Wednesday, 2 August 2017

তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা

গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিলো কুয়াশা আর হিমে, হাইপারদুটো প্রাণপণে হাত মুছেও সামনের রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছিলোনা গাড়ির কাচে।বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা; বন্ধ গাড়ির ভেতরে বসেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো সেটা।গাড়ির সব কাচ তুলে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো অনিমেষ, এমনিতে ও যথেষ্ট ভালো ড্রাইভিং করলেও আজ স্টিয়ারিং এ বারবার হাতদুটো কেঁপে যাচ্ছিলো; পাহাড়ি ল্যান্ডিং বেয়ে এলোমেলো ভাবে গাড়িটা এগোচ্ছিলো আপডাউন হাইওয়ে দিয়ে। ডিসেম্বরের ঠান্ডায় বন্ধ গাড়ির ভেতরেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো অনিমেষের, ওর গায়ে একটা শার্টের ওপর হাতকাটা পুলওভার, তার ওপরে জ্যাকেট; তা সত্ত্বেও ঠান্ডাটা একটু বেশী বেশীই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো। তবে সেটা ঠান্ডায় না টেনশনে নিজেও বুঝতে পারছিলোনা অনিমেষ; ঠোঁটদুটো শুকিয়ে কাঠ। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ব্যাকসিটে দেখে নিলো ও, নিজের অজান্তেই শরীরটা শিউরে উঠলো একবার; হাজার হোক ওটা তো একটা....! যাক গে, ওটার দিকে বেশী তাকাবেনা অনিমেষ; টেনশনটা কমাতে একটা সিগারেট ধরালো ও। গাড়ির স্পিডটা কমিয়ে দিলো বেশ, একপাশের কাচ নামিয়ে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছিলো সিগারেটে। চওড়া হাইওয়ের একপাশে খাড়াই ল্যান্ডিং, আরেকপাশে গভীর খাদ। অনিমেষ সিগারেটটা শেষ করে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার কাচ তুলে এগোতে শুরু করলো; এবার স্পিড তুললো বেশ জোড়ে, স্পিডোমিটারের কাঁটা ছ'শো ছুঁইছুঁই। এই ল্যান্ডিং এর খাদের নীচে কিছু ভুটিয়া বস্তি আছে; আর দু' আড়াই কিমি পরেই খাদের ঘনত্ব প্রায় ছ'শ মিটার হয়ে যাবে, ওই গভীর খাদে জিনিষটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেই ব্যস! কেউ আর কোনোদিন খুঁজেও পাবেনা ওটা। মাথার ব্যাকব্রাশ চুলে নিজের মনেই একবার আঙুল চালিয়ে নিলো অনিমেষ; উউফ! খুন করাটা এতো সোজা ব্যাপার? তাহলে লোকে এতো ভয় পায় কেন? নিজের মনেই হেসে ফেললো ও। গাড়ির ডিকিতে মধুরিমার মাথাটা যত্ন করে রাখা আছে; ওর খুউব পছন্দের ভায়োলেট কালারের লেডিজ ব্যাগে, যেটা ও পুজো শপিং এর সময় কিনেছিলো একবার। আর ব্যাকসিটে স্যুটকেসের মধ্যে মধুরিমার মুন্ডুহীন শরীরটা, তিনটে শাড়ি ব্লাউজ আর দুটো চটি। ব্যস! হিসেব সোজা। শিলিগুড়িতে ফিরে অনায়াসে বলা যাবে, হোটেল থেকেই দুটো ব্যাগ নিয়ে কারোর সঙ্গে পালিয়ে গেছে মধুরিমা। থানা পুলিশ হয় হোক, পুলিশের সাধ্য নেই টিকির নাগাল পাওয়ার আসল অপরাধীর। অথচ দু'বছর আগেও ওদের সংসারটা ছিলো সাজানো গোছানো একটা টিপিক্যাল 'সুখী গৃহকোণ'। বিয়ের পর থেকেই যথেষ্ঠ আনন্দে কেটেছে দুজনের, সকালে শপিং মল কাফে বা রাতে বিছানায় সবরকম দস্যিপনা করেছে। কিন্তু হঠাৎ সুখের সংসারের বারুদ হলো শুভমিতা; যাকে সবসময় অনিমেষের 'যৌনতা' বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়। নক্কা ছক্কা হোটেলের বিছানায় আদরের সময় মুখে অস্ফুট ভালবাসার শব্দের মধ্যে গোঙানির মতো কয়েকবার 'যৌনতা' বলে ডেকেওছে ওকে। শুভমিতা ওর অফিসের নতুন স্টাফ, মেয়েটার রুপ না থাকলেও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া শরীর আছে; যে শরীরটার লোভে দিনের পর দিন রাতে বাড়ি ফিরতে পারেনি অনিমেষ, মধুরিমাকে অগ্রাহ্য করে বলেছে, "অফিসের প্রেশার খুব।'' মধুরিমা শরীরের সুখ দিতে পারলেও শুভমিতার মতো আগুন জ্বালাতে পারেনা। অনেকদিন থেকেই অপেক্ষা করছিলো অনিমেষ এই দিনটার জন্য, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছিলোনা। কিন্তু মধুরিমা দিনদিনই যেন বড্ড বেশী 'রাফ' হয়ে পড়ছিলো; কথায় কথায় আরো বেশী অসহ্য হয়ে আসছিলো অনিমেষের চোখে। হাজারটা অভিযোগ ওর, 'কেন অফিস থেকে ফিরবেনা রাতে?' 