৎ গান থামিয়ে দেবে, একজন বিপ্লবীর প্রবেশ)
বিপ্লবীঃ- মুকুন্দদা! পা....পালাও!! গোরা পুলিশরা এ....এদিকেই ছুটে আসছে!
মুকুন্দঃ-কি....ক্কি বললে অশোক? পুলিশ?
অশোকঃ- হ্যাঁ...হ্হ্যা মুকুন্দদা! একজন গোরা পুলিশ আর...আরেকজন দিশি দারোগা!
মুকুন্দঃ-(গায়ের আলোয়ান ভালো করে জড়িয়ে)শো..শ্শোনো; অশোক! তরুণ, সুখেন। তো...তোমরা আমাদের গোপন ডেরায় পালিয়ে যাও!! আমি চললাম! আমাকে ওরা কোনোভাবেই ধরতে পারবেনা।(মাথা থেকে আলোয়ান দিয়ে দ্রুত প্রস্থান)
     (বিধুবাবু আর ডগলাসের প্রবেশ)
ডগলাসঃ- (রিভলবার উঁচিয়ে) হেই! ডোন্ট মুভ! ডোন্ট মুভ এনিবডি!
বিধুবাবুঃ- এবার? সব ব্যাটাকে গারদে পুরবো! ব্যাটাচ্ছেলেরা এখেনে লুকিয়ে ছিলো?
      (সবাই হাত তোলে ওপর দিকে)
ডগলাসঃ-(বিধুবাবুর উদ্দেশ্যে)বাট ভটচায্যি; হু ইজ মুখুন্ডা?
বিধুবাবুঃ-(চোখ গোলগোল করে) তাইতো! মুকুন্দ দাশ তো এখানে নেই! কিন্তু.....ছিলো স্যার! তার প্রমাণ ও...ওই হারমোনিয়াম। পালিয়েচে স্যার; আবার পালিয়েচে!
ডগলাসঃ- হোয়াট? ভটচায্যি....আমি ইহাদের দেখিতেছি, টুমি দেখো কোথায় মুখুন্ডা! যাও..কাম অন....গোওওও! আমরা একটু আগেও শুনেছি সে গান গাহিটেছিলো...এর মধ্যে কোঠায় পালাইবে?
           (বিধুবাবুর দ্রুত প্রস্থান)
ডগলাসঃ- আই উইল এরেস্ট অল অফ ঈউ! চলো--চলো আমার সহিত! কোনো চালাকির চেস্টাও করিবেনা। তাহা হইলে আমি ফায়ার করিটে বাধ্য হইবো! চলো! গোওওও!!
বিপ্লবীরাঃ-(একত্রে) বন্দে....মাতরম্!
                   (প্রস্থান)

তৃতীয় দৃশ্য
  (মুকুন্দ দাশ পালাচ্ছিলেন, সহসা বিধুবাবুর প্রবেশ)
বিধুবাবুঃ- দাঁড়াও মুকুন্দ!! দাঁড়াও!(রিভলবার উঁচিয়ে)
মুকুন্দঃ- (পিছনে চেয়ে থমকে যায়)এ...একি? পুলিশ!!
বিধুবাবুঃ-(অট্টহাস্য)হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! কি ভেবেছিলে মুকুন্দ দাশ? গোরা পুলিশরা এতোই বোকা? তুমি দিনের পর দিন.....পার্বত্য মূষিকের মতো পালিয়ে বেড়াবে, আর আমরা? আমরা অরণ্যে রোদন করে বেড়াবো? হাঃ হাঃ হাঃ! এবার কি করবে তুমি?
মুকুন্দঃ-(ঘুরে দাঁড়িয়ে)মুর্খ তুমি দারোগা সাহেব! মহা মুর্খ!! বাঙালি হয়ে, বাংলা মায়ের সন্তান হয়ে লালমুখো সাহেবদের গোলামি করছো...শুধু দুটো পয়সার জন্য? ছিঃ! ছিঃ! ধিক্ তোমাকে দারোগা সাহেব-ধিক্।
বিধুবাবুঃ- (ক্রর হেসে)ওভাবে তো আমাকে ভোলানো যাবেনা মুকুন্দ দাশ। পালাবে ভেবেচো আবার? উঁহু! ওটি হচ্চেনা; আমি..এই বিধুভুষণ ভটচায্যি থাকতে ওটি আর হচ্চেনা।
মুকুন্দঃ-(ওপরে দুʼহাত তুলে)ধরো, ধরো আমাকে; ধরো। তোমাদের মতো নীচ; সাহেবদের পা চাটা কুকুরদের এই মুকুন্দ দাশ ঘৃণা করে, দারোগা সাহেব! যারা--দুটো পয়সার জন্য ঐ নীচ লালমুখো শয়তানদের পা চাটে; আমি তাদের ঘৃণা করি, ছিঃ! (মুকুন্দ থুথু ছেটায় মাটিতে)
বিধুবাবুঃ-(অন্ধরাগে)মু-কু-ন্দ-দা-শ!
(মুকুন্দ লাফিয়ে উঠে বিধুবাবুর হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নেয়)
বিধুবাবুঃ- আঁ আঁ আঁ(আর্তনাদ)!
