Thursday, 3 August 2017

জাদুটোনা

"বাপি, ম্যাজিক শো দেখতে নিয়ে চলো না প্লিজ!'' অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে সবে টিভিতে নিউজ চ্যানেল দেখছিলাম, এইসময় রিম্পা ছুটে ছুটে ঘরে এসে বললো। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ওটা শেষ করে অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতে দিতে বললাম, "ম্যাজিক? কোথায় ম্যাজিক?'' রিম্পা ঘাড় দুলিয়ে বললো, "মহাজাতি সদনে শো হচ্ছে; পি.সি. সরকার। চলোনা বাপি, আমাদের স্কুলের ত্বিষা, অর্ক, পূজা সবাই গল্প করছিলো আজ; দারুণ এনজয় হবে। তাছাড়া অনেকদিন তো আমরা তিনজনে উইকএন্ডে কোথাও ঘুরতে যাইনি।'' এইসময় মেয়ের পেছন পেছন ঘরে ঢুকলো দেবলীনা, ওরও মুখে একই কথা, "হ্যাঁ গো, চলোনা। মেয়েটা স্কুল থেকে এসে অবধি নাচছে ম্যাজিক দেখতে যাবে বলে; তাছাড়া এইবছর উইন্টারে এখনো তো আমরা কোথাও বেড়োইনি।'' আমি মা মেয়ে দুজনের মুখের দিকে একবার তাকালাম; দুজনেই ওয়েট করছে আমার দিকে চেয়ে এক্সাম রেজাল্টের মতো। আমি একটু মজা করে হেসে বললাম, "যথা আজ্ঞা। চলো, নেক্সট সানডে ইভনিং; ডিনার বাইরে।'' হাততালি দিয়ে আনন্দে নেচে উঠলো রিম্পা, "ইয়াওওও হুররেএএ! লাভ ইউ মামমাম, লাভ ইউউউ!'' দেবলীনাকে জাপটে ধরে গালে ঠোঁট দুটো টোকা দিলো রিম্পা; আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, "বাঃরে! মামমাম? বাপি কি বানের জলে ভেসে এসেছে?'' দেবলীনা ঠোঁট উলটে আমার দিকে চোরা চোখে চেয়ে বললো, "হুঁহ! আর আমি যে বাপি কে রাজি করালাম?'' আমি মজা করে বললাম, "আর বাপি যে ম্যাজিক শো'য় নিয়ে যাবে বললো?'' রিম্পা ছুট্টে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গালে একটা 'হামি' দিয়ে বললো, "লাভ ইউ বাপি....লাভ ইউ! তোমরা আমার খুব খুউব স্যুইট বাপি আর মামমাম।'' আমি এলোমেলো চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বললাম, "লাভ ইউ টু রিম সোনা! মাই প্রিন্সেস।'' দেবলীনা রিম্পাকে চোখ গোলগোল করে বললো, "নাও, চলো এবার; বাপিকে রাজি করানো হয়েছে। এবার ডিনার করতে হবে!'' রিম্পা ছুট্টে চলে গেলো পাশের ঘরে, দেবলীনা আমার দিকে মজার শাসনের ভঙ্গিতে চেয়ে বললো, "কিগো? চলো; খাবে তো! নাকি এখানে এনে খাইয়ে দেবো?'' আমি ঠোঁটের কোণায় মুচকি হেসে বললাম, "দাও না খাইয়ে, অনেকদিন দাওনি তো!'' দেবলীনা লজ্জা মেশানো হাসি হেসে ''ধ্যাৎ" বলে চলে গেলো ডাইনিং হলে। সবই ঠিকঠাক, সুন্দর ছিমছাম মোটামুটি স্বচ্ছল সুখী সংসার আমার; আটবছরের মেয়ে রিম্পা আর বউ দেবলীনাকে নিয়ে। উইকএন্ডে প্রায়ই ভিক্টোরিয়া বা ইকোপার্ক, সায়েন্স সিটি কিংবা কিছু না হোক সাউথ কলকাতার কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ বা ডিনারে যাই আমরা তিনজন। সারা হপ্তার শেষে মুডটাও রিল্যাক্স হয়, ওরাও এনজয় করে ব্যপক। কিন্তু আজ.....ম্যাজিকের নামটা শুনেই হঠাৎ মাথার ভেতরে একটা ভোঁতা হয়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর স্মৃতি ঝলসে উঠলো আমার। ওই ঘটনাটার পর থেকেই আমি 'ম্যাজিক' জিনিষটা নিয়ে আর কালচার করিনা, বলা যায় এড়িয়ে চলি। কোনো মেলায় গিয়ে রিম্পা বিশেষ 'থ্রিডি শো' বা 'হন্টেড হাউস' এ ঢোকার বায়না করলেই স্মৃতিটা মাথার মধ্যে দপ করে ওঠে! যেমন আজ...। প্রায় কুড়ি বছর বাদে আবার ম্যাজিক শো'য় যাওয়ার কথা উঠলো। বিপ্লব! এখনো চোখ বুজলে বিপ্লবের সেইবয়সের চেহারাটা দেখতে পাই স্পষ্ট; রোগা, কালো, লম্বা, চুল ছোটো ছোটো করে ছাঁটার কারণে কানদুটো অতিরিক্ত লম্বা লাগতো, আর হাসলে ডানগালে টোল পড়তো ওর। বিপ্লব আজ কোথায়......আমি জানিনা! আদৌ আছে কী? পূর্ণিমার ফুলমুন নাইট হলেই আমি ছাদে উঠে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ওকে খুঁজি। আজ থেকে কুড়ি বছর আগের সেই দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যাটা.....।

