Saturday, 18 November 2017

বিষণ্ণতার গল্প বলে

হিমের পরশ মফস্বলের রাস্তাঘাটে,
কুয়াশাতে ডুব দিলো ঠিক ক্লান্ত মাঠে
আকাশ প্রদীপ পথ খোঁজে রোজ সন্ধ্যা হলে;
শোনো হেমন্তকাল বিষণ্ণতার গল্প বলে।
ভাঙা ইঁটের পাঁজর শোনায় রূপকথারা,
মহাকালের গল্প জাগে তন্দ্রাহারা
ধূলোয় জাগে কতো রক্ত অশ্রু ও ঘাম
শতাব্দীকালের প্রিয়ার সেই ডাকনাম।
স্ট্রিটলাইটের নীচে ধোঁয়া ঘনিয়ে এলে;
শোনো হেমন্তকাল বিষণ্ণতার গল্প বলে।।
                                          

Saturday, 11 November 2017

শিবঠাকুরের গান

চরক অথবা রাসপূর্ণিমা
শিবরাত্তির নিয়ে,
চলমান শিব একলা আসেন
গাজনের গান গেয়ে।
শহরতলি বা মফস্বলে,
দোকান বাজার হাই ইস্কুলে,
একলা ঘুঙুর পায়ে নেচে যায়
গাজনের গান গাহি,
মুসলমানের দোরে ভোলানাথ
বলে ভিক্ষাং দেহি।
জল না পানি কোনটা বড়
লড়ে শহরের মানুষ,
পেটের জ্বালায় ভোলে ভোলানাথ
এসবের নেই হুঁশ।
কে বা অচ্ছুৎ কে পুণ্যবান
মাথা ঘামাচ্ছে এরা,
চলমান শিব হেসে বলে ওঠে
"আহা! বেচারীরা।''
পিচ গলে ঠিক শহরের বুকে
ব্যস্ত মধ্যদুপুর,
ট্র‍্যাফিকের হর্ণ ছাপিয়ে বাজছে
মহেশ্বরের ঘুঙুর!
এসি গাড়ি কাচ তোলা জানলায়
কেউ শুনছেনা তাকে,
একা নেচে নেচে গেয়ে যায় ভোলা
কে কার খবর রাখে?
দেশটা পুড়ছে গরু আর রামে
তার কীইবা যায় আসে?
নিজে বাঁধে গান নিজেকে শোনায়
আপনমনেই হাসে!
ফুটপাতে যারা পায়না খেতেও
নেই ঘর মাথা গোঁজার;
সেইসব ছোট ছেলেমেয়েরাই
তাকে ঘিরে একাকার!
দুপুর রোদে ডমরু বাজিয়ে
রাসের গান গাহি,
সংখ্যালঘুকে আজ ভোলানাথ
বলে ভিক্ষাং দেহি।।
                

বিরাট কোহলির গান

আকাশটাকে ছোঁয়ার মতো
শূণ্যেতে দু'হাত তুলি,
আশীর্বাদ কুড়িয়ে নিলেন
অজেয় বিরাট কোহলি।
####
ঢল নেমেছে স্টেডিয়ামে
মানুষের মুখ অজস্র
তাঁর জেতাটাই সবার জেতা
উঠছে জিগির সহস্র!
ক্রিকেট বল ছুঁলো আকাশ
যেন বন্দুকের গুলি;
মানুষ নাকি ঈশ্বরই আজ
অজেয় বিরাট কোহলি!
####
রানের পরে রান ছুটে যায়
সেঞ্চুরিরা তাঁর গোলাম,
ব্যাটে ঘর্ষণ জ্বলুক আগুন
বিজয়তিলক ফোঁটায় ঘাম।
ক্লান্ত নায়ক মুখের কোলাজ
আঁকছে যেন রঙতুলি,
আকাশটাকে ছুঁয়েই ফেলুন
অজেয় বিরাট কোহলি।।
                        

২১শে জুলাই

ওরা ব্রিগেড মিছিলে নাচলো গাইলো ফুর্তি করলো সবাই,
দল বেঁধে কারা গিয়েছিলো পেতে উন্নয়নের ছোঁয়াই,
কন্যাশ্রী পেয়েছে মেয়েরা এ কথা সবারই শোনা
ভোরবেলা তুই মরেছিস আজই সেটা মনে রাখবোনা!
ক' লক্ষ লোক মিছিলে হাঁটলো সেই নিয়ে কানাকানি,
ভুলে গেলো সব ছুঁচের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত যোনি!
শুধু দলাদলি কুৎসা কীর্তি, তোকে ভাববেনা কেউ
ক্ষমা কর তুই, আমি কুন্ঠিত দেখে মিছিলের ঢেউ।।
                                                       

খুব একটা নয় সোজা

বৃষ্টি ঝরে সারাটা দিন ধরে,
একলা দুপুর মেঘের ছোঁয়ায় ভেজা
জানলার ফ্রেম ধূসর স্মৃতির ভারে;
তোমায় ভোলা খুব একটা নয় সোজা।
গাছের পাতায় জলের ফোঁটা ভারি,
এমনদিনেই আসার কথা ছিলো
বিকেল তিনটে জানায় দেওয়াল ঘড়ি;
এমন সময় তোমায় মনে এলো।
মেঘ'রা ছায়া ফেলছে আয়নাজুড়ে,
খুব অসহায় নিজের প্রতিচ্ছবি
বর্ষা দিনে ডাকতে যেমন করে;
ফুরিয়েছে সব দেখা করার দাবী।
হয়তো দেখা হতো পার্কে ভিজে,
ছাতার নীচে দুজন অগোছালো
বুঝতোনা কেউ বর্ষা বিকেল মাঝে;
একটু কেন সোনা রোদের আলো।
তোমার সঙ্গে অন্য কারোর দেখা
চারটে বছর চার শতাব্দী আজ,
ঠোঁটের আগল খুলেছো দুজনেই;
আজ পরেছো যুদ্ধজয়ের সাজ।
বৃষ্টি ঝরে সারাটা দিন ধরে,
সন্ধ্যা নামে মেঘের ছায়ায় ভেজা
তোমরা দুজন একই ছাতায় হাঁটো,
আমার জন্য খুব একটা নয় সোজা।।
                                     