মুকুন্দঃ-(রিভলবার উঁচিয়ে)হাঃ হাঃ হাঃ। অত সহজে কি মুকুন্দ দাশকে ধরা যায় দারোগা সাহেব? বন্দুক হাতে থাকলেই ক্ষমতার বড়াই তোমাদের, আর নিরস্ত্র হলেই সব ক্ষমতা--লোপাট? কই? করো দেখি আমাকে গ্রেপ্তার, করো!!
বিধুবাবুঃ-(হাতজোড় করে ভীতকন্ঠে) মুকুন্দ...মুকুন্দ! ছেড়ে দাও আমাকে! দয়া করো আমাকে; মেরোনা বাবা! আমি চাকুরি করি মাত্র। ছেড়ে দাও বাবা! আমায় তুমি ছেড়ে দাও!!
মুকুন্দঃ-অত সহজে? তোরা আমাদের দেশের মানুষগুলোর ওপর কুকুরের মতো অত্যাচার করিস! বন্দুকের সামনে আমাদের দেশের অসহায় মানুষগুলো যখন হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চায়.....তখন? তখন তোরা তাদের শেষ করে দিস নির্দয় ভাবে। না--তোকে আমি ছাড়বোনা! দেশের মানুষ হয়ে যারা দেশের মানুষের সর্বনাশ করে....তাদের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবি।
বিধুবাবুঃ-(সবেগে মাথা নেড়ে) না ন্না না!!
(সহসা আবহে বুটের শব্দ)
মুকুন্দঃ-ও...ওই বোধহয় গোরা পুলিশরা এসে গেলো আর তো থাকা চলেনা! মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হও দারোগা সাহেব, মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হও।
(গুলির শব্দ, বিধুবাবু আর্তনাদ করে বুক চেপে পড়ে গেলেন, মুকুন্দের সবেগে প্রস্থান। তৎক্ষণাৎ ডগলাসের প্রবেশ।)
ডগলাসঃ- এ...একি? ভটচায্যি!!!
বিধুবাবুঃ-(গোঙাতে গোঙাতে) স্যা...স্স্যার! মু..ম্মকুন্দদ্দ.....!(মাথাটা ঢলে পড়লো)
ডগলাসঃ-নোওওওও!!(চিৎকার করে)মুখুন্ডা ডাস!! আই উইল এরেস্ট ঈউ এনি....কউস্ট!!
                    (প্রস্থান)

চতুর্থ দৃশ্য
     (সাবেকি আমলের ঘর; চেয়ার, টেবিল, খাতা, দোয়াত, কলম, আর কেদারায় বসে লেখায় নিমগ্ন রবীন্দ্রনাথ।)
রবীন্দ্রনাথঃ- (লিখতে লিখতে ফিসফিস করে)
               তখন রাত্রি আঁধার হলো
                   সাঙ্গ হলো কাজ
                দুʼএকজনে বলেছিল
               আসবেনা কেউ আজ।
             মোদের গ্রামের দুয়ার যত
              রুদ্ধ হলো রাতের মত,
             আর সকলে বলেছিলো
              আসবে মহারাজ!
(কলম থেমে যাবে, অন্যদিকে চেয়ে স্মিত হেসে অস্ফুট স্বরে)
            আমরা হেসে বলেছিলেম
             আসবেনা কেউ আজ।
         (চাকর বনমালির প্রবেশ)
বনমালিঃ-আসবো বাবামশাই?
রবীন্দ্রনাথঃ-(বিভোরতা কেটে চমকে)কে?ও,তুমি?এসো, এসো। কিছু বলবে বুঝি?
বনমালিঃ-আজ্ঞে বাবামশাই, এক কাবলেওয়ালা এসচেন দ্যাকা করতে!
রবীন্দ্রনাথঃ-কি? কাবুলিওয়ালা? বাবাঃ! তা সে কি চায়?
বনমালিঃ-আজ্ঞে...আপনার সাথে দ্যাকা করতে চায়!
রবীন্দ্রনাথঃ-আমার সাথে? কাবুলিওয়ালা? নাঃ!তাহলে তো দেখা করতেই হয়। কিন্তু....আমি তো এখন লেখা ছেড়ে উঠতে পারিনে, ব্যস্ত আছি। তাকে তুমি এখানে নিয়ে এসো।
বনমালিঃ-আজ্ঞে বাবামশাই।
           (বনমালির প্রস্থান)
রবীন্দ্রনাথঃ-(কলম কলমদানীতে রেখে)ব্যাপার কি? হঠাৎ আমার কাছে কাবুলিওয়ালা কেন? নাঃ! ভাবিয়ে তুললে দেখচি।
          (কাবুলিওয়ালার প্রবেশ)
কাবুলিঃ-আরে; নমস্তে নমস্তে বাবুসাব, নমস্তে।
রবীন্দ্রনাথঃ-(উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে)নমস্কার। কিন্তু....আপনাকে তো ঠিক চিনলুম না!
কাবুলিঃ-হা খুদা! আপনি হামাকে কেনো চিনবেন? লেকেন, হামি আপনাকে জ়রুর চিনি; হাঁ!
রবীন্দ্রনাথঃ- আমাকে আপনি চেনেন? কিন্তু....কিভাবে?
কাবুলিঃ-কিযে বোলেন বাবুসাব! সারা দেশ যার বন্দনা কোরে, সেই বিশ্ববরেণ্য স্বনামধন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কে না চেনে?