খেলার মাঠ থেকে বেড়োতে বেড়োতে বিপ্লব বললো, "দোলের মেলায় যাবি?'' আমি বললাম, "সেতো অনেকদূর; সেই বোষ্টমপাড়া, কাঁঠালচাঁপার মাঠ পেড়িয়ে...কোনোদিন তো যাইনি!'' বিপ্লব আমার পিঠে একটা চাপড় মেরে বললো, "ধুর! এখন তো আমরা বড় হয়ে গেছি; এমন কী দূর? এই তো ভুঁড়িপুকুরের পাশ দিয়ে মিশ্রপাড়া, তারপর বৈষ্ণবটোল, তারপরেই বোষ্টম পাড়া। চ' তো।'' আমি চারপাশটা দেখলাম, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে এসেছে; শিরশিরে একটা দক্ষিণে হাওয়া দিচ্ছে গাছের পাতায় পাতায়। সকালেই বাঁদুরে রঙ মেখে ভূত হয়ে গিয়েছি সব্বাই; পুকুরে গিয়ে কষে কষে চান করেও রঙ ওঠেনি মুখ থেকে, তাই আমার একটু লজ্জা লজ্জা করছিলো সত্যিই। আমি মিনমিন করে বললাম, "কিন্তু বিপ্লব.....সূর্য ডুবে যাবে এক্ষুণি; ফিরতে দেরী হলে মা'ও বকবে কিন্তু।'' বিপ্লব হেসে বললো, "আরে কিচ্ছু হবেনা রে হাঁদারাম! সন্ধের মধ্যেই ফিরে আসবো; শুনলাম বহড়ু থেকে গোষ্ঠ ঘোষ এসেছে, অ্যাত্তো বড় বড় মোয়া বিক্কিরি হচ্ছে। চ' চ', দেরী করিসনা। কুলতলার ভেতর দিয়ে আমি শর্টকাট রাস্তা জানি একটা, তাড়াতাড়ি হবে।'' বিপ্লবের সাইকেলের পেছনে উঠে বসলাম; বিপ্লব প্যাডেলে পা দিয়েই ঝড়ের বেগে সাইকেলটা চালাতে শুরু করলো কুলতলার ভেতর দিয়ে। বেশ ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে, আকাশে হালকা গোলাপি আলো, সবেই সুর্য ডুব দিয়েছে পশ্চিমে; এখনো পশ্চিম আকাশটা লাল হয়ে আছে। এখনো রাস্তায় দু'চারজন আবির মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখছি, কুলতলার রাস্তাটা পুরো লাল টকটকে হয়ে আছে রঙে; সাধুচরণ কাকা গোলপুকুরে কানে আঙুল দিয়ে ডুব দিয়ে দিয়ে চান করছে এই বিকেল বেলা। আসলে এই মেলাটায় আমি কোনোদিনও যাইনি, বিপ্লব গেছে যদিও আগে কয়েকবার। মেলাটা হয় বোষ্টমপাড়ার অর্থবান মানুষ মদন বসুর পারিবারিক রাধাকান্তজিউ মন্দিরকে কেন্দ্র করে। বৈষ্ণব সাত্ত্বিক মানুষ মদন বোস, কলকাতায় কীসের খুব বড় ব্যবসা আছে; একসময় নাকি ওঁদের পূর্বপুরুষরা এখানকার নামকরা জমিদার ছিলো, এখন তো সেসব উঠে গেছে। আমি যদিও মদন বোসকে কোনোদিন দেখিনি, বাবার মুখে অনেক নাম শুনেছি; বিপ্লব নাকি দু'চারবার দেখেছে। বিপ্লব আর আমি বলা যায় হরিহর আত্মা, এইবছর দুজনে একসাথে এইট থেকে নাইনে উঠেছি। যদিও দস্যিপনা আর পড়াশোনা দুটোতেই বিপ্লব আমার থেকে কিছুটা ওপরেই; তবুও বিপ্লবকে ছাড়া যেমন আমার চলেনা, বিপ্লবেরও আমায় ছাড়া চলেনা। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যেই মেলায় পৌঁছে গেলাম আমরা, এখন থেকেই মেলায় প্রবল ভীড়; সাপের মতো লাইন দিয়ে লোকে মেলায় ঢুকছে। মেলার সামনে আমাদের পাড়ার নন্দীবুড়ির চা'য়ের দোকানে প্রচুর লোক ভীড় জমিয়েছে; বেঞ্চ একটাও খালি নেই। বিপ্লব হাঁক দিয়ে বললো, "ও নন্দীপিসি, সাইকেলটা তোমার দোকানের সামনে রাখবো?'' নন্দীবুড়ি ফোকলা দাঁতে হেসে বললো, "হ্যাঁ বাবা, রাখো। ফেরার সময় আড়াই টাকা দিয়ে যেও'খন।'' সেই সাপের মতো লাইনেই ঠেলাঠেলি করে দুজনে মেলার ভেতর ঢুকলাম, তেলেভাজার গন্ধে সঙ্গে সঙ্গেই পেটে খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠলো যেন; সেই দুপুরে ভাত খেয়ে মাঠে এসেছিলাম খেলতে। বিপ্লবকে বললাম, "তেলেভাজা খাবি?'' বিপ্লব বললো, "আমার কাছে ছ' টাকা আছে; তোর কাছে কতো?''"