'কোথায় ছিলে?' 'কলিগদের ফোন ধরে দাও' মাঝে মাঝে অনিমেষের মনে হতো, মধুরিমা পুলিশ হলে ওর জেরার মুখে হাইফাই ক্রিমিনালরাও কনফেইস করতো। এই ট্যুরের প্ল্যানটা সেই থেকেই; রাতে বিছানায় মধুরিমাকে জাপটে ধরে বলেছিলো, "হানি, বেবি....চলোনা লং ড্রাইভে যাওয়া যাক। বেশীদূর নয়, নর্থবেঙ্গলের এদিকে কোথাওই..." মধু তখন মুখ দিয়ে টুকরো টুকরো তৃপ্তির শব্দ করছিলো আদরের মধ্যে। তবে একহপ্তার মধ্যেই ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে দিন চার-পাঁচেকের লং ড্রাইভে বেড়িয়ে পড়লো ওরা, ওদের শিলিগুড়ির বাড়ি থেকে অন কার'এ বড়জোর সতেরো-আঠের ঘন্টা পাসিং। ছোট্ট একটা পাহাড়ি মফস্বল এই পাসিং, যদিও এই ক্রিসমাসের হলিডে ট্যুরে পাসিং এ কোনো ট্যুরিস্ট আসেওনা। তারপর হোটেলের রুমে সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে বেড়োনোর আগে ড্রেস আপ করছিলো মধুরিমা; আর---ঠিক তখনই অনিমেষ ব্যাগের ভেতর থেকে বাঁটে রুমাল চেপে নেপালি কুকরিটা বের করেছিলো। সামান্য সময়, কয়েকটা মিনিট; দুটো মোক্ষম আঘাত পিঠের দিক থেকে ঘাড়ে---ধর থেকে মাথাটা ষাট ডিগ্রি কোণে হেলে পড়লো মধুরিমার। তারপর রুমের রক্ত মুছে মধুর মাথা আর শরীর দুটো আলাদা ব্যাগে ভরে তিনটে শাড়ি, একটা ব্লাউজ আর ব্রা, একজোড়া চটি আর কুকরিটা ব্যাগে নিয়ে রাত একটার সময় হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো অনিমেষ; কেউ দেখেনি নিশ্চয়ই। এই নক্কা ছক্কার হোটেলটায় সিসিটিভিও নেই, সুতরাং নির্বিঘ্নে কাজ সারতে বেড়িয়ে পড়েছিলো ও; হোটেলের সামনে নিজের গাড়িটা গ্যারেজ করা ছিলো। গাড়িটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলো অনিমেষ, তারপর থেকেই এখানে এসে পৌঁছেছে ও; হোটেলে ভোরের আগেই ফিরতে হবে। হাত উলটে ঘড়ি দেখলো ও, সোয়া দুটো।টেনশনে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর; কাজটা কাঁচা হয়ে গেলো কী? কাল ভোরের আগে ফিরতে না পারলে ধরা পড়ার চান্স রয়ে যাচ্ছে না? গুমোট পরিবেশটা কাটাতে এফ এমটা চালিয়ে দিলো ও, জোড়ে বেজে উঠলো, "বালাম পিচকারী যো তুনে মুঝে মারি''! আর প্রায় সাথে সাথেই একটা জোড়ে ঝাঁকুনি হয়ে গাড়িটা থেমে গেলো রাস্তার মাঝখানেই। কী ব্যাপার? কপালে ভাঁজ পড়লো অনিমেষের; দু'তিনবার স্টার্ট দিয়েও কোনো রেসপন্স না পেয়ে গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো ও। সাথে সাথেই জ্যাকেট, পুলওভার ফুঁড়ে শরীরের ভেতর অবধি কনকনে ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিলো ওকে। পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ আরেকটা গাড়িও নেই; চারপাশটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। গাড়ির বনেট খুলে কিছুক্ষণ 'খুটখাট' করলো ও, নাঃ! কিছুই করা যাচ্ছেনা; ইঞ্জিনও গরম হয়ে ওঠেনি। গাড়িটা যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওর মনে হলো গাড়িটা 'মারা' গেছে! বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিলোনা অনিমেষ; ওর শরীরটা কাঁপছিলো প্রচন্ড ঠান্ডায়। ও গাড়ির ভেতরে এসে বসে সিগারেট ধরালো আবার একটা; অসহ্য টেনশন বুকের ভেতরে যেন হাতুড়ি পিটছিলো। সারারাত কী তাহলে এই গাড়ির মধ্যে এইভাবে বসে থাকতে হবে? ওই ছিন্ন দুটো ধর আর মাথার সাথে!! চিন্তাটা মাথায় আসতেই শিউরে উঠলো অনিমেষ; আর প্রায় সাথে সাথেই সিগারেটের ধোঁয়ার জন্য খুলে রাখা জানলার কাচটা নিজে থেকেই ওপরে উঠে বন্ধ হয়ে গেলো, চমকে উঠলো ও। দ্রুত কাচ নামানোর 'প্রেশ' লকটা ধরে মোচড় দিলো, 'ঘটাং ঘটাং' শব্দ হল; কিন্তু কাচ একচুলও নামলোনা। প্রবল আতঙ্কে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো অনিমেষের, দরজা খোলার জন্য পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো ও; জ্যাম হয়ে গেলো নাকি দরজাটা? সত্যিই দুদিকের দরজাই পুরোপুরি জ্যাম; খোলা যাচ্ছেনা! বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো অনিমেষের কপালে, ওর গলাটা ক্রমশই কাঠ হয়ে আসছিলো শুকিয়ে; সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিলো চোখের সামনে। হঠাৎ----লুকিং গ্লাসের ওপর চোখ পড়লো অনিমেষের; আর---সাথে সাথেই আপনা থেকেই একটা প্রবল ভয়ের আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর মুখ থেকে! লুকিং গ্লাসে যেখানে ছোটা ভীমের সফট টয় ফিগার ঝোলে, সেখানে ওটা কী? মধুরিমার......মাথা!! ভুল দেখছে কী অনিমেষ? নাঃ; ওইতো! মধুরিমার মাথা---কাটা গলার নীচে থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে স্টিয়ারিং এর পাশে....আর চোখদুটো খোলা! হিংস্র আক্রোশে চোখদুটো চেয়ে আছে ওরই দিকে, মুখের চারপাশে সাপের ফণার মতো চুলগুলো উড়ছে ওর। অনিমেষ পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো, ভয়ের এত কাছাকাছি ও কখনো আসেনি! হঠাৎ-----কাঁধের ওপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো ও, ধীরে ধীরে ঘাড়টা পেছনে ঘুরিয়েই যা দেখলো তাতে একমুহূর্তে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফের কুচি গড়িয়ে পড়লো ওর। ব্যাকসীটে বসে আছে মধুরিমার ধরটা, গোলাপি রঙের সেই শাড়িটাই পড়ে আছে শরীরটা; মাথা নেই! ধরের ওপর শুধু একটা মাংসের পিন্ড, কারণ---মাথাটা এখন অনিমেষের সামনে ঝুলছে লুকিং গ্লাস থেকে। পাগলাটে ভয়ে অর্থহীন ভাষায় আর্তনাদ করলো ও; প্রবল ভয়ের চিৎকারটা বারবার বেড়িয়ে আসছিলো ওর মুখ থেকে! সহসা গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্টার্ট হয়ে গেলো, এলোমেলো পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ ছুটতে শুরু করলো। হতবাক অনিমেষ দেখলো, নিজে থেকেই স্পিডোমিটারের কাঁটা চড়চড় করে উঠে যাচ্ছে; ওর সামনে মধুরিমার মাথা, পেছনের সীটে শরীর----অনিমেষ ব্রেকটাতে সজোড়ে চাপ দিচ্ছিলো পা দিয়ে, কিন্তু ব্রেক কাজ করছিলোনা কোনো। হঠাৎই 'ঘড়ঘড়ঘড়' শব্দ হয়ে চালু হয়ে গেলো এফ এমটা; আর-----রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে নারীকন্ঠের হাসি ছড়িয়ে গেলো চারপাশে! মধুরিমা!! অনিমেষ পাগলের মতো স্টিয়ারিংটা ঘোরাচ্ছিলো, কিন্তু ও নিজেও বুঝতে পারছিলো গাড়ির কন্ট্রোল এখন অপার্থিব শক্তির হাতে।
"হি হি হি হি হি'' হাসির শব্দটা বাড়ছিলো, অনিমেষ কাঁধের ওপর সরু সরু নখের আঁচড় টের পাচ্ছিলো; আর---লুকিংগ্লাসের ঝোলানো মধুরিমার মুখের হাসিটা চওড়া হচ্ছিলো। গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছিলো গভীর খাদের দিকে, অনিমেষ পাগলের মতো চিৎকার করছিলো প্রবল ভয়ে; কিন্তু সেই চিৎকারটা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘা খেয়ে ফিরছিলো শুধু। কারণ----তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা।।

                ------------------------------

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...