রবীন্দ্রনাথঃ-হ্যাঁ, তা না হয় বুঝলুম। কিন্তু আপনার পরিচয় তো পেলুম না।
কাবুলিঃ-হামি কাবলেওয়ালা আছি বটে--হাঁ! কাবলেওয়ালা আছি।
রবীন্দ্রনাথঃ-হ্যাঁ(হেসে), সেতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু এই ছদ্মবেশের আড়ালে কোন বাঙালি শ্রীমান রয়েচেন; সেটা মহানুভব বলবেন কি?
কাবুলিঃ-(সচমকে)কি?(অল্প হেসে শুদ্ধ বাংলায়)ভাগ্যিস; ভাগ্যিস আপনি কবি। পুলিশের টিকটিকি হলে তো এতক্ষণে.....!
(রবীন্দ্রনাথ অবাক, কাবুলিওয়ালা দাড়ি খুলতেই দেখা যায় মুকুন্দ দাশ)
রবীন্দ্রনাথঃ-(উচ্ছসিত স্বরে)কি আশ্চর্য!! এ যে মুকুন্দ! কিন্তু...তুমি এ-এই ভাবে?
মুকুন্দঃ-আপনি তো জানেন রবীবাবু, আমার বর্তমান অবস্থা....!
রবীন্দ্রনাথঃ-হ্যাঁ, আমি শুনিচি বটে। ইংরাজ পুলিশ তোমাকে পাগলের মতো খুঁজছে।
মুকুন্দঃ-(হেসে)যাক সে কথা---আপনি বলুন তো; আপনি কি করে বুঝলেন যে আমি কাবুলিওয়ালা নই? আমার তো মনে হয়না.....আমার ছদ্মবেশে কোনো ত্রুটি ছিলো।
রবীন্দ্রনাথঃ-(হাসতে হাসতে)না না! ছদ্মবেশ তোমার সঠিকই ছিলো; কিন্তু ত্রুটি ছিলো হচ্চে গিয়ে....ভাষায়।
মুকুন্দঃ-ভাষায়?
রবীন্দ্রনাথঃ-হ্যাঁ, ভাষায়। (হেসে) তুমি ঐ যে বাক্যগুলি বলছিলে, কি যেন বাক্যগুলি? ঐ যে ʼবন্দনাʼ, ʼবিশ্ববরেণ্যʼ, ʼস্বনামধন্যʼ এইসব। এইসব বাক্য কোনো কাবুলের হিং সুরমা বিক্রেতার জানার কতা কি? না না! মুকুন্দ, না! তুমি ওই কাবুলেদের হিন্দি ভাষাটি এখনো রপ্ত করতে পারোনি।
(মুকুন্দ মুক্ত কন্ঠে হেসে ওঠেন "হাহা" করে)
রবীন্দ্রনাথঃ- তা বোসো তুমি, দাঁড়িয়ে কেন? বোসো।
(মুকুন্দ কেদারায় বসেন, রবীন্দ্রনাথও।)
মুকুন্দঃ-রবীবাবু, অনেক খবরই আপনার বিষয়ে আমার কর্ণগোচরে এসেছে। ইতিমধ্যেই আপনি ইংরাজদের কাছে ʼনাঈটহুডʼ উপাধী পেয়েচেন নাকি?
রবীন্দ্রনাথঃ-(মাথা নত করে) ওকথা বলে আমাকে লজ্জা দিওনা মুকুন্দ! ওই উপাধী গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে, না পারি গিলতে, না পারি উগরোতে। এই অসহ্য ভার বয়ে বেড়াতেও পারিনে, আবার এতো আর বস্ত্ত নয়, যে ছুঁড়ে ফেলে দেবো। এ বড় লজ্জার উপাধী মুকুন্দ, বড় লজ্জার উপাধী!
মুকুন্দঃ-না না! সেকি কতা? এতো আপনার প্রাপ্য ছিলো; আপনি যে বিশ্বকবি(বিনয়ী হেসে)।
রবীন্দ্রনাথঃ- মুকুন্দ, তুমি আমার চেয়ে অনেক মহৎ কাজ করেচো। তোমার রচিত নাটকগুলি যেখানে যেখানে অনুষ্ঠিত হয়েচে, সেই স্থানের ইংরাজ পুলিশরাই বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছে! স্বয়ং শ্রীমৎ অশ্বিনী দত্তের সান্নিধ্যধন্য তুমি, আর কি বলবো?
মুকুন্দঃ-(হাত কচলে) না না রবীবাবু; এসব নিতান্তই সামান্য ব্যাপার। আপনি মহৎ মানুষ বলেই এতটা বিনয়ী হতে পারছেন!
রবীন্দ্রনাথঃ-না মুকুন্দ; না! সামান্য নয়। আমাদের যুবশক্তিকে প্রেরণা জোগায় তোমার ওই গান; আমার তো ভয় হয়, তোমার ওই ʼমাতৃপুজাʼ নাটকখানি কোনদিন না সরকার বাজেয়াপ্ত করে।
মুকুন্দঃ-তাই যদি হয় রবীবাবু, আমি সেদিনই আরেকটি স্বদেশী নাট্য রচনা করে ব্রিটিশের সামনে মেলে ধরবো।
রবীন্দ্রনাথঃ- (মুকুন্দের পিঠে হাত রেখে)এ...এই জন্যই; এইজন্যই তোমার এই নির্ভীকতা বড় প্রিয় আমার। যাক সে কথা; বলো, তুমি বলো--হঠাৎ এভাবে আমার কাছে?