দু' টাকা।''"তাহলে আট টাকা, ঠিক আছে; চ'!"একজন টাকমাথা মোটা লোক খালি গা'য়ে বসে লোহার কড়ায় ছাঁকনি হাতায় 'ছ্যাঁক ছ্যাঁক' করে তেলগড়ানো বড় বড় আলুর চপ ভাজছিলো, আমরা এগিয়ে যেতেই লোকটা একগাল হেসে বললো, "কী খোকা? কী দেবো? আলুর চপ, বেগুনি, কুমড়োনি, কপির বড়া, ফুলুরি।'' বিপ্লব হাসতে হাসতে বললো, "দুটো করে চপ আর দুটো করে বেগুনি দুজনকে দাও।'' লোকটা হাসতে হাসতে শালপাতার ঠোঙায় গরম গরম তেলেভাজা দিলো দুজনকে; সবে গরম বেগুনিতে একটা কামড় বসিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে একটা অ্যানাউন্স শুনে কানখাড়া হয়ে গেলো."আসুন আসুন, জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডলের ভানুমতির খেল দেখে যান; আসুন দাদারা দিদিরা মাসিমা মেসোমশাইরা....দাদুরা ঠাকুমারা....দেখে যা-আ-আ-আ-ন।'' এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম হাতদশেক একজায়গায় খুব ভীড় জমিয়েছে কিছু লোক। মেলার মাঝখানে একটা স্টেজের মতো বেঁধে খোলা আকাশের নীচে একটা বেঁটে রোগা চোয়াড়ে ধরণের লোক রঙচঙে শার্ট প্যান্ট পরে মুখের সামনে একটা চোঙ মাইক ধরে মিহি সরুগলায় হাঁকছে, "আসুন আসুন সব্বাই আসুন; খেলা দেখুন সব। তিনটাকা তিনটাকা তিনটাকা! ভানুমতীর খেল....জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডলের ভানুমতীর খেল।'' এইবার দর্শকদের মাথা পেড়িয়ে জাদুকরকে চোখে পড়লো আমার। মঞ্চের ওপর একটা টুলে বসে আছেন বিপ্রদাস মন্ডল, ভীষণ বুড়ো; দেখলে মনে হয় বয়স সত্তরও হতে পারে, নব্বইও হতে পারে, একশোও হতে পারে। দড়িপাকানো রোগা চেহারা, একটা কালোরঙের তাপ্পিমারা কোট আর ময়লা ধুতি পরণে; একমুখ সাদা দাড়ি, ঘাড়টা কাঁপছে রীতিমতো। লম্বা লম্বা ঘাড় অবধী সাদা চুল, হাতদুটো শীর্ণ দড়ির মতো শিরাউপশিরা ভর্ত্তি; সরু সরু হাড়ের মতো আঙুলগুলো বেশ লম্বাটে। জাদুকরের গায়ের রঙ কয়লার মতো কালো; কিন্তু----মানুষটার চোখদুটো অদ্ভুত। কালো শীর্ণ মুখের ওপর বড়বড় চোখদুটো যেন ঝকঝক করে জ্বলছে, চকচকে চোখদুটোয় কী আছে জানিনা কিন্তু ওই চোখদুটোর তীব্র আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। বিপ্লব আমার পিঠে টোকা মেরে বললো, "চল, দেখতে দেখতে খাওয়া যাক।'' দুজনে এগিয়ে গেলাম মঞ্চের দিকে; ঠাকুরনাচ আর আবীরখেলা শুরু হতে এখনো ঘন্টাখানেক দেরী, তাই অনেকেই দেখলাম এই বুড়ো জাদুকরকে ঘিরে ভীড় জমাচ্ছে; মোটামুটি ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনের মতো দর্শক জমে গিয়েছে দেখে বেঁটে লোকটা চোঙ নামিয়ে রেখে একটা গামছা পেতে দিলো মঞ্চের সামনে, সবাই সেখানে তিনটাকা করে ফেলতে লাগলো; একফাঁকে বিপ্লবও তিনটাকা ছুঁড়ে দিলো গামছার ওপর। বেঁটে লোকটা দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাসিমুখে হাতজোড়ে পেন্নাম করে বললো, "এইবারে রাধেকৃষ্ণকে স্বরণ করে শুরু হবে ভানুমতীর খেল!'' আমি আলুরচপে একটা বড় কামড় দিয়ে তাকিয়ে রইলাম মঞ্চের দিকে। বেশ ঝাল দিয়েছে আলুর চপের পুরে, মাখো মাখো আলু আর কপির পুর; দিব্যি খেতে। এইসময় টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন জাদুকর, আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম ওঁকে দেখে। বসে থাকা অবস্থায় জাদুকর যে এতোটা লম্বা বুঝতে পারিনি, বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে গেলেও বেঁটে লোকটা ওঁর কোমর পর্যন্ত। বৃদ্ধ জাদুকর ভীষণ গম্ভীর কন্ঠস্বরে বললেন, "কেউ একজন মঞ্চে আসুন; এক্ষুণি।'' সবার মধ্যেই একটা চাঞ্চল্য দেখা