Friday, 27 October 2017

হিংসে হয় এখনো

অফক্লাসে যেটা বলার ছিলো তোকে,
কোনোদিনও আর বলা হয়নি যেন
বাচ্চা গুলোকে ইস্কুলে যেতে দেখে
জানিনা কেন হিংসে হয় এখনো।
স্কুলললাইফটা চলে গেছে ফাঁকি দিয়ে,
টিফিনের পিরিয়ড, কোচিং ক্লাস আর
তোকে সঙ্গে নিয়ে;
স্কুলড্রেসে তোকে দেখবোনা আর কখনও
বাচ্চাগুলোকে ভাগাভাগি করে টিফিন খেতে দেখে
জানিস! আমার হিংসে হয় এখনো!
ক্লাস পালানো, হেডস্যারের রাগ;
ব্ল্যাকবোর্ডেতে পুরনো চকের দাগ
ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেলো যে কবে
আহা! বারোটা বছর ইস্কুলে তান্ডবে।
আর কোনোদিনও দেখতে হবেনা
স্যারের চোখরাঙানো;
বিশ্বাস কর! বাচ্চাগুলোকে বকুনি খেতে দেখে
ভীষণ হিংসে হয় আমার এখনো।।
                            

Thursday, 19 October 2017

Soft poem

জানলায় তার রোদ এসে দিলো উঁকি,
মেঘের আঁচলে সূয্যিমামার টুকি
স্বপ্ন হারিয়ে বেঁচে থাকা শুধু বাকি;
শৈশব কবে চলে গেছে দিয়ে ফাঁকি।
আশ্বিন মাস, পুজোর ছুটির হাওয়া
রেলগাড়ি চেপে দার্জিলিংয়েতে যাওয়া---
কালবোশেখির আম কুড়োনোর ধুম,
গরমের ছুটি, ফেলুদার বই--দুপুরটা নিঃঝুম।
আজ জারুলগাছেতে নেই ল্যাজঝোলা পাখি;
শৈশব ছেড়ে চলে গেছে আজ আমাকে দিয়ে ফাঁকি।।

মৌয়ের জন্য....খানিক পাগলামি

আজকে হঠাৎ দেখছি তোকে দূর থেকে,
স্কুলড্রেসটায় আগের মতোই লাগছে তোকে
না তাকিয়ে পালিয়ে গেলি কোন বাড়ি?
আগের মতোই একটু আজো অহংকারী।
বুকের ভেতর জমছে আবার পুরনো ঘা;
চোখের পাতায় মেঘ জমেছে অবজ্ঞার!
চুলগুলো তোর এলোমেলো আগের মতোই
রুক্ষ গালে শেষ সূর্যের একটু আলোয়,
সারাটা দিন স্মৃতির ভারে মেঘজমা মন;
আজকে শুধুই সঙ্গী হবেন কবীর সুমন।।
                                         

চিৎপুরের গান

এখানে রঙ মাখা মুখের আড়ালে
আছে আরেক জীবন।
পাথরচাপা বুকে কোনটা
আসল হাসি, কোনটা কান্না অকারণ।
এখানে মঞ্চ আছে, জীবনের খুব কাছে,
নিজেকে লুকিয়ে রাখে অনেক আবরণ।
গলির অন্ধকারে, সন্ধ্যার আল ধরে,
স্ট্রিট লাইটের নিচে কাঁদে চিৎপুর;
মাকড়সা জাল বোনে দেওয়ালের এককোণে,
কোনো ঘরে শোনা যায় কবেকার সুর।
রঙচটা হোর্ডিং এ দেওয়ালের চুনকামে
বন্ধ অপেরাগুলো ভাবে আনমন;
এখানে রঙমাখা মুখের আড়ালে
আছে আরেক জীবন।
এখানে সন্ধ্যাগুলো, আবছায়া মনে হলো,
মঞ্চের মহারাজ ভেতরে ফকির;
কত ছলনার কথা বলতে গিয়েও ব্যথা
হৃদয়ের কথাগুলো আসলে বধির,
গিরিশ ঘোষের সাথে
কেউ হাঁটে প্রতিরাতে,
একদিন মুছে যাবে সকল ভাঙন।
এখানে রঙমাখা মুখের আড়ালে
আছে আরেক জীবন।।
                   

শ্রেয়শ্রীর জন্য....দু'চার লাইন

তোমার কন্ঠ হারিয়ে দেবে আমায়
মেনেই নিলাম এ শুধুই খেলা খেলা,
তোমার কাছে আমার পরাজয়
তোমার ঠোঁটের কাব্যি রাতের বেলা!
সুনীল শক্তি বাদ দাও, মুলতুবি আজ
আজকে না হয় আমারই কবিতা বলো
তোমার গলায় যুদ্ধজয়ের সাজ,
ভুলেই যাচ্ছি রাত্তির কত হলো।।
                          

বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষাটা আমার রন্ধ্রে জাগে
সুখ অসুখ আর অভিমানে অনুরাগে,
দুই অলিন্দে নিলয়ের কোণে ঘোরে
পান্নালালের বাঁশির সন্ধ্যারাগে।
হৃদপিন্ডের প্রকোষ্ঠে বেজে ওঠে
রামপ্রসাদের শ্যামার গানের কথা;
শরীর জুড়ে বাংলার মাঠে ঘাটে
বল্লাল সেন-মদন মল্ল কবেকার রূপকথা!
এনরিকিউয়ে প্রয়োজন নেই আমার
মনের আকাশ জুড়ে আছেন লালন;
বিলিতি প্রেমের গানগুলো থাক তোমার
আমার জন্য আছেন কবীর সুমন।
আমিও বাংলাতেই স্বপ্ন দেখি,
আমার শহর নাচবে ঘুঙুর পায়ে
হাতে'তে থাকবে বোলপুরের একতারা
নির্মলেন্দু গাইবে শিরায় শিরায়।
তুমি তো এখনো উপনিবেশেই মত্ত,
চাঁদ বা চামেলি কবি কেটসের নয়
ওসব তোমার জন্যই তোলা থাক
আমি শুনবো হিমাংশু দত্ত!
জীবনানন্দ দাশের নাম জানো?
সেই কবি আজো বাংলায় কেঁদে ফেরে
এই পথে আজো হাঁটেন বিভূতিভূষণ
চাঁদ সদাগর ডিঙা ভাসান আজো গাঙুরে।
আমি তো এখনো বেঁচে আছি এইনিয়েই
হাড়ে মজ্জায় দুইজন নচিকেতা,
কলের গানে বাজেন আখতারি বাই
আহা! কী দারুণ পুলকবাবুর কথা।
তুমি বেঁচে থাকো পার্টি-র‍্যাপ সং নিয়ে
রবীন্দ্রনাথে তোমাদের নেই অধিকার
রজনীকান্ত আমার নিঃশ্বাসে
প্রশ্বাসে ঘিরে ধানসিঁড়ি বাংলার।
খোয়াই কিংবা গাঙুর যাকেই ডাকো
সব নদী মেশে একই মোহনাতেই
সার্থক হবে তোমারও জন্ম জেনো
দুই চোখে যদি বাংলার ছবি আঁকো।।
                               

শ্রমিক

(বের্টোল্ট ব্রেখট সুজনেষু)

ওহে শ্রমিক, ওহে শ্রমিক
শ্রমিক এটাই তোমার পরিচয়;
তোমার ঘামের বদলে ওদের
যা কিছু সঞ্চয়।
সাতদরজাওয়ালা থিবস
গড়ে তুলেছিলো কারা?
ইতিহাস মনে রেখেছে তাদের
সরকারে ছিলো যারা,
এর বেশি কিছু পাবেনা তুমি
শ্রমের বিনিময়ে;
তোমার ঘামের বদলে ওদের
যা কিছু সঞ্চয়।
ধনীর দেশের কথা বলে লোকে
বাইজেনটিয়াম,
সেখানে সবাই থাকতো প্রাসাদে
ঝরেনি রক্ত ঘাম
সে প্রাসাদ কারা গড়ে তুলেছিলো
জানতে দেবেনা তোমায়;
তবু তোমার ঘামের বদলে ওদের
যা কিছু সঞ্চয়।
আর্মাডা ডুবে যাওয়ার সময়
ফিলিপ কেঁদেছে একা,
গোটা স্পেন দেশ কাঁদেনি তখন
ইতিহাসে এটা লেখা;
অশোক একাই কেঁদেছিলো নাকি
করে কলিঙ্গ জয়,
তোমার ঘামের বদলে ওদের
যা কিছু সঞ্চয়।
শাহজাহান শুধু একা গড়েছিলো
ময়ূর সিংহাসন,
তোমার মতো কারোর ঘাম
ঝরেনি তখন;
এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলোনা
এসব তোমার নয়,
শুধু তোমার ঘামের বদলে ওদের
যা কিছু সঞ্চয়।
সিজার একাই গড়ে তুলেছিলো
মিশরের প্রতিরোধ,
অন্তত কী ছিলোনা সঙ্গে
একজনও পাচক?
(বিশ্বাস করা শেখো)
আলেকজান্ডার একা করেছিলো
বিশাল ভারতজয়,
শুধু মজুরি পেয়েই খুশি থাকো
প্রশ্ন তোমার জন্য নয়।।