মুকুন্দঃ-একটি প্রস্তাব আছে রবীবাবু।
রবীন্দ্রনাথঃ- প্রস্তাব? কি প্রস্তাব?
মুকুন্দঃ- দেখুন--এই মুহুর্তে কলকাতা আমার পক্ষে নিরাপদ নয়। পুলিশের কড়া নিরাপত্তা কম যদি বলি, সে একমাত্র গাঁয়ে গঞ্জে! আর গ্রাম বলতেই মনে পড়লো আপনার আশ্রমের কতা, বীরভুমের কতা। কিন্তু রেলগাড়িতে যাওয়ার পথে যদি রেলপুলিশরা আমাকে চিনে ফেলে? তাই আপনি যদি দয়া করে আপনার মোটরে....!
রবীন্দ্রনাথঃ-(স্মিত হেসে) তা বেশ তো! আমিতো আগামী তিনদিন পরে এমনিতেও বসন্তোৎসবে আমাদের আশ্রমে যাচ্ছি; তুমিও চলো না হয় আমার সাথে।
মুকুন্দঃ- তা--আমি ভাবছিলাম বীরভুমে যখন যাচ্ছি, তখন একবার তারাপীঠ ভৈরব বামদেবকে দর্শন করে এলে....!
রবীন্দ্রনাথঃ- কি বললে মুকুন্দ? বামদেব? মানে...বামাক্ষ্যাপা?
মুকুন্দঃ-হ্যাঁ....আপনি চেনেন তাঁকে? জানেন তাঁর কথা?
রবীন্দ্রনাথঃ-(সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে)হ্যাঁ মুকুন্দ। আমি জানি; আমি অনেক শুনেচি তাঁর কথা!আমার পিতা....প্রথম তাঁরই নির্দেশে শান্তিনিকেতন আশ্রম গড়ে তোলেন। একথা....আমি বহুবার শুনেচি পিতার মুখে!
আর আমাদের আশ্রমের অধ্যক্ষ ভুপেনবাবু; ভুপেন্দ্রনাথ সান্যাল! তিনিও এই বামদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত। যদিও.....আমার কখনো তাঁকে স্বচক্ষে দেখা হয়ে ওঠেনি, তবু.....! আমি তোমার সহিত যাবো মুকুন্দ; আমারও বহু দিনের ইচ্ছে তাঁকে একবার দর্শন করার।
মুকুন্দঃ-(উচ্ছস্বিত স্বরে) কি..ক্কি বললেন রবীবাবু? আপনি যাবেন আমার সহিত? যাবেন?
রবীন্দ্রনাথঃ-হ্যাঁ মুকুন্দ, তুমি প্রস্তত হও।(কেদারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে) আমি কালই বীরভুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে চাই। একদিন সেখানে কাটিয়ে বোলপুরে আমাদের আশ্রমে যাওয়া যাবে!
মুকুন্দঃ-(উঠে দাঁড়িয়ে) বেশ বেশ, ত-তবে তাই হোক। (কপালে হাত ঠেকিয়ে) জয় মা তারা!!

পঞ্চম দৃশ্য
    (কুটিরের দাওয়ায় বসে গান গাইছেন বামদেব)
বামদেবঃ-(গান) আমার চেতনা চৈতন্য করে
                    দে মা চৈতন্যময়ী,
                  তোর ভাব সাগরে ভেসে আমি
                  হবো মা তোর পদাশ্রয়ী!
                 অজ্ঞান মোর সভা থেকে
                তোর ভাবে তুই নে মা ডেকে;
                জ্ঞানচক্ষু মেলে দেখি মা
                 কেমন তুই জ্ঞানদাময়ী।
                 তোর ভাবের খেলা দিয়ে,
                দে মা আমার যা কিছু সব
                অভাব মিটিয়ে!
               কূতুহল মোর এই জীবনে,
              নিয়ে নে মা তোর ও চরণে;
              মহানন্দে যাই চলে মা--
               হয়ে সর্ব ঋপু জয়ী।
      (বামদেবের অনুচর গদাইয়ের প্রবেশ)
গদাইঃ- বাবা!
বামদেবঃ- গদাই? আয় আয়; কি ব্যাপার রে? কি ব্যাপার? কলকেতা থেকে দুটি বাবু এসেচেন বুঝি? কলকেতা থেকে দুটি বাবু এসেচেন?
গদাইঃ-(সচমকে) আ..আপনি জানেন বাবা?
বামদেবঃ-(শিশুর মতো হেসে) জানি বৈকি রে ব্যাটা; জানি বৈকি! এক ব্যাটার নাম--মুকুন্দ দাশ; আরেক ব্যাটা....আরেক ব্যাটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ! আমাদের ওই....দেবেন ঠাকুরের ছেলে।
গদাইঃ-(হেসে) ঠিক ঠিক বাবা!( পেছনে চেয়ে)আসেন--আপনারা আসেন।
          (মুকুন্দ আর রবীন্দ্রের প্রবেশ)
মুকুন্দঃ-(হাত জড়ো করে)নমস্কার বামাঠাকুর!
  (রবীন্দ্রনাথ দুটি হাত বুকের কাছে জড়ো করেন)
বামদেবঃ- আ..আরে এসো এসো বাবারা...এসো! তোমাদের আগমনে আমার এই শ্মশানের আশ্রম আলোয় আলো হয়ে উঠেছে গো; আলোয় আলো হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথঃ-কিন্তু বামদেব; আপনি কি করে জানলেন আমরা আসবো আপনার নিকট?