গেলো হঠাৎ, এ ওর দিকে চাওয়াচাওয়ি শুরু হলো। জাদুকর আবার বললেন, "খুব নিরীহ একটা খেলা; ভয় পাবেননা। একজন আসুন।'' ভীড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ ঠেলতে ঠেলতে একজন বছর বাইশেকের ছেলে এগিয়ে এলো; জাদুকর বললেন, "এসো ভাই, উঠে এসো।'' ছেলেটা মঞ্চে উঠে এলো একটু ইতস্তত করে। বৃদ্ধ বললেন, "ওই টুলটায় বোসো; ভয় নেই! তোমার কোনো ক্ষতি হবেনা, শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবো।'' ছেলেটি চারপাশের দর্শকদের ভীড়ের দিকে চেয়ে একটা শুকনো হাসি হাসলো একবার; যেন কিছুই হয়নি, তবে ছেলেটার বোকা বোকা হাসিটা দেখে 'ফিক' করে হেসে ফেললো বিপ্লব। ওর এই হাসিটা আমি চিনি, কোনো দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় খেললেই এরকম 'ফিক ফিক' করে হাসে ও; আমি বিপ্লবের কোমড়ে আঙুলের একটা খোঁচা দিয়ে বললাম, "ওই, হাসছিস কেন রে?'' বিপ্লব আবার ওরকম করে হেসে দু'দিকে মাথা নেড়ে শেষ আলুরচপটাতে কামড় দিলো একটা; আর তখনই একটা দৃশ্য আমাকে মঞ্চের দিকে চাইতে বাধ্য করলো। ছেলেটা টুলে বসে আছে, চোখদুটো ঢুলুঢুলু হয়ে এসেছে ওর; মাথাটা আস্তে আস্তে বুকের ওপর নুয়ে পড়ছে, আর----বৃদ্ধ জাদুকর ওঁর চকচকে চোখদুটোয় একদৃষ্টে ছেলেটার দিকে চেয়ে হাতের আঙুল গুলোয় অদ্ভুত ভঙ্গি করছেন। আরে....একী দেখছি! ছেলেটাকে নিয়ে টুলটা মাটি থেকে একইঞ্চি শূণ্যে না? হ্যাঁ; ঠিক! টুলটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, ঠিক তখনই----সবাইকে চমকে দিয়ে দর্শকদের দিক থেকে একটা শালপাতার ঠোঙা ছিটকে গিয়ে লাগলো ছেলেটার গায়ে; তন্দ্রা ভাঙার মতো চমকে উঠলো ছেলেটা, টুলসুদ্ধ 'ধপাস' করে পড়ে গেলো মঞ্চের ওপর। নীরব দর্শকরা 'হো হো' করে হেসে উঠলো; আমি চমকে গিয়ে পাশে চাইলাম, "বিপ্লব তুই?'' বিপ্লব আমার দিকে চেয়ে দাঁত বের করে হাসলো, ঠিক তখনই---বজ্রের মতো গলায় জাদুকর চেঁচিয়ে উঠলেন, "কে এটা ছুঁড়লেন? বলুন? সাহস থাকলে সামনে আসুন!! কে?'' চমকে তাকালাম জাদুকরের দিকে; রাগে থরথর করে কাঁপছেন বৃদ্ধ, কুলকুল করে ঘাম গড়াচ্ছে কপাল বেয়ে, বাঁ বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে হাঁফাচ্ছেন। পাশের বেঁটে লোকটা মিনমিন করে বললো, "উত্তেজিত হবেননা স্যার; উত্তেজিত হলে আপনার শরীর খারাপ হবে, তিনমাস আগে আপনার স্ট্রোক হয়ে গেছে....!'' জাদুকর গর্জন করে উঠলেন, "তুমি চুপ করো রমাপদ! এতোবড় সাহস কার; সম্মোহনের সময় এভাবে....!'' বুকটা চেপে ধরে বড় দম নিয়ে বৃদ্ধ দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন, "কই? সাহস থাকলে আসুন! কে করেছেন এই কাজ? না এলে আমি নিজেই টেনে বের করে নেবো ঠিক!''দর্শকরা চুপ, সবার মধ্যে শুধু ফিসফিস করে আলোচনা হচ্ছে; হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বিপ্লব হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলো, "আমি!'' আমি চমকে উঠে বললাম, "এ...এই বিপ্লব; এটা কী করছিস তুই?'' বিপ্লব চোখ টিপলো আমার দিকে চেয়ে, জাদুকরের দৃষ্টি ততক্ষণে পৌঁছে গেছে বিপ্লবের ওপর; ঠোঁটের কোণায় একচিলতে হেসে বললেন,"ওহ! এসো ভাই এসো; মঞ্চে এসো। ভয় নেই, কোনো ক্ষতি হবেনা।'' এইপ্রথম বিপ্লবের মুখটা শুকনো দেখালো একটু, আমার মনে হলো ও ভয় পেয়েছে।"