Sunday, 24 September 2017

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

আলোয় আলো হয়ে আসে পূব আকাশ,
পাহাড়চূড়োয় সোনা রোদের আদর,
ডাললেকেতে নৌকো ভাসছে একা
বরফ গলছে রোদ্দুরে আপামর।
সবুজ পাতায় সোনা ঝরে পড়ে রোজ
আজকে যেন ভোরের বাতাস ভারী,
পহেলগাঁওয়ে ঘাসে চড়ে ফেরে ঘোড়া
কোন মা করছে কোন ছেলেকে খোঁজ!
চেয়ে দ্যাখো তুমি, বরফেতে ভিজে মাটি,
রোদ্দুরে ধুয়ে ঝাউগাছের আড়ালে
ছেলেটা ঘুমোয় ঝাউয়ের ফাঁকে একা,
ঠোঁটের কোণায় যুদ্ধজয়ের হাসি।
মায়ের হাতের মতো বরফের গুঁড়ো,
আদর করছে ছেলেটার গায়ে মাথায়
রোদের আদর খোকার শরীর জুড়ে
রোদ্দুর, তুমি শরীর গরম কোরো।
বোজা চোখ দুটো খুলতে এতো দেরী?
মা যে ডাকেনি, "খোকা ওঠ ভোর হলো''
সুখস্বপ্ন দেখছে ঘুমের ঘোরে
সেই বাংলা, মা, বোন, ভিটেবাড়ি।
খোকার মাথায় বালিশ পাতার স্তুপ,
ঝোপঝাড় গুলো পা দুটো রেখেছে ঢেকে,
বরফে খোকার ঠান্ডা লাগছে বুঝি,
খোকা ঘুমোচ্ছে;  রোদ্দুর গায়ে মেখে।
স্বপ্নে দেখছে, হারানো সে ছেলেবেলা
মা কেটে দিতো কপালে কাজল টিপ;
বলতো, "আমার খোকা কবে হয়ে বড়
বন্দুক হাতে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা?''
চেয়ে দেখো তুমি ভালো করে হে পাঠক,
খোকার বুকেতে লাল ও কীসের দাগ?
দুষ্টু লোকেরা মেরেছে বুঝি ওকে?
মায়ের আদর খোকাকে ছুঁয়ে থাক।।

Thursday, 3 August 2017

জাদুটোনা

"বাপি, ম্যাজিক শো দেখতে নিয়ে চলো না প্লিজ!'' অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে সবে টিভিতে নিউজ চ্যানেল দেখছিলাম, এইসময় রিম্পা ছুটে ছুটে ঘরে এসে বললো। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ওটা শেষ করে অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতে দিতে বললাম, "ম্যাজিক? কোথায় ম্যাজিক?'' রিম্পা ঘাড় দুলিয়ে বললো, "মহাজাতি সদনে শো হচ্ছে; পি.সি. সরকার। চলোনা বাপি, আমাদের স্কুলের ত্বিষা, অর্ক, পূজা সবাই গল্প করছিলো আজ; দারুণ এনজয় হবে। তাছাড়া অনেকদিন তো আমরা তিনজনে উইকএন্ডে কোথাও ঘুরতে যাইনি।'' এইসময় মেয়ের পেছন পেছন ঘরে ঢুকলো দেবলীনা, ওরও মুখে একই কথা, "হ্যাঁ গো, চলোনা। মেয়েটা স্কুল থেকে এসে অবধি নাচছে ম্যাজিক দেখতে যাবে বলে; তাছাড়া এইবছর উইন্টারে এখনো তো আমরা কোথাও বেড়োইনি।'' আমি মা মেয়ে দুজনের মুখের দিকে একবার তাকালাম; দুজনেই ওয়েট করছে আমার দিকে চেয়ে এক্সাম রেজাল্টের মতো। আমি একটু মজা করে হেসে বললাম, "যথা আজ্ঞা। চলো, নেক্সট সানডে ইভনিং; ডিনার বাইরে।'' হাততালি দিয়ে আনন্দে নেচে উঠলো রিম্পা, "ইয়াওওও হুররেএএ! লাভ ইউ মামমাম, লাভ ইউউউ!'' দেবলীনাকে জাপটে ধরে গালে ঠোঁট দুটো টোকা দিলো রিম্পা; আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, "বাঃরে! মামমাম? বাপি কি বানের জলে ভেসে এসেছে?'' দেবলীনা ঠোঁট উলটে আমার দিকে চোরা চোখে চেয়ে বললো, "হুঁহ! আর আমি যে বাপি কে রাজি করালাম?'' আমি মজা করে বললাম, "আর বাপি যে ম্যাজিক শো'য় নিয়ে যাবে বললো?'' রিম্পা ছুট্টে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে একটা 'হামি' দিয়ে বললো, "লাভ ইউ বাপি....লাভ ইউ! তোমরা আমার খুব খুউব স্যুইট বাপি আর মামমাম।'' আমি এলোমেলো চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বললাম, "লাভ ইউ টু রিম সোনা! মাই প্রিন্সেস।'' দেবলীনা রিম্পাকে চোখ গোলগোল করে বললো, "নাও, চলো এবার; বাপিকে রাজি করানো হয়েছে। এবার ডিনার করতে হবে!'' রিম্পা ছুট্টে চলে গেলো পাশের ঘরে, দেবলীনা আমার দিকে মজার শাসনের ভঙ্গিতে চেয়ে বললো, "কিগো? চলো; খাবে তো! নাকি এখানে এনে খাইয়ে দেবো?'' আমি ঠোঁটের কোণায় মুচকি হেসে বললাম, "দাও না খাইয়ে, অনেকদিন দাওনি তো!'' দেবলীনা লজ্জা মেশানো হাসি হেসে ''ধ্যাৎ" বলে চলে গেলো ডাইনিং হলে। সবই ঠিকঠাক, সুন্দর ছিমছাম মোটামুটি স্বচ্ছল সুখী সংসার আমার; আটবছরের মেয়ে রিম্পা আর বউ দেবলীনাকে নিয়ে। উইকএন্ডে প্রায়ই ভিক্টোরিয়া বা ইকোপার্ক, সায়েন্স সিটি কিংবা কিছু না হোক সাউথ কলকাতার কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ বা ডিনারে যাই আমরা তিনজন। সারা হপ্তার শেষে মুডটাও রিল্যাক্স হয়, ওরাও এনজয় করে ব্যপক। কিন্তু আজ.....ম্যাজিকের নামটা শুনেই হঠাৎ মাথার ভেতরে একটা ভোঁতা হয়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর স্মৃতি ঝলসে উঠলো আমার। ওই ঘটনাটার পর থেকেই আমি 'ম্যাজিক' জিনিষটা নিয়ে আর কালচার করিনা, বলা যায় এড়িয়ে চলি। কোনো মেলায় গিয়ে রিম্পা বিশেষ 'থ্রিডি শো' বা 'হন্টেড হাউস' এ ঢোকার বায়না করলেই স্মৃতিটা মাথার মধ্যে দপ করে ওঠে! যেমন আজ...। প্রায় কুড়ি বছর বাদে আবার ম্যাজিক শো'য় যাওয়ার কথা উঠলো। বিপ্লব! এখনো চোখ বুজলে বিপ্লবের সেইবয়সের চেহারাটা দেখতে পাই স্পষ্ট; রোগা, কালো, লম্বা, চুল ছোটো ছোটো করে ছাঁটার কারণে কানদুটো অতিরিক্ত লম্বা লাগতো, আর হাসলে ডানগালে টোল পড়তো ওর। বিপ্লব আজ কোথায়......আমি জানিনা! আদৌ আছে কী? পূর্ণিমার ফুলমুন নাইট হলেই আমি ছাদে উঠে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজি। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের সেই দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যাটা.....।