বামদেবঃ-ওই দ্যাখো; কি করে আবার গো? কি করে আবার? আমার---আমার বড়মা আমার কর্ণকূহরে এসে বললে, "বামা, কলকেতা থেকে দুই মহা ওস্তাদ লোক আসছে রে...মহা ওস্তাদ লোক আসছে!" আমার সামনে...দেশের দুই ভবিষ্যৎ; আমি ধন্য হলাম গো বাবারা....ধন্য হলাম।
মুকুন্দঃ- (বিনয়ী স্বরে)কি-ক্কি যে বলেন বাবা! আমরা এমন কিছুই করিনি।
বামদেবঃ-(গদাইয়ের দিকে চেয়ে) তুই এখনো চুপ করে দাঁড়িয়ে কেন,হ্যাঁ? চুপ করে দাঁড়িয়ে কেন? মুখ্যু কোথাকার--যা, যা! দুটো চাটাই নিয়ে আয়....যা!
রবীন্দ্রনাথঃ-আহা, বামদেব; আপনাকে আমাদের জন্য এতো ব্যস্ত হতে হবেনা।
বামদেবঃ- (হাসতে হাসতে) ব্যস্ত হবোনা কিগো? ব্যস্ত হবোনা কি? আমার একপাশে....চারণকবি; আরেকপাশে বিশ্ববরেণ্য কবি!
         (দুজনেই সলজ্জ হাসেন)
বামদেবঃ- বুঝলে বাবা মুকুন্দ, বুঝলে? এই..তোমাতে আর আমাতে কোনো তফাৎ নাই গো; কোনো তফাৎ নাই! আমরা দুজনেই মাতৃপুজা করি, তুমি করো দেশমাতৃকার পুজা; আর আমি করি....আমার তারা মায়ের পুজা গো---তারা মায়ের পুজা।
রবীন্দ্রনাথঃ-(মৃদু হেসে)মুকুন্দের রচিত গানগুলি যে ইংরাজ সরকারকে বড়ই দুশ্চিন্তায় রেখেছে, সে সংবাদ আপনি জানেন কি?
বামদেবঃ-তাই নাকি গো? তাই নাকি? তা বেশ, তা বেশ বাবা! ওই লালমুখো আপদগুলোকে....বিনা রক্তে বিদেয় করতে পারলে;আমার চেয়ে খুশী আর কেউ হবেনা গো, কেউ হবেনা। (মুকুন্দের দিকে চেয়ে) তা বাবা মুকুন্দ; তুমি তোমার রচিত একখানি গান আমায় শোনাও না বাবা---শোনাও না!
মুকুন্দঃ-আপনি.......শুনবেন বাবা?
বামদেবঃ- হ্যাঁগো---শুনবো বৈকি...শুনবোতো! গাওনা বাবা; গাওনা।
মুকুন্দঃ-(গান)  ছেড়ে দাও রেশমি চুড়ি
                    বঙ্গনারী; কভু হাতে    
                    আর পোড়োনা!
                  জাগো গো ও জননী
                 ও ভগিনী মোহের ঘুমে
                 আর থেকোনা!
                 কাঁচের মায়াতে ভুলে
                 শঙ্খ ফেলে,
                 কলঙ্ক হাতে পোড়োনা!
                তোমরা যে গৃহ লক্ষ্মী
                ধর্ম সাক্ষ্মী জগৎ জুড়ে
                আছে জানা।
      মায়েরা,চটকদার কাঁচের বালা
               পুঁতির মালা তোমাদের
               অঙ্গে শোভেনা!
               নাইবা থাক মনের মত
               স্বর্ণভুষণ; তাতেও যে দুঃখ
               দেখিনা। সিঁথিতে সিঁদুর ধরি
               বঙ্গনারী; জগতে সতী শোভনা!
               বলিতে লজ্জা করে প্রাণ বিদরে,
               কোটি টাকার কম হবেনা।
              পুঁতি কাঁচ ধুতো মোক্তো এই
              বাংলার ন্যায় বিদেশে কেউ
              কেউ জানেনা! ওই শোনো--
              বঙ্গ মাতা শুধান কথা; জাগো
             আমার যত কন্যা---তোরা সব
             করিলে পণ মায়েরি ধন বিদেশে
              উড়ে যাবেনা! আমি যে অভাগিনী
              কাঙালিনী; দুʼবেলা অন্ন জোটেনা।
              কি ছিলেম কি হইলেম,
             কোথা এলেম; মাযে তোরা                           
            ভাবিলিনা।।
বামদেবঃ- (হেসে) বাঃ বাঃ বাঃ! বড় ভালো গান বেঁধেছো গো মুকুন্দ! বড় ভালো গান বেঁধেছো। তোমার এই গান এই দেশের মানুষদের একসূত্রে বেঁধে রাখবে গো; এক সূত্রে বেঁধে রাখবে।
মুকুন্দঃ-(মাথা নিচু করে) বাবা--আপনার শিষ্য তারাক্ষ্যাপাজি কি বিপ্লবী? আসলে....আমি শুনেচি তিনি অনেক বিপ্লবীকে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেন। তাই বলছিলাম......আরকি!