কী হলো? এসো!'' জাদুকর মোলায়েম স্বরে ডাকলেন ওকে, সাহস করে বিপ্লব এগিয়ে গেলো মঞ্চের দিকে। মঞ্চে উঠতে উঠতে আমার দিকে তাকিয়ে একবার কাষ্ঠ হাসি হেসে নিলো ও; আমি নিজেও কিছুটা হতবাক। বুড়ো জাদুকর বললেন, "এসো খোকা, তুমি ওই টুলটায় বোসো। কোনো ভয় নেই; শুধু কিছুক্ষণের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেবো তোমাকে।'' বিপ্লব মুচকি হেসে টুলটায় বসলো; জাদুকরের বলিরেখাময় কোটরাগত চোখদুটো আবার জ্বলে উঠলো সেরকম। চকচকে চোখে বিপ্লবের চোখের দিকে চেয়ে দু'হাত সামনে এনে অদ্ভুত সব ভঙ্গি করতে থাকলেন সরু সরু শীর্ণ আঙুলে; বৃদ্ধ ঠোঁটদুটো ছুঁচলো করে সাপখেলানো সুরে বলতে শুরু করলেন, "ঘুমিয়ে পড়ো........ ঘুমিয়ে পড়ো........ঘুমিয়ে পড়ো......ঘুমিয়ে পড়ো....!'' আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, বিপ্লবের চোখদুটো টেনে আসছে; ওর মাথাটা বুকের ওপর হেলে পড়ছে। ওকী অভিনয় করছে? নাঃ! বিপ্লবের মাথাটা বুকের ওপরে হেলে আছে....ও ঘুমিয়ে পড়েছে! জাদুকরের কপালে, মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, শ্বাসকষ্টের মতো শ্বাস নিতে নিতে দু'হাতের আঙুলগুলো বিভিন্ন মুদ্রায় আনতে আনতে বলছেন, "ওঠো.....শূণ্যে ভেসে ওঠো.......ওঠো......!'' আর-----আমাদের চমকে দিয়ে টুল ছেড়ে বিপ্লবের বসা অবস্থার শরীরটা শুণ্যে ভেসে উঠলো; অল্প অল্প দুলতে দুলতে ও স্টেজের ওপরে উঠতে থাকলো ঘুমন্ত অবস্থাতেই।হঠাৎ মঞ্চের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম আমি, যন্ত্রণায় মুখ বিক্রিত করে হাত দিয়ে বাঁ'দিকের বুক চেপে ধরে স্টেজের ওপর বসে পড়েছেন জাদুকর, কাঁপা কাঁপা বাঁ হাতের তর্জনীটা তুলে শেষবারের মতো বললেন, "ও....ওঠো....!'' পরক্ষণেই---স্টেজে লুটিয়ে পড়লেন জাদুকর বিপ্রদাস মন্ডল; আর বোঝা গেলো উনি আর কোনোদিনও উঠবেননা! দর্শকরা ছুটে গেলো ওঁ্র দিকে, আমিও ছুটে গেলাম সঙ্গে; বেঁটে লোকটি তখন হাত পা ছুঁড়ে বিপ্লবকে নামানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু----বিপ্লব স্টেজ ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গেছে ধীরেধীরে; শূণ্যে উঠে যাচ্ছে ক্রমশই। আমি প্রাণপণে সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করলাম, "বি-প্ল-ব!! বিপ্লব নেমে আয় বিপ্লব......নেমে আ-য়-এ-এ-এ-এ!!'' একজন সাদা ধুতি পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক, সম্ভবত ইস্কুল মাষ্টার.....জাদুকরের নাড়ি দেখলেন হাঁটুগেড়ে বসে, তারপর মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, বেঁচে নেই। কিন্তু ততক্ষণে দর্শকরা ভীড় করেছে বিপ্লবের জন্য, একমুহূর্তের জন্য আমার চোখের সামনে সবকিছু যেন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিলো; পায়ের তলার মাটি সরে গেলো! অন্যন্য মানুষগুলো চিৎকার করছে, "নেমে এসো ভাই, নেমে এসো!'' "ভাই নেমে এসো!'' আমার হাঁটুদুটো ঠকঠক করে কাঁপছিলো, জাদুকরের শেষ আদেশ মনে পড়ছিলো আমার, "ওঠো!'' সেই আদেশ সম্মোহিত বিপ্লবকে উঠিয়ে নিয়ে চলেছে; আমি আকাশের দিকে চেয়ে পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠলাম, "বি--প্ল--ব!!'' ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম আমি; কিন্তু আমার চোখের সামনে সদ্য ওঠা দোলপূর্ণিমার গোল চাঁদের কাছে একটা বিন্দুর মতো ভেসে যেতে যেতে অসীম ব্রম্ভান্ডে মিশে আমাদের দৃষ্টিশক্তি থেকে মুছে গেলো ও।সেই থেকে আজো অপেক্ষায় আছি, আবার কোনো ফুলমুন নাইটে হয়তো ফিরে আসবে বিপ্লব; আমাকে শোনাবে বিশাল বিশ্বব্রম্ভান্ডের গল্প, আর বলবে, "চল ঘুরে আসি। এখন তো আমরা বড় হয়ে গেছি..।।''           
                ------------

Wednesday, 2 August 2017

তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা

গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিলো কুয়াশা আর হিমে, হাইপারদুটো প্রাণপণে হাত মুছেও সামনের রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছিলোনা গাড়ির কাচে।বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা; বন্ধ গাড়ির ভেতরে বসেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো সেটা।গাড়ির সব কাচ তুলে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো অনিমেষ, এমনিতে ও যথেষ্ট ভালো ড্রাইভিং করলেও আজ স্টিয়ারিং এ বারবার হাতদুটো কেঁপে যাচ্ছিলো; পাহাড়ি ল্যান্ডিং বেয়ে এলোমেলো ভাবে গাড়িটা এগোচ্ছিলো আপডাউন হাইওয়ে দিয়ে। ডিসেম্বরের ঠান্ডায় বন্ধ গাড়ির ভেতরেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো অনিমেষের, ওর গায়ে একটা শার্টের ওপর হাতকাটা পুলওভার, তার ওপরে জ্যাকেট; তা সত্ত্বেও ঠান্ডাটা একটু বেশী বেশীই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো। তবে সেটা ঠান্ডায় না টেনশনে নিজেও বুঝতে পারছিলোনা অনিমেষ; ঠোঁটদুটো শুকিয়ে কাঠ। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ব্যাকসিটে দেখে নিলো ও, নিজের অজান্তেই শরীরটা শিউরে উঠলো একবার; হাজার হোক ওটা তো একটা....! যাক গে, ওটার দিকে বেশী তাকাবেনা অনিমেষ; টেনশনটা কমাতে একটা সিগারেট ধরালো ও। গাড়ির স্পিডটা কমিয়ে দিলো বেশ, একপাশের কাচ নামিয়ে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছিলো সিগারেটে। চওড়া হাইওয়ের একপাশে খাড়াই ল্যান্ডিং, আরেকপাশে গভীর খাদ। অনিমেষ সিগারেটটা শেষ করে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার কাচ তুলে এগোতে শুরু করলো; এবার স্পিড তুললো বেশ জোড়ে, স্পিডোমিটারের কাঁটা ছ'শো ছুঁইছুঁই। এই ল্যান্ডিং এর খাদের নীচে কিছু ভুটিয়া বস্তি আছে; আর দু' আড়াই কিমি পরেই খাদের ঘনত্ব প্রায় ছ'শ মিটার হয়ে যাবে, ওই গভীর খাদে জিনিষটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেই ব্যস! কেউ আর কোনোদিন খুঁজেও পাবেনা ওটা। মাথার ব্যাকব্রাশ চুলে নিজের মনেই একবার আঙুল চালিয়ে নিলো অনিমেষ; উউফ! খুন করাটা এতো সোজা ব্যাপার? তাহলে লোকে এতো ভয় পায় কেন? নিজের মনেই হেসে ফেললো ও। গাড়ির ডিকিতে মধুরিমার মাথাটা যত্ন করে রাখা আছে; ওর খুউব পছন্দের ভায়োলেট কালারের লেডিজ ব্যাগে, যেটা ও পুজো শপিং এর সময় কিনেছিলো একবার। আর ব্যাকসিটে স্যুটকেসের মধ্যে মধুরিমার মুন্ডুহীন শরীরটা, তিনটে শাড়ি ব্লাউজ আর দুটো চটি। ব্যস! হিসেব সোজা। শিলিগুড়িতে ফিরে অনায়াসে বলা যাবে, হোটেল থেকেই দুটো ব্যাগ নিয়ে কারোর সঙ্গে পালিয়ে গেছে মধুরিমা। থানা পুলিশ হয় হোক, পুলিশের সাধ্য নেই টিকির নাগাল পাওয়ার আসল অপরাধীর। অথচ দু'বছর আগেও ওদের সংসারটা ছিলো সাজানো গোছানো একটা টিপিক্যাল 'সুখী গৃহকোণ'। বিয়ের পর থেকেই যথেষ্ঠ আনন্দে কেটেছে দুজনের, সকালে শপিং মল কাফে বা রাতে বিছানায় সবরকম দস্যিপনা করেছে। কিন্তু হঠাৎ সুখের সংসারের বারুদ হলো শুভমিতা; যাকে সবসময় অনিমেষের 'যৌনতা' বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়। নক্কা ছক্কা হোটেলের বিছানায় আদরের সময় মুখে অস্ফুট ভালবাসার শব্দের মধ্যে গোঙানির মতো কয়েকবার 'যৌনতা' বলে ডেকেওছে ওকে। শুভমিতা ওর অফিসের নতুন স্টাফ, মেয়েটার রুপ না থাকলেও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া শরীর আছে; যে শরীরটার লোভে দিনের পর দিন রাতে বাড়ি ফিরতে পারেনি অনিমেষ, মধুরিমাকে অগ্রাহ্য করে বলেছে, "অফিসের প্রেশার খুব।'' মধুরিমা শরীরের সুখ দিতে পারলেও শুভমিতার মতো আগুন জ্বালাতে পারেনা। অনেকদিন থেকেই অপেক্ষা করছিলো অনিমেষ এই দিনটার জন্য, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছিলোনা। কিন্তু মধুরিমা দিনদিনই যেন বড্ড বেশী 'রাফ' হয়ে পড়ছিলো; কথায় কথায় আরো বেশী অসহ্য হয়ে আসছিলো অনিমেষের চোখে। হাজারটা অভিযোগ ওর, 'কেন অফিস থেকে ফিরবেনা রাতে?' 