খেলার মাঠ থেকে বেড়োতে বেড়োতে বিপ্লব বললো, "দোলের মেলায় যাবি?'' আমি বললাম, "সেতো অনেকদূর; সেই বোষ্টমপাড়া, কাঁঠালচাঁপার মাঠ পেড়িয়ে...কোনোদিন তো যাইনি!'' বিপ্লব আমার পিঠে একটা চাপড় মেরে বললো, "ধুর! এখন তো আমরা বড় হয়ে গেছি; এমন কী দূর? এই তো ভুঁড়িপুকুরের পাশ দিয়ে মিশ্রপাড়া, তারপর বৈষ্ণবটোল, তারপরেই বোষ্টম পাড়া। চ' তো।'' আমি চারপাশটা দেখলাম, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে এসেছে; শিরশিরে একটা দক্ষিণে হাওয়া দিচ্ছে গাছের পাতায় পাতায়। সকালেই বাঁদুরে রঙ মেখে ভূত হয়ে গিয়েছি সব্বাই; পুকুরে গিয়ে কষে কষে চান করেও রঙ ওঠেনি মুখ থেকে, তাই আমার একটু লজ্জা লজ্জা করছিলো সত্যিই। আমি মিনমিন করে বললাম, "কিন্তু বিপ্লব.....সূর্য ডুবে যাবে এক্ষুণি; ফিরতে দেরী হলে মা'ও বকবে কিন্তু।'' বিপ্লব হেসে বললো, "আরে কিচ্ছু হবেনা রে হাঁদারাম! সন্ধের মধ্যেই ফিরে আসবো; শুনলাম বহড়ু থেকে গোষ্ঠ ঘোষ এসেছে, অ্যাত্তো বড় বড় মোয়া বিক্কিরি হচ্ছে। চ' চ', দেরী করিসনা। কুলতলার ভেতর দিয়ে আমি শর্টকাট রাস্তা জানি একটা, তাড়াতাড়ি হবে।'' বিপ্লবের সাইকেলের পেছনে উঠে বসলাম; বিপ্লব প্যাডেলে পা দিয়েই ঝড়ের বেগে সাইকেলটা চালাতে শুরু করলো কুলতলার ভেতর দিয়ে। বেশ ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে, আকাশে হালকা গোলাপি আলো, সবেই সুর্য ডুব দিয়েছে পশ্চিমে; এখনো পশ্চিম আকাশটা লাল হয়ে আছে। এখনো রাস্তায় দু'চারজন আবির মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখছি, কুলতলার রাস্তাটা পুরো লাল টকটকে হয়ে আছে রঙে; সাধুচরণ কাকা গোলপুকুরে কানে আঙুল দিয়ে ডুব দিয়ে দিয়ে চান করছে এই বিকেল বেলা। আসলে এই মেলাটায় আমি কোনোদিনও যাইনি, বিপ্লব গেছে যদিও আগে কয়েকবার। মেলাটা হয় বোষ্টমপাড়ার অর্থবান মানুষ মদন বসুর পারিবারিক রাধাকান্তজিউ মন্দিরকে কেন্দ্র করে। বৈষ্ণব সাত্ত্বিক মানুষ মদন বোস, কলকাতায় কীসের খুব বড় ব্যবসা আছে; একসময় নাকি ওঁদের পূর্বপুরুষরা এখানকার নামকরা জমিদার ছিলো, এখন তো সেসব উঠে গেছে। আমি যদিও মদন বোসকে কোনোদিন দেখিনি, বাবার মুখে অনেক নাম শুনেছি; বিপ্লব নাকি দু'চারবার দেখেছে। বিপ্লব আর আমি বলা যায় হরিহর আত্মা, এইবছর দুজনে একসাথে এইট থেকে নাইনে উঠেছি। যদিও দস্যিপনা আর পড়াশোনা দুটোতেই বিপ্লব আমার থেকে কিছুটা ওপরেই; তবুও বিপ্লবকে ছাড়া যেমন আমার চলেনা, বিপ্লবেরও আমায় ছাড়া চলেনা। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই মেলায় পৌঁছে গেলাম আমরা, এখন থেকেই মেলায় প্রবল ভীড়; সাপের মতো লাইন দিয়ে লোকে মেলায় ঢুকছে। মেলার সামনে আমাদের পাড়ার নন্দীবুড়ির চা'য়ের দোকানে প্রচুর লোক ভীড় জমিয়েছে; বেঞ্চ একটাও খালি নেই। বিপ্লব হাঁক দিয়ে বললো, "ও নন্দীপিসি, সাইকেলটা তোমার দোকানের সামনে রাখবো?'' নন্দীবুড়ি ফোকলা দাঁতে হেসে বললো, "হ্যাঁ বাবা, রাখো। ফেরার সময় আড়াই টাকা দিয়ে যেও'খন।'' সেই সাপের মতো লাইনেই ঠেলাঠেলি করে দুজনে মেলার ভেতর ঢুকলাম, তেলেভাজার গন্ধে সঙ্গে সঙ্গেই পেটে খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠলো যেন; সেই দুপুরে ভাত খেয়ে মাঠে এসেছিলাম খেলতে। বিপ্লবকে বললাম, "তেলেভাজা খাবি?'' বিপ্লব বললো, "আমার কাছে ছ' টাকা আছে; তোর কাছে কতো?''"দু' টাকা।''"তাহলে আট টাকা, ঠিক আছে; চ'!"