বামদেবঃ-(মুকুন্দর কাঁধে হাত রেখে) এর উত্তর তুমি যথাসময়ে পাবে বাবা; যথা সময়ে পাবে।
রবীন্দ্রনাথঃ- বামদেব---রাত প্রায় ফুরিয়ে এলো; এবার যে আমাদের ফিরতে হয়।
বামদেবঃ- না, বাবা! না! এভাবে তো আমি তোমাদের যেতে দিতে পারিনা।
মুকুন্দঃ-(অবাক হয়ে) কেন...বলুনতো?
বামদেবঃ-(মুকুন্দর পানে চেয়ে) তোমার কাছে.....ফুটুস্কল আছে।
রবীন্দ্রনাথঃ- মানে?
গদাইঃ-বাবা---বন্দুকের কথা বলচেন!
মুকুন্দঃ-(কোমরের কাছ থেকে রিভলবার বের করে) এইটির কথা বলচেন বাবা?
বামদেবঃ- হ্যাঁ বাবা; এইটি তুমি আমার আশ্রমের দক্ষিণে জীবিত কুন্ডে বিসর্জন দাও।
মুকুন্দঃ-কি-ক্কি??? এ আপনি কি বলছেন বাবা? আপনি বুঝতে পারছেননা; এ আমার কত প্রয়োজনীয় জিনিষ!
বামদেবঃ- জানি বাবা! আমি জানি! কিন্তু.....তোমার ওই কলমই তোমার অস্ত্র। এই-এই বন্দুকের.....বন্দুকের তোমার কোনো প্রয়োজন নেই।
মুকুন্দঃ-কিন্তু.....বাবা! এ আমি ত্যাগ করতে পারবোনা।
বামদেবঃ- (ক্রদ্ধ) কি? আমার আদেশ অমান্য করছিস তুই? এতো সাহস তোর? এতো সাহস?যা.... এক্ষুণি ওই ফুটুস্কল জলে ফেলে দে; যা।
মুকুন্দঃ- (অন্যদিকে চেয়ে নিজের মনে) না! কিছু একটা করতেই হবে! এই অস্ত্র আমি ত্যাগ করতে পারবোনা; আবার---ওনার আদেশ অমান্য করাও অসম্ভব।
    (বামদেব পেছন থেকে কাঁধে হাত রাখেন)
বামদেবঃ- কি?? কি ভাবছো বাবা মুকুন্দ?
মুকুন্দঃ- (সচমকে) কি-ক্কি? না-ন্না! আমি এক্ষুনি যাচ্ছি বাবা।
(মুকুন্দের দ্রুত প্রস্থানোদ্যোগ, পেছন থেকে বামা)
বামদেবঃ- দাঁড়া। (রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে)বাবা, তুমি একটু ওর সাথে যাও বাবা; তুমি একটু ওর সাথে যাও!
রবীন্দ্রনাথঃ- আচ্ছা বামদেব; আমি যাচ্ছি ওঁর সাথে।(হাসেন)
মুকুন্দঃ-(ত্রস্ত স্বরে) সেকি-ক্কি বাবা? উনি আবার কেন কষ্ট করে......!!
বামদেবঃ-(হেসে)ওরে শালা.....! আমি কি বুঝিনে? আমি কি বুঝিনে তোর মন কি বলছে? না না! রবী...তুমি একটু যাও বাবা.....যাও।
রবীন্দ্রনাথঃ-চলো মুকুন্দ,(মুকুন্দ তবু চুপ করে দাঁড়িয়ে, রবীন্দ্রনাথ হেসে কাঁধে হাত রেখে) কি ভাবছো? চলো!
           (মুকুন্দ ও রবীন্দ্রের প্রস্থান)
গদাইঃ- এ আপনি কি করলেন বাবা? একজন বিপ্লবীকে তার বন্দুক ফেলে দিতে বললেন? দেশ থেকে ইংরেজ কি তবে ফুলের মালা দিয়ে তাড়ানো হবে?
বামদেবঃ- গদাই---কখনো কখনো ফুলের মালা যা পারে; একটা বন্দুক তা করতে পারেনা রে...পারেনা।
               (প্রস্থান)

ষষ্ঠ দৃশ্য
    (রবীন্দ্র ও মুকুন্দ জলাশয়ের কাছে এসেছেন)
রবীন্দ্রনাথঃ- বুঝলে মুকুন্দ? মনে হচ্ছে এই জলাশয়টির কথাই বামদেব বলেছেন।
মুকুন্দঃ- আপনি কত সহজে বলে দিলেন, না? আ...আচ্ছা, আপনার মনে হয়না? একজন বিপ্লবীর কাছ থেকে তার অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার অর্থ অন্যায়!!
রবীন্দ্রনাথঃ- (বিরক্ত) ও! তারমানে বামদেব তোমাকে ওটি জলে নিক্ষেপ করতে বলে অন্যায় করেচেন---এটা বলতে চাইছো?
মুকুন্দঃ- (সজোরে মাথা নেড়ে) না না! আমি এটা কখনোই বলিনি রবীবাবু। আসলে--উনি তো সাধক মানুষ; উনি আর কিকরে বুঝবেন এর গুরুত্ব?
রবীন্দ্রনাথঃ- কি আশ্চর্য! তা তুমি ওনাকে বুঝিয়ে বললেনা কেন যে এর গুরুত্ব কি?
মুকুন্দঃ- আমি তো বললাম, উনি তো শুনতেই চাইলেন না!