'কোথায় ছিলে?' 'কলিগদের ফোন ধরে দাও' মাঝে মাঝে অনিমেষের মনে হতো, মধুরিমা পুলিশ হলে ওর জেরার মুখে হাইফাই ক্রিমিনালরাও কনফেইস করতো। এই ট্যুরের প্ল্যানটা সেই থেকেই; রাতে বিছানায় মধুরিমাকে জাপটে ধরে বলেছিলো, "হানি, বেবি....চলোনা লং ড্রাইভে যাওয়া যাক। বেশীদূর নয়, নর্থবেঙ্গলের এদিকে কোথাওই..." মধু তখন মুখ দিয়ে টুকরো টুকরো তৃপ্তির শব্দ করছিলো আদরের মধ্যে। তবে একহপ্তার মধ্যেই ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে দিন চার-পাঁচেকের লং ড্রাইভে বেড়িয়ে পড়লো ওরা, ওদের শিলিগুড়ির বাড়ি থেকে অন কার'এ বড়জোর সতেরো-আঠের ঘন্টা পাসিং। ছোট্ট একটা পাহাড়ি মফস্বল এই পাসিং, যদিও এই ক্রিসমাসের হলিডে ট্যুরে পাসিং এ কোনো ট্যুরিস্ট আসেওনা। তারপর হোটেলের রুমে সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে বেড়োনোর আগে ড্রেস আপ করছিলো মধুরিমা; আর---ঠিক তখনই অনিমেষ ব্যাগের ভেতর থেকে বাঁটে রুমাল চেপে নেপালি কুকরিটা বের করেছিলো। সামান্য সময়, কয়েকটা মিনিট; দুটো মোক্ষম আঘাত পিঠের দিক থেকে ঘাড়ে---ধর থেকে মাথাটা ষাট ডিগ্রি কোণে হেলে পড়লো মধুরিমার। তারপর রুমের রক্ত মুছে মধুর মাথা আর শরীর দুটো আলাদা ব্যাগে ভরে তিনটে শাড়ি, একটা ব্লাউজ আর ব্রা, একজোড়া চটি আর কুকরিটা ব্যাগে নিয়ে রাত একটার সময় হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো অনিমেষ; কেউ দেখেনি নিশ্চয়ই। এই নক্কা ছক্কার হোটেলটায় সিসিটিভিও নেই, সুতরাং নির্বিঘ্নে কাজ সারতে বেড়িয়ে পড়েছিলো ও; হোটেলের সামনে নিজের গাড়িটা গ্যারেজ করা ছিলো। গাড়িটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলো অনিমেষ, তারপর থেকেই এখানে এসে পৌঁছেছে ও; হোটেলে ভোরের আগেই ফিরতে হবে। হাত উলটে ঘড়ি দেখলো ও, সোয়া দুটো।টেনশনে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর; কাজটা কাঁচা হয়ে গেলো কী? কাল ভোরের আগে ফিরতে না পারলে ধরা পড়ার চান্স রয়ে যাচ্ছে না? গুমোট পরিবেশটা কাটাতে এফ এমটা চালিয়ে দিলো ও, জোড়ে বেজে উঠলো, "বালাম পিচকারী যো তুনে মুঝে মারি''! আর প্রায় সাথে সাথেই একটা জোড়ে ঝাঁকুনি হয়ে গাড়িটা থেমে গেলো রাস্তার মাঝখানেই। কী ব্যাপার? কপালে ভাঁজ পড়লো অনিমেষের; দু'তিনবার স্টার্ট দিয়েও কোনো রেসপন্স না পেয়ে গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো ও। সাথে সাথেই জ্যাকেট, পুলওভার ফুঁড়ে শরীরের ভেতর অবধি কনকনে ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিলো ওকে। পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ আরেকটা গাড়িও নেই; চারপাশটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। গাড়ির বনেট খুলে কিছুক্ষণ 'খুটখাট' করলো ও, নাঃ! কিছুই করা যাচ্ছেনা; ইঞ্জিনও গরম হয়ে ওঠেনি। গাড়িটা যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওর মনে হলো গাড়িটা 'মারা' গেছে! বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিলোনা অনিমেষ; ওর শরীরটা কাঁপছিলো প্রচন্ড ঠান্ডায়। ও গাড়ির ভেতরে এসে বসে সিগারেট ধরালো আবার একটা; অসহ্য টেনশন বুকের ভেতরে যেন হাতুড়ি পিটছিলো। সারারাত কী তাহলে এই গাড়ির মধ্যে এইভাবে বসে থাকতে হবে? ওই ছিন্ন দুটো