একজন টাকমাথা মোটা লোক খালি গা'য়ে বসে লোহার কড়ায় ছাঁকনি হাতায় 'ছ্যাঁক ছ্যাঁক' করে তেলগড়ানো বড় বড় আলুর চপ ভাজছিলো, আমরা এগিয়ে যেতেই লোকটা একগাল হেসে বললো, "কী খোকা? কী দেবো? আলুর চপ, বেগুনি, কুমড়োনি, কপির বড়া, ফুলুরি।'' বিপ্লব হাসতে হাসতে বললো, "দুটো করে চপ আর দুটো করে বেগুনি দুজনকে দাও।'' লোকটা হাসতে হাসতে শালপাতার ঠোঙায় গরম গরম তেলেভাজা দিলো দুজনকে; সবে গরম বেগুনিতে একটা কামড় বসিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে একটা অ্যানাউন্স শুনে কানখাড়া হয়ে গেলো."আসুন আসুন, জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডলের ভানুমতির খেল দেখে যান; আসুন দাদারা দিদিরা মাসিমা মেসোমশাইরা....দাদুরা ঠাকুমারা....দেখে যা-আ-আ-আ-ন।'' এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম হাতদশেক একজায়গায় খুব ভীড় জমিয়েছে কিছু লোক। মেলার মাঝখানে একটা স্টেজের মতো বেঁধে খোলা আকাশের নীচে একটা বেঁটে রোগা চোয়াড়ে ধরণের লোক রঙচঙে শার্ট প্যান্ট পরে মুখের সামনে একটা চোঙ মাইক ধরে মিহি সরুগলায় হাঁকছে, "আসুন আসুন সব্বাই আসুন; খেলা দেখুন সব। তিনটাকা তিনটাকা তিনটাকা! ভানুমতীর খেল....জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডলের ভানুমতীর খেল।'' এইবার দর্শকদের মাথা পেড়িয়ে জাদুকরকে চোখে পড়লো আমার। মঞ্চের ওপর একটা টুলে বসে আছেন বিপ্রদাস মন্ডল, ভীষণ বুড়ো; দেখলে মনে হয় বয়স সত্তরও হতে পারে, নব্বইও হতে পারে, একশোও হতে পারে। দড়িপাকানো রোগা চেহারা, একটা কালোরঙের তাপ্পিমারা কোট আর ময়লা ধুতি পরণে; একমুখ সাদা দাড়ি, ঘাড়টা কাঁপছে রীতিমতো। লম্বা লম্বা ঘাড় অবধী সাদা চুল, হাতদুটো শীর্ণ দড়ির মতো শিরাউপশিরা ভর্ত্তি; সরু সরু হাড়ের মতো আঙুলগুলো বেশ লম্বাটে। জাদুকরের গায়ের রঙ কয়লার মতো কালো; কিন্তু----মানুষটার চোখদুটো অদ্ভুত। কালো শীর্ণ মুখের ওপর বড়বড় চোখদুটো যেন ঝকঝক করে জ্বলছে, চকচকে চোখদুটোয় কী আছে জানিনা কিন্তু ওই চোখদুটোর তীব্র আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। বিপ্লব আমার পিঠে টোকা মেরে বললো, "চল, দেখতে দেখতে খাওয়া যাক।'' দুজনে এগিয়ে গেলাম মঞ্চের দিকে; ঠাকুরনাচ আর আবীরখেলা শুরু হতে এখনো ঘন্টাখানেক দেরী, তাই অনেকেই দেখলাম এই বুড়ো জাদুকরকে ঘিরে ভীড় জমাচ্ছে; মোটামুটি ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনের মতো দর্শক জমে গিয়েছে দেখে বেঁটে লোকটা চোঙ নামিয়ে রেখে একটা গামছা পেতে দিলো মঞ্চের সামনে, সবাই সেখানে তিনটাকা করে ফেলতে লাগলো; একফাঁকে বিপ্লবও তিনটাকা ছুঁড়ে দিলো গামছার ওপর। বেঁটে লোকটা দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাসিমুখে হাতজোড়ে পেন্নাম করে বললো, "এইবারে রাধেকৃষ্ণকে স্বরণ করে শুরু হবে ভানুমতীর খেল!'' আমি আলুরচপে একটা বড় কামড় দিয়ে তাকিয়ে রইলাম মঞ্চের দিকে। বেশ ঝাল দিয়েছে আলুর চপের পুরে, মাখো মাখো আলু আর কপির পুর; দিব্যি খেতে। এইসময় টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জাদুকর, আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম ওঁকে দেখে। বসে থাকা অবস্থায় জাদুকর যে এতোটা লম্বা বুঝতে পারিনি, বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে গেলেও বেঁটে লোকটা ওঁর কোমর পর্যন্ত। বৃদ্ধ জাদুকর ভীষণ গম্ভীর কন্ঠস্বরে বললেন, "কেউ একজন মঞ্চে আসুন; এক্ষুণি।'' সবার মধ্যেই একটা চাঞ্চল্য দেখা গেলো হঠাৎ, এ ওর দিকে চাওয়াচাওয়ি শুরু হলো। জাদুকর আবার বললেন, "খুব নিরীহ একটা