Wednesday, 2 August 2017

তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা

গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন বারবার ঝাপসা হয়ে আসছিলো কুয়াশা আর হিমে, হাইপারদুটো প্রাণপণে হাত মুছেও সামনের রাস্তা পরিষ্কার হচ্ছিলোনা গাড়ির কাচে।বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা; বন্ধ গাড়ির ভেতরে বসেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো সেটা।গাড়ির সব কাচ তুলে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো অনিমেষ, এমনিতে ও যথেষ্ট ভালো ড্রাইভিং করলেও আজ স্টিয়ারিং এ বারবার হাতদুটো কেঁপে যাচ্ছিলো; পাহাড়ি ল্যান্ডিং বেয়ে এলোমেলো ভাবে গাড়িটা এগোচ্ছিলো আপডাউন হাইওয়ে দিয়ে। ডিসেম্বরের ঠান্ডায় বন্ধ গাড়ির ভেতরেও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো অনিমেষের, ওর গায়ে একটা শার্টের ওপর হাতকাটা পুলওভার, তার ওপরে জ্যাকেট; তা সত্ত্বেও ঠান্ডাটা একটু বেশী বেশীই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো। তবে সেটা ঠান্ডায় না টেনশনে নিজেও বুঝতে পারছিলোনা অনিমেষ; ঠোঁটদুটো শুকিয়ে কাঠ। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ব্যাকসিটে দেখে নিলো ও, নিজের অজান্তেই শরীরটা শিউরে উঠলো একবার; হাজার হোক ওটা তো একটা....! যাক গে, ওটার দিকে বেশী তাকাবেনা অনিমেষ; টেনশনটা কমাতে একটা সিগারেট ধরালো ও। গাড়ির স্পিডটা কমিয়ে দিলো বেশ, একপাশের কাচ নামিয়ে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছিলো সিগারেটে। চওড়া হাইওয়ের একপাশে খাড়াই ল্যান্ডিং, আরেকপাশে গভীর খাদ। অনিমেষ সিগারেটটা শেষ করে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার কাচ তুলে এগোতে শুরু করলো; এবার স্পিড তুললো বেশ জোড়ে, স্পিডোমিটারের কাঁটা ছ'শো ছুঁইছুঁই। এই ল্যান্ডিং এর খাদের নীচে কিছু ভুটিয়া বস্তি আছে; আর দু' আড়াই কিমি পরেই খাদের ঘনত্ব প্রায় ছ'শ মিটার হয়ে যাবে, ওই গভীর খাদে জিনিষটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেই ব্যস! কেউ আর কোনোদিন খুঁজেও পাবেনা ওটা। মাথার ব্যাকব্রাশ চুলে নিজের মনেই একবার আঙুল চালিয়ে নিলো অনিমেষ; উউফ! খুন করাটা এতো সোজা ব্যাপার? তাহলে লোকে এতো ভয় পায় কেন? নিজের মনেই হেসে ফেললো ও। গাড়ির ডিকিতে মধুরিমার মাথাটা যত্ন করে রাখা আছে; ওর খুউব পছন্দের ভায়োলেট কালারের লেডিজ ব্যাগে, যেটা ও পুজো শপিং এর সময় কিনেছিলো একবার। আর ব্যাকসিটে স্যুটকেসের মধ্যে মধুরিমার মুন্ডুহীন শরীরটা, তিনটে শাড়ি ব্লাউজ আর দুটো চটি। ব্যস! হিসেব সোজা। শিলিগুড়িতে ফিরে অনায়াসে বলা যাবে, হোটেল থেকেই দুটো ব্যাগ নিয়ে কারোর সঙ্গে পালিয়ে গেছে মধুরিমা। থানা পুলিশ হয় হোক, পুলিশের সাধ্য নেই টিকির নাগাল পাওয়ার আসল অপরাধীর। অথচ দু'বছর আগেও ওদের সংসারটা ছিলো সাজানো গোছানো একটা টিপিক্যাল 'সুখী গৃহকোণ'। বিয়ের পর থেকেই যথেষ্ঠ আনন্দে কেটেছে দুজনের, সকালে শপিং মল কাফে বা রাতে বিছানায় সবরকম দস্যিপনা করেছে। কিন্তু হঠাৎ সুখের সংসারের বারুদ হলো শুভমিতা; যাকে সবসময় অনিমেষের 'যৌনতা' বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়। নক্কা ছক্কা হোটেলের বিছানায় আদরের সময় মুখে অস্ফুট ভালবাসার শব্দের মধ্যে গোঙানির মতো কয়েকবার 'যৌনতা' বলে ডেকেওছে ওকে। শুভমিতা ওর অফিসের নতুন স্টাফ, মেয়েটার রুপ না থাকলেও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া শরীর আছে; যে শরীরটার লোভে দিনের পর দিন রাতে বাড়ি ফিরতে পারেনি অনিমেষ, মধুরিমাকে অগ্রাহ্য করে বলেছে, "অফিসের প্রেশার খুব।'' মধুরিমা শরীরের সুখ দিতে পারলেও শুভমিতার মতো আগুন জ্বালাতে পারেনা। অনেকদিন থেকেই অপেক্ষা করছিলো অনিমেষ এই দিনটার জন্য, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছিলোনা। কিন্তু মধুরিমা দিনদিনই যেন বড্ড বেশী 'রাফ' হয়ে পড়ছিলো; কথায় কথায় আরো বেশী অসহ্য হয়ে আসছিলো অনিমেষের চোখে। হাজারটা অভিযোগ ওর, 'কেন অফিস থেকে ফিরবেনা রাতে?' 