ধর আর মাথার সাথে!! চিন্তাটা মাথায় আসতেই শিউরে উঠলো অনিমেষ; আর প্রায় সাথে সাথেই সিগারেটের ধোঁয়ার জন্য খুলে রাখা জানলার কাচটা নিজে থেকেই ওপরে উঠে বন্ধ হয়ে গেলো, চমকে উঠলো ও। দ্রুত কাচ নামানোর 'প্রেশ' লকটা ধরে মোচড় দিলো, 'ঘটাং ঘটাং' শব্দ হল; কিন্তু কাচ একচুলও নামলোনা। প্রবল আতঙ্কে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো অনিমেষের, দরজা খোলার জন্য পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো ও; জ্যাম হয়ে গেলো নাকি দরজাটা? সত্যিই দুদিকের দরজাই পুরোপুরি জ্যাম; খোলা যাচ্ছেনা! বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো অনিমেষের কপালে, ওর গলাটা ক্রমশই কাঠ হয়ে আসছিলো শুকিয়ে; সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিলো চোখের সামনে। হঠাৎ----লুকিং গ্লাসের ওপর চোখ পড়লো অনিমেষের; আর---সাথে সাথেই আপনা থেকেই একটা প্রবল ভয়ের আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর মুখ থেকে! লুকিং গ্লাসে যেখানে ছোটা ভীমের সফট টয় ফিগার ঝোলে, সেখানে ওটা কী? মধুরিমার......মাথা!! ভুল দেখছে কী অনিমেষ? নাঃ; ওইতো! মধুরিমার মাথা---কাটা গলার নীচে থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে স্টিয়ারিং এর পাশে....আর চোখদুটো খোলা! হিংস্র আক্রোশে চোখদুটো চেয়ে আছে ওরই দিকে, মুখের চারপাশে সাপের ফণার মতো চুলগুলো উড়ছে ওর। অনিমেষ পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো, ভয়ের এত কাছাকাছি ও কখনো আসেনি! হঠাৎ-----কাঁধের ওপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো ও, ধীরে ধীরে ঘাড়টা পেছনে ঘুরিয়েই যা দেখলো তাতে একমুহূর্তে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফের কুচি গড়িয়ে পড়লো ওর। ব্যাকসীটে বসে আছে মধুরিমার ধরটা, গোলাপি রঙের সেই শাড়িটাই পড়ে আছে শরীরটা; মাথা নেই! ধরের ওপর শুধু একটা মাংসের পিন্ড, কারণ---মাথাটা এখন অনিমেষের সামনে ঝুলছে লুকিং গ্লাস থেকে। পাগলাটে ভয়ে অর্থহীন ভাষায় আর্তনাদ করলো ও; প্রবল ভয়ের চিৎকারটা বারবার বেড়িয়ে আসছিলো ওর মুখ থেকে! সহসা গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্টার্ট হয়ে গেলো, এলোমেলো পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ ছুটতে শুরু করলো। হতবাক অনিমেষ দেখলো, নিজে থেকেই স্পিডোমিটারের কাঁটা চড়চড় করে উঠে যাচ্ছে; ওর সামনে মধুরিমার মাথা, পেছনের সীটে শরীর----অনিমেষ ব্রেকটাতে সজোড়ে চাপ দিচ্ছিলো পা দিয়ে, কিন্তু ব্রেক কাজ করছিলোনা কোনো। হঠাৎই 'ঘড়ঘড়ঘড়' শব্দ হয়ে চালু হয়ে গেলো এফ এমটা; আর-----রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে নারীকন্ঠের হাসি ছড়িয়ে গেলো চারপাশে! মধুরিমা!! অনিমেষ পাগলের মতো স্টিয়ারিংটা ঘোরাচ্ছিলো, কিন্তু ও নিজেও বুঝতে পারছিলো গাড়ির কন্ট্রোল এখন অপার্থিব শক্তির হাতে।
"হি হি হি হি হি'' হাসির শব্দটা বাড়ছিলো, অনিমেষ কাঁধের ওপর সরু সরু নখের আঁচড় টের পাচ্ছিলো; আর---লুকিংগ্লাসের ঝোলানো মধুরিমার মুখের হাসিটা চওড়া হচ্ছিলো। গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছিলো গভীর খাদের দিকে, অনিমেষ পাগলের মতো চিৎকার করছিলো প্রবল ভয়ে; কিন্তু সেই চিৎকারটা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘা খেয়ে ফিরছিলো শুধু। কারণ----তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা।।

                ------------------------------

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...