খেলা; ভয় পাবেননা। একজন আসুন।'' ভীড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ ঠেলতে ঠেলতে একজন বছর বাইশেকের ছেলে এগিয়ে এলো; জাদুকর বললেন, "এসো ভাই, উঠে এসো।'' ছেলেটা মঞ্চে উঠে এলো একটু ইতস্তত করে। বৃদ্ধ বললেন, "ওই টুলটায় বোসো; ভয় নেই! তোমার কোনো ক্ষতি হবেনা, শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো।'' ছেলেটি চারপাশের দর্শকদের ভীড়ের দিকে চেয়ে একটা শুকনো হাসি হাসলো একবার; যেন কিছুই হয়নি, তবে ছেলেটার বোকা বোকা হাসিটা দেখে 'ফিক' করে হেসে ফেললো বিপ্লব। ওর এই হাসিটা আমি চিনি, কোনো দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় খেললেই এরকম 'ফিক ফিক' করে হাসে ও; আমি বিপ্লবের কোমড়ে আঙুলের একটা খোঁচা দিয়ে বললাম, "ওই, হাসছিস কেন রে?'' বিপ্লব আবার ওরকম করে হেসে দু'দিকে মাথা নেড়ে শেষ আলুরচপটাতে কামড় দিলো একটা; আর তখনই একটা দৃশ্য আমাকে মঞ্চের দিকে চাইতে বাধ্য করলো। ছেলেটা টুলে বসে আছে, চোখদুটো ঢুলুঢুলু হয়ে এসেছে ওর; মাথাটা আস্তে আস্তে বুকের ওপর নুয়ে পড়ছে, আর----বৃদ্ধ জাদুকর ওঁর চকচকে চোখদুটোয় একদৃষ্টে ছেলেটার দিকে চেয়ে হাতের আঙুল গুলোয় অদ্ভুত ভঙ্গি করছেন। আরে....একী দেখছি! ছেলেটাকে নিয়ে টুলটা মাটি থেকে একইঞ্চি শূণ্যে না? হ্যাঁ; ঠিক! টুলটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, ঠিক তখনই----সবাইকে চমকে দিয়ে দর্শকদের দিক থেকে একটা শালপাতার ঠোঙা ছিটকে গিয়ে লাগলো ছেলেটার গায়ে; তন্দ্রা ভাঙার মতো চমকে উঠলো ছেলেটা, টুলসুদ্ধ 'ধপাস' করে পড়ে গেলো মঞ্চের ওপর। নীরব দর্শকরা 'হো হো' করে হেসে উঠলো; আমি চমকে গিয়ে পাশে চাইলাম, "বিপ্লব তুই?'' বিপ্লব আমার দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসলো, ঠিক তখনই---বজ্রের মতো গলায় জাদুকর চেঁচিয়ে উঠলেন, "কে এটা ছুঁড়লেন? বলুন? সাহস থাকলে সামনে আসুন!! কে?'' চমকে তাকালাম জাদুকরের দিকে; রাগে থরথর করে কাঁপছেন বৃদ্ধ, কুলকুল করে ঘাম গড়াচ্ছে কপাল বেয়ে, বাঁ বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে হাঁফাচ্ছেন। পাশের বেঁটে লোকটা মিনমিন করে বললো, "উত্তেজিত হবেননা স্যার; উত্তেজিত হলে আপনার শরীর খারাপ হবে, তিনমাস আগে আপনার স্ট্রোক হয়ে গেছে....!'' জাদুকর গর্জন করে উঠলেন, "তুমি চুপ করো রমাপদ! এতোবড় সাহস কার; সম্মোহনের সময় এভাবে....!'' বুকটা চেপে ধরে বড় দম নিয়ে বৃদ্ধ দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, "কই? সাহস থাকলে আসুন! কে করেছেন এই কাজ? না এলে আমি নিজেই টেনে বের করে নেবো ঠিক!''দর্শকরা চুপ, সবার মধ্যে শুধু ফিসফিস করে আলোচনা হচ্ছে; হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বিপ্লব হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলো, "আমি!'' আমি চমকে উঠে বললাম, "এ...এই বিপ্লব; এটা কী করছিস তুই?'' বিপ্লব চোখ টিপলো আমার দিকে চেয়ে, জাদুকরের দৃষ্টি ততক্ষণে পৌঁছে গেছে বিপ্লবের ওপর; ঠোঁটের কোণায় একচিলতে হেসে বললেন,"ওহ! এসো ভাই এসো; মঞ্চে এসো। ভয় নেই, কোনো ক্ষতি হবেনা।'' এইপ্রথম বিপ্লবের মুখটা শুকনো দেখালো একটু, আমার মনে হলো ও ভয় পেয়েছে।"