'কোথায় ছিলে?' 'কলিগদের ফোন ধরে দাও' মাঝে মাঝে অনিমেষের মনে হতো, মধুরিমা পুলিশ হলে ওর জেরার মুখে হাইফাই ক্রিমিনালরাও কনফেইস করতো। এই ট্যুরের প্ল্যানটা সেই থেকেই; রাতে বিছানায় মধুরিমাকে জাপটে ধরে বলেছিলো, "হানি, বেবি....চলোনা লং ড্রাইভে যাওয়া যাক। বেশীদূর নয়, নর্থবেঙ্গলের এদিকে কোথাওই..." মধু তখন মুখ দিয়ে টুকরো টুকরো তৃপ্তির শব্দ করছিলো আদরের মধ্যে। তবে একহপ্তার মধ্যেই ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে দিন চার-পাঁচেকের লং ড্রাইভে বেড়িয়ে পড়লো ওরা, ওদের শিলিগুড়ির বাড়ি থেকে অন কার'এ বড়জোর সতেরো-আঠের ঘন্টা পাসিং। ছোট্ট একটা পাহাড়ি মফস্বল এই পাসিং, যদিও এই ক্রিসমাসের হলিডে ট্যুরে পাসিং এ কোনো ট্যুরিস্ট আসেওনা। তারপর হোটেলের রুমে সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে বেড়োনোর আগে ড্রেস আপ করছিলো মধুরিমা; আর---ঠিক তখনই অনিমেষ ব্যাগের ভেতর থেকে বাঁটে রুমাল চেপে নেপালি কুকরিটা বের করেছিলো। সামান্য সময়, কয়েকটা মিনিট; দুটো মোক্ষম আঘাত পিঠের দিক থেকে ঘাড়ে---ধর থেকে মাথাটা ষাট ডিগ্রি কোণে হেলে পড়লো মধুরিমার। তারপর রুমের রক্ত মুছে মধুর মাথা আর শরীর দুটো আলাদা ব্যাগে ভরে তিনটে শাড়ি, একটা ব্লাউজ আর ব্রা, একজোড়া চটি আর কুকরিটা ব্যাগে নিয়ে রাত একটার সময় হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লো অনিমেষ; কেউ দেখেনি নিশ্চয়ই। এই নক্কা ছক্কার হোটেলটায় সিসিটিভিও নেই, সুতরাং নির্বিঘ্নে কাজ সারতে বেড়িয়ে পড়েছিলো ও; হোটেলের সামনে নিজের গাড়িটা গ্যারেজ করা ছিলো। গাড়িটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলো অনিমেষ, তারপর থেকেই এখানে এসে পৌঁছেছে ও; হোটেলে ভোরের আগেই ফিরতে হবে। হাত উলটে ঘড়ি দেখলো ও, সোয়া দুটো।টেনশনে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ওর; কাজটা কাঁচা হয়ে গেলো কী? কাল ভোরের আগে ফিরতে না পারলে ধরা পড়ার চান্স রয়ে যাচ্ছে না? গুমোট পরিবেশটা কাটাতে এফ এমটা চালিয়ে দিলো ও, জোড়ে বেজে উঠলো, "বালাম পিচকারী যো তুনে মুঝে মারি''! আর প্রায় সাথে সাথেই একটা জোড়ে ঝাঁকুনি হয়ে গাড়িটা থেমে গেলো রাস্তার মাঝখানেই। কী ব্যাপার? কপালে ভাঁজ পড়লো অনিমেষের; দু'তিনবার স্টার্ট দিয়েও কোনো রেসপন্স না পেয়ে গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলো ও। সাথে সাথেই জ্যাকেট, পুলওভার ফুঁড়ে শরীরের ভেতর অবধি কনকনে ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিলো ওকে। পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ আরেকটা গাড়িও নেই; চারপাশটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। গাড়ির বনেট খুলে কিছুক্ষণ 'খুটখাট' করলো ও, নাঃ! কিছুই করা যাচ্ছেনা; ইঞ্জিনও গরম হয়ে ওঠেনি। গাড়িটা যেন অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেছে, ওর মনে হলো গাড়িটা 'মারা' গেছে! বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিলোনা অনিমেষ; ওর