রবীন্দ্রনাথঃ- মুকুন্দ.....উনি সত্যই একজন মহান মানুষ। ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস নেই; তাই উনি সত্যিই মহাসাধক বলতে পারিনে! তবে....এটাও ঠিক, আমার জিবনে আমি অমন মহান, সরল, সত্যবাদী মানুষ কখনো দেখিনি। অলৌকিক ক্ষমতা কি জিনিষ আমি জানিনা---কিন্তু আমরা ওঁর সম্মুখে আগমনের সাথে সাথেই উনি আমাদের নাম নির্ভূল বলে গেলেন। আর.....কি অদ্ভুত বিশ্বাসে বললেন ওঁর আরাধ্যা তারা দেবীর কথা! এমন মানুষ কোনো অবিচক্ষণতার কাজ করতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস হয়না।
মুকুন্দঃ- আমি জানি। আমি জানি ওঁর আদেশ অমান্য করতে আমি অপারগ! আবার এটিকে হাতছাড়া করতেও পারবোনা। শুনুননা.....রবীবাবু! আপনি যদি আ-আমায় একটু সাহায্য করেন; তাহলে...!
রবীন্দ্রনাথঃ- কি বলতে চাইচো বলোতো?
মুকুন্দঃ- আ-আমরা যদি এটিকে এখানে কোথাও গোপন স্থানে রেখে যাই...ফেরার সময় আবার এখান থেকে....!
রবীন্দ্রনাথঃ- (চশমা ঠিক করতে করতে) মুকুন্দ! আমার মনে হয়;  বামদেব এরকম কিছু সন্দেহ করেই আমাকে তোমার সাথে পাঠিয়েছেন। এখন.....আমি ফিরে গিয়ে ওনাকে এমন অসত্য বাক্য বলতে পারবোনা!
মুকুন্দঃ-কিন্তু....!
রবীন্দ্রনাথঃ-কোনো কিন্তু নয়। (নরম স্বরে) তুমি কেন বুঝচোনা মুকুন্দ? এই একটি জিনিষের জন্য তুমি অমন মহান মানুষের বিশ্বাস ঘাতক হবে?
মুকুন্দঃ- আ-আমি জানি! কিন্তু আপনি জানেন? এই একটি অস্ত্র জোগাতে আমাকে কত কষ্ট করতে হয়েচে!
রবীন্দ্রনাথঃ- জানি! এটি ত্যাগ করতে তোমার আরো কষ্ট হবে। (কাঁধে হাত রেখে) কিন্তু বামদেব যখন বলেছেন; নিশ্চয়ই নিছক শুধু শুধু নয়! মুকুন্দ--তুমি জানো? আমার পিতা শুধুমাত্র ওঁর কথায় আমাদের অতবড় আশ্রম, বিশ্বভারতী গড়ে তুলেছিলেন। এ থেকেও কি তুমি বুঝতে পারচোনা ওঁর আদেশের মুল্য? তাছাড়া, উনি তোমায় কি বললেন শুনলেনা? কলমই তোমার বড় অস্ত্র!
মুকুন্দঃ- (চোখ জ্বলজ্বলে) ঠিক! ঠিক বলেছেন রবীবাবু; এসবতো আমি ভেবে দেখিনি।
রবীন্দ্রনাথঃ- তবে? তুমি ঐ বস্ত্তটি এবার বিদেয় করো।
মুকুন্দঃ- (রিভলবার কপালে ঠেকিয়ে) বন্দে----মাতরম্!
(জলে নিক্ষেপ করার "ঝপাৎ" শব্দ আবহে, মুকুন্দের মাথা নিচু, রবীন্দ্রনাথ কাঁধে হাত রাখেন। প্রস্থান।)

সপ্তম দৃশ্য
(রোদের আলো, দাওয়ায় বামদেব বসে আছেন। গদাইয়ের প্রবেশ।)
গদাইঃ- বাবা- ভোর যে হলো! এখনো যে তেনাদের দেখা নেই।
বামদেবঃ- (হেসে) দাঁড়া দাঁড়া.....! ব্যাটার অত সাধের ফুটুস্কল; ওকি অত সহজে মায়া যায় রে? মায়া যায়? তবে সঙ্গে ঐ রবীন্দ্রনাথ গেচে....এই রক্ষে! নইলে ও ব্যাটা হয়তো...।
        (মুকুন্দ ও রবীন্দ্রের প্রবেশ)
বামদেবঃ- তোমরা এসে গেচো বাবারা? এসে গেচো? (মুকুন্দের দিকে চেয়ে) কি রে ব্যাটা? কিরে? ওই-ওই ফুটুস্কল খানা জীবিতকুন্ডে বিসর্জন করিচিস তো, হ্যাঁ? করিচিস তো?
মুকুন্দঃ- (হেসে)হ্যাঁ বাবা...আপনার কথা মতো আমি ওটি ঘাটের জলে নিক্ষেপ করেছি।
রবীন্দ্রনাথঃ- আর...এ কথা যে সত্য; তার প্রমাণ আমি।
বামদেবঃ- বেশ বেশ বাবা.....বেশ করেচো। তা বাবা! তুমি যে বিশ্ববরেণ্য কবি গো....বিশ্ব বরেণ্য কবি। তোমার রচিত একখানা গান আমাকে শোনাবেনা বাবা? শোনাবেনা?