কী হলো? এসো!'' জাদুকর মোলায়েম স্বরে ডাকলেন ওকে, সাহস করে বিপ্লব এগিয়ে গেলো মঞ্চের দিকে। মঞ্চে উঠতে উঠতে আমার দিকে তাকিয়ে একবার কাষ্ঠ হাসি হেসে নিলো ও; আমি নিজেও কিছুটা হতবাক। বুড়ো জাদুকর বললেন, "এসো খোকা, তুমি ওই টুলটায় বোসো। কোনো ভয় নেই; শুধু কিছুক্ষণের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেবো তোমাকে।'' বিপ্লব মুচকি হেসে টুলটায় বসলো; জাদুকরের বলিরেখাময় কোটরাগত চোখদুটো আবার জ্বলে উঠলো সেরকম। চকচকে চোখে বিপ্লবের চোখের দিকে চেয়ে দু'হাত সামনে এনে অদ্ভুত সব ভঙ্গি করতে থাকলেন সরু সরু শীর্ণ আঙুলে; বৃদ্ধ ঠোঁটদুটো ছুঁচলো করে সাপখেলানো সুরে বলতে শুরু করলেন, "ঘুমিয়ে পড়ো........ ঘুমিয়ে পড়ো........ঘুমিয়ে পড়ো......ঘুমিয়ে পড়ো....!'' আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, বিপ্লবের চোখদুটো টেনে আসছে; ওর মাথাটা বুকের ওপর হেলে পড়ছে। ওকী অভিনয় করছে? নাঃ! বিপ্লবের মাথাটা বুকের ওপরে হেলে আছে....ও ঘুমিয়ে পড়েছে! জাদুকরের কপালে, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, শ্বাসকষ্টের মতো শ্বাস নিতে নিতে দু'হাতের আঙুলগুলো বিভিন্ন মুদ্রায় আনতে আনতে বলছেন, "ওঠো.....শূণ্যে ভেসে ওঠো.......ওঠো......!'' আর-----আমাদের চমকে দিয়ে টুল ছেড়ে বিপ্লবের বসা অবস্থার শরীরটা শুণ্যে ভেসে উঠলো; অল্প অল্প দুলতে দুলতে ও স্টেজের ওপরে উঠতে থাকলো ঘুমন্ত অবস্থাতেই।হঠাৎ মঞ্চের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম আমি, যন্ত্রণায় মুখ বিক্রিত করে হাত দিয়ে বাঁ'দিকের বুক চেপে ধরে স্টেজের ওপর বসে পড়েছেন জাদুকর, কাঁপা কাঁপা বাঁ হাতের তর্জনীটা তুলে শেষবারের মতো বললেন, "ও....ওঠো....!'' পরক্ষণেই---স্টেজে লুটিয়ে পড়লেন জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডল; আর বোঝা গেলো উনি আর কোনোদিনও উঠবেননা! দর্শকরা ছুটে গেলো ওঁ্র দিকে, আমিও ছুটে গেলাম সঙ্গে; বেঁটে লোকটি তখন হাত পা ছুঁড়ে বিপ্লবকে নামানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু----বিপ্লব স্টেজ ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে ধীরেধীরে; শূণ্যে উঠে যাচ্ছে ক্রমশই। আমি প্রাণপণে সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করলাম, "বি-প্ল-ব!! বিপ্লব নেমে আয় বিপ্লব......নেমে আ-য়-এ-এ-এ-এ!!'' একজন সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক, সম্ভবত ইস্কুল মাষ্টার.....জাদুকরের নাড়ি দেখলেন হাঁটুগেড়ে বসে, তারপর মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, বেঁচে নেই। কিন্তু ততক্ষণে দর্শকরা ভীড় করেছে বিপ্লবের জন্য, একমুহূর্তের জন্য আমার চোখের সামনে সবকিছু যেন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো; পায়ের তলার মাটি সরে গেলো! অন্যন্য মানুষগুলো চিৎকার করছে, "নেমে এসো ভাই, নেমে এসো!'' "ভাই নেমে এসো!'' আমার হাঁটুদুটো ঠকঠক করে কাঁপছিলো, জাদুকরের শেষ আদেশ মনে পড়ছিলো আমার, "ওঠো!'' সেই আদেশ সম্মোহিত বিপ্লবকে উঠিয়ে নিয়ে চলেছে; আমি আকাশের দিকে চেয়ে পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, "বি--প্ল--ব!!'' ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম আমি; কিন্তু আমার চোখের সামনে সদ্য ওঠা দোলপূর্ণিমার গোল চাঁদের কাছে একটা বিন্দুর মতো ভেসে যেতে যেতে অসীম ব্রম্ভান্ডে মিশে আমাদের দৃষ্টিশক্তি থেকে মুছে গেলো ও।সেই থেকে আজো অপেক্ষায় আছি, আবার কোনো ফুলমুন নাইটে হয়তো ফিরে আসবে বিপ্লব; আমাকে শোনাবে বিশাল বিশ্বব্রম্ভান্ডের গল্প, আর বলবে, "চল ঘুরে আসি। এখন তো আমরা বড় হয়ে গেছি..।।''           
                ------------

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...