শরীরটা কাঁপছিলো প্রচন্ড ঠান্ডায়। ও গাড়ির ভেতরে এসে বসে সিগারেট ধরালো আবার একটা; অসহ্য টেনশন বুকের ভেতরে যেন হাতুড়ি পিটছিলো। সারারাত কী তাহলে এই গাড়ির মধ্যে এইভাবে বসে থাকতে হবে? ওই ছিন্ন দুটো ধর আর মাথার সাথে!! চিন্তাটা মাথায় আসতেই শিউরে উঠলো অনিমেষ; আর প্রায় সাথে সাথেই সিগারেটের ধোঁয়ার জন্য খুলে রাখা জানলার কাচটা নিজে থেকেই ওপরে উঠে বন্ধ হয়ে গেলো, চমকে উঠলো ও। দ্রুত কাচ নামানোর 'প্রেশ' লকটা ধরে মোচড় দিলো, 'ঘটাং ঘটাং' শব্দ হল; কিন্তু কাচ একচুলও নামলোনা। প্রবল আতঙ্কে মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো অনিমেষের, দরজা খোলার জন্য পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো ও; জ্যাম হয়ে গেলো নাকি দরজাটা? সত্যিই দুদিকের দরজাই পুরোপুরি জ্যাম; খোলা যাচ্ছেনা! বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠলো অনিমেষের কপালে, ওর গলাটা ক্রমশই কাঠ হয়ে আসছিলো শুকিয়ে; সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিলো চোখের সামনে। হঠাৎ----লুকিং গ্লাসের ওপর চোখ পড়লো অনিমেষের; আর---সাথে সাথেই আপনা থেকেই একটা প্রবল ভয়ের আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো ওর মুখ থেকে! লুকিং গ্লাসে যেখানে ছোটা ভীমের সফট টয় ফিগার ঝোলে, সেখানে ওটা কী? মধুরিমার......মাথা!! ভুল দেখছে কী অনিমেষ? নাঃ; ওইতো! মধুরিমার মাথা---কাটা গলার নীচে থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে স্টিয়ারিং এর পাশে....আর চোখদুটো খোলা! হিংস্র আক্রোশে চোখদুটো চেয়ে আছে ওরই দিকে, মুখের চারপাশে সাপের ফণার মতো চুলগুলো উড়ছে ওর। অনিমেষ পাগলের মতো লকটা ঘোরাচ্ছিলো, ভয়ের এত কাছাকাছি ও কখনো আসেনি! হঠাৎ-----কাঁধের ওপর একটা স্পর্শে চমকে উঠলো ও, ধীরে ধীরে ঘাড়টা পেছনে ঘুরিয়েই যা দেখলো তাতে একমুহূর্তে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা বরফের কুচি গড়িয়ে পড়লো ওর। ব্যাকসীটে বসে আছে মধুরিমার ধরটা, গোলাপি রঙের সেই শাড়িটাই পড়ে আছে শরীরটা; মাথা নেই! ধরের ওপর শুধু একটা মাংসের পিন্ড, কারণ---মাথাটা এখন অনিমেষের সামনে ঝুলছে লুকিং গ্লাস থেকে। পাগলাটে ভয়ে অর্থহীন ভাষায় আর্তনাদ করলো ও; প্রবল ভয়ের চিৎকারটা বারবার বেড়িয়ে আসছিলো ওর মুখ থেকে! সহসা গাড়িটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্টার্ট হয়ে গেলো, এলোমেলো পাহাড়ি ল্যান্ডিং এ ছুটতে শুরু করলো। হতবাক অনিমেষ দেখলো, নিজে থেকেই স্পিডোমিটারের কাঁটা চড়চড় করে উঠে যাচ্ছে; ওর সামনে মধুরিমার মাথা, পেছনের সীটে শরীর----অনিমেষ ব্রেকটাতে সজোড়ে চাপ দিচ্ছিলো পা দিয়ে, কিন্তু ব্রেক কাজ করছিলোনা কোনো। হঠাৎই 'ঘড়ঘড়ঘড়' শব্দ হয়ে চালু হয়ে গেলো এফ এমটা; আর-----রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে নারীকন্ঠের হাসি ছড়িয়ে গেলো চারপাশে! মধুরিমা!! অনিমেষ পাগলের মতো স্টিয়ারিংটা ঘোরাচ্ছিলো, কিন্তু ও নিজেও বুঝতে পারছিলো গাড়ির কন্ট্রোল এখন অপার্থিব শক্তির হাতে।
"হি হি হি হি হি'' হাসির শব্দটা বাড়ছিলো, অনিমেষ কাঁধের ওপর সরু সরু নখের আঁচড় টের পাচ্ছিলো; আর---লুকিংগ্লাসের ঝোলানো মধুরিমার মুখের হাসিটা চওড়া হচ্ছিলো। গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছিলো গভীর খাদের দিকে, অনিমেষ পাগলের মতো চিৎকার করছিলো প্রবল ভয়ে; কিন্তু সেই চিৎকারটা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘা খেয়ে ফিরছিলো শুধু। কারণ----তখন রাস্তায় কেউ ছিলোনা।।