রবীন্দ্রনাথঃ- (স্মিত হেসে) বামদেব...আপনার মতো মাতৃসাধক; এমন সরল, নিষ্পাপ সত্যবাদী মানুষ---আমি কখনো দেখিনি। (একটুক্ষণ চেয়ে থেকে গান)
       আমার মাথা নত করে দাওহে তোমার
        চরণ ধুলার তলে; সকল অহংকার হে
        আমার ডুবাও চোখের জলে!
        নিজেরে করিতে গৌরবদান;
        নিজেরে কেবলি করি অপমান,
        আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া;
        ঘুরে মরি পলে পলে।
        আমারে না যেন করি প্রচার,
        আমারো আপন কাজে;
        তোমারি ইচ্ছা করো হে পূরণ
         আমারো জীবনমাঝে!
         যাচি হে তোমার চরম শান্তি
         পরাণে তোমার পরম কান্তি;
         আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও
         হৃদয় পদ্মদলে॥
বামদেবঃ-(রবীন্দ্রনাথের কাঁধে হাত রেখে) আহা! আহা! বড় ভালো গান বাবা; বড় ভালো গান। এই গান, এই কবিতা...তোমাকে শত শত বছর বাঁচিয়ে রাখবে। কবিগুরু হবে গো তুমি; কবিগুরু হবে।
রবীন্দ্রনাথঃ-(অবনত মস্তকে) বামদেব; এবার আমরা রওনা দিই? ভোর হয়ে এসেছে। বেশি বিলম্ব হলে বোলপুরে পৌঁছতে বিলম্ব হবে।
বামদেবঃ- হ্যাঁ বাবা; যাও....যাও বাবা। আমার বড়মা তোমাদের মঙ্গল করুন গো...মঙ্গল করুন।
     (মুকুন্দ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে)
বামদেবঃ-থাক বাবা, থাক। (বুকে হাত রেখে)জয় তারা! জয় জয় তারা!
                 (প্রস্থান)

অষ্টম দৃশ্য
   (সূর্য ডোবার আবহ, আবহ সংগীতে বাঁশির সুর, হেঁটে ফিরছেন রবীন্দ্র ও মুকুন্দ।)
মুকুন্দঃ- রবীবাবু, দেখুন দ্বারকা নদীর ওপারে সমস্ত চরাচর রাঙিয়ে সুর্যদেব উদিত হচ্চেন। (পাখির ডাকের আবহ) শুনুন, একটি দুটি পাখির দিনের প্রথম কলকাকলিতে এই প্রভাত মুগ্ধ হয়ে উঠচে। কিন্তু রবীবাবু....আপনাকে এমন বিষণ্ণ লাগছে কেন?
রবীন্দ্রনাথঃ- না না, কিছুনা মুকুন্দ! (ম্লান কন্ঠে)
মুকুন্দঃ- কেন গোপন করছেন রবীবাবু? বলুননা....কেন এমন বিষণ্ণ আপনি?
রবীন্দ্রনাথঃ- মুকুন্দ; তুমি শুনলে? বামদেব তোমাকে কি বললেন? তোমার গান এই দেশের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখবে। কিন্তু মুকুন্দ! তুমি যে এই দেশের জন্য এতো ভাবো, নিজের জিবন পণ করে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ো; আমি তো তার একবিন্দুও কিছু করতে পারলুমনা মুকুন্দ। তোমাদের নখের যোগ্যতাও আমি অর্জন করিনি!
মুকুন্দঃ- এ-এ আপনি কি বলছেন রবীবাবু? আমাকে কজন চেনেন? আপনাকে যেখানে সারা পৃথিবী বরণ করে নিয়েছে----সেখানে আমি এক সামান্য চারণকবি মাত্র! আমার জীবন দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত! আমি তো আজ আছি....কাল নেই। আমার মৃত্যুতে দুʼচারজন নিকট মানুষ ছাড়া কেউ আমাকে মনে রাখবেনা; কিন্তু আপনাকে রাখবে!
রবীন্দ্রনাথঃ- (মাথা নেড়ে) না মুকুন্দ; না! তুমি ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থান না পেলেও মানব হৃদয়ে তুমি আরো কয়েক শতাব্দী বেঁচে থাকবে। কিন্তু আমি? আমিতো কিছুই করতে পারিনি এই দেশের জন্য! আমার কলম আমার অস্ত্র নয়; বিলাস আর অর্থের এক লালিত অংশ মাত্র। তোমরা যা করচো---দেশের জন্য তার সিকিভাগও করতে পারিনা আমি! আমার জিবনটা কেটে গেলো কবির বিলাস, ব্যসনে; আভিজাত্যের নীল রক্ত নিয়ে। আমি পারলুমনা মুকুন্দ......কিছুই করতে পারলুমনা এই দেশটার জন্য!
(মুকুন্দ কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে প্রস্থান করবেন; রবীন্দ্রনাথ চোখ থেকে চশমা খুলে আকাশের দিকে তাকাবেন হতাশ ভাবে)
আবহ সঙ্গীতঃ- অনেক তোমার খেয়েছি গো
                    অনেক নিয়েছি মা; তবু
                    জানিনে যে কিʼবা তোমায়
                    দিয়েছি মা।
                   আমার জনম গেলো বৃথা
                   কাজে ; আমি কাটানু দিন
                   ঘরের মাঝে ; তুমি বৃথাই
                   আমায় শক্তি দিলে
                  শক্তিদাতা! ও আমার দেশের
                 মাটি তোমার পরে ঠেকাই
                 মাথা।।

                                   
                                         অলংকরণ-সুমিত রায়

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...