                ------------------------------

অমৃতা.....আবার!

দেখতে পাচ্ছো ঝড় উঠেছে?
মেঘের বর্ণে আজ আকাশ লালচে,
আকাশে কীসের শব্দ?
কোদালে কুড়ুলে মাটি কোপানোর মতো মেঘে
খনা কবে বলেছিলো বৃষ্টি আসবে।
আমার কলকাতায় বৃষ্টি এখন
নরম গালচে মাটি সোঁদা সোঁদা ঘ্রাণ,
তুমি তো জানো কবি ও গন্ধ কবিদের নয়
স্ট্রেপটোমাইসেটিসের শরীরের ঘামের গন্ধ- মিথাইল!
আমি তো এসব কিছুই দেখিনা,
কোনো গন্ধ, কোনো আস্বাদ ছোঁয়না আমাকে প্রকৃতির;
বৃষ্টি-ঝড়-বজ্রপাত আড়াল করেছো তো দীর্ঘছায়ায়
তুমিই বৃষ্টি হও, কখনো রোদ্দুর হয়ে গাছের পাতায়
তুমিই আগুন হয়ে জ্বলে ওঠো যৌবনের সন্ধিক্ষণে
তুমিই..... আমার চোখের থেকে পৃথিবীকে আড়াল করেছো।
আকাশে কীসের শব্দ? সে শব্দ করেছো আচ্ছাদন
আমি তো শতাব্দীকাল প্রকৃতিকে চিনবো বলে
নতজানু হয়ে আছি; এখনো যেমন!
ফুল দেখিনি, আকাশ দেখিনি, জল-বৃষ্টি- সমুদ্র অজানা
তুমি তো এ সবকিছু আড়াল করেছো অমৃতা।
সহস্রকাল ধরে তোমাকে দেখাই শেষ হলোনা আমার,
পৃথিবীকে দেখবো কবে? শতাব্দী পরাধীন; তোমার চোখের তারা- আয়নার মতো ছায়া আমি আর গাঢ় মহাকাল।।

Tuesday, 1 August 2017

টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার

(আটবছরের এক শিশুর অকালপ্রয়াণে লেখা)

ছড়ার বইতে পড়েছিলে, সন্ধান কী পেলে তার?
চলেই গেলে সেই যেখানে, টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার!
রইলো পড়ে ড্রয়িং খাতা, রইলো পড়ে স্কুলের বই
মায়ের ওপর খুব অভিমান, সেই সেখানে ঠিক যাবোই!
আর কিছুদিন থাকার ছিলো, খেলনা নদী ঘুম পাহাড়;
এসব ছেড়ে চলেই গেলে, সেই যেখানে লিটল স্টার!
অনেক কিছুই হওয়ার ছিলো, সুপারম্যান বা অন্যকিছু
ঘর পালিয়ে কোথায় গেলে, স্বপ্নও গেলো পিছু পিছু!
বড় হতে বয়েই গেছে, ছোট্ট হয়েই বিদায় তার;
ছড়ার বইতে পড়তে যেমন; নিজেই হলে লিটল স্টার।।

Sunday, 30 July 2017

অমৃতার জন্য....ক্ষণেক অবসর

কবিতা ১/

এতদিনে চাইলে হঠাৎ,
ভ্রু পল্লবে মিশে ছিলো ক্ষণিক কৌতুক-
যখন তোমার জন্য নিঃসঙ্গ নাবিকের মতো সমুদ্রে ভেসেছি একা সারারাত
কোনো শুকতারা পথ দেখায়নি আমায়;
তখনো তুমি চাওনি একবারও
মাঠের ফসল মরে গেছে,
বসন্ত মিশে গেছে মৃত্যুর মতো শীতরাতে-
লাশকাটা ঘরে যেই নীল আলো একা একা জ্বলে,
তারমতো মৃতচিহ্নে শুয়ে শতাব্দী কাটিয়েছি একা একা,
এতদিনে চাইলে হঠাৎ
ভ্রু পল্লবে মিশে ছিলো ক্ষণিক কৌতুক।
আমি কীকরে এতো লোভহীন হলাম? অজস্র মানুষের মাঝে
স্বাভাবিক মুখে শুনলাম তোমার বিজয়ের কথা,
আমার ব্যর্থতা টুকু ঢাকলাম কবিতার আঁচে
তোমার দিকে চেয়েছিলাম একবার লোভহীন শীতের মতো চোখে-
এতদিনে চাইলে হঠাৎ
ভ্রু পল্লবে মিশে ছিলো ক্ষণিক কৌতুক।
তারপর সারারাত অপদার্থের মতো জ্বলে গেছি তোমার ও চোখে,
যে চাহনি বলে দেয় কৌতুক- নিভৃত শ্মশানের শিবাদের কথা!
এতো লোভহীন আমি হলাম কীকরে অমৃতা?
জনমানুষের ভীড়ে তোমার জয়ের কথা শুনতে শুনতে হাততালি দিয়েছি আমিও,
ফুল আর ফসলের মরে যাওয়া সময়ে হঠাৎ
ভ্রু পল্লবে মিশে গেলো ক্ষণিক কৌতুক!
অমৃতা, এতো লোভহীন চোখ কীকরে পেলাম??
                                                   

কবিতা ২/

আমাকে তুমি ডেকেছিলে একদিন
পাগল করা ব্যথার দিনে আমার;
জানলা ছুঁয়ে ভোরের আলোর কণা
ডেকেছিলে সেই প্রথমকৈশোরে।
শৈশব গিয়ে কৈশোর ছুঁই ছুঁই
সকাল বেলার আলোয় তারই দাগ,
হঠাৎ তুমি ডাকলে আমায় কেন?
নীরব চোখের চাপল্যতা দিয়ে!
পেষ্টহীন দুটো ভোরের বেলার ঠোঁট
দুলবিহীন উন্মুক্ত কান,
রুক্ষচুলে সকাল বেলার রোদ
যেমন শুধু মেয়েবেলাতেই মানায়।
আমাকে তুমি ডেকেছিলে একদিন-
অজস্রকাল ভোর এসেছে তারপর
যদিও সেদিন রোদ্দুরে সোনা ছিলো
যেমন শুধু ছেলেবেলাতেই মানায়।
আমবাগানে সহস্র দিন আরো
ঘুরেছি ফের বেগুনি নীল ফড়িং,
তুমি কিংবা তোমার মেয়ের দল
তোমরা আর আসোনি তারপরে।
সহস্রকাল ভোর এসেছে এমন,
গাছের পাতায় রোদ্দুর লুকোচুরি
সোনা গলে ঝরতে দেখিনি তো!
যেমন শুধু ছেলেবেলাতেই মানায়।
মস্ত বড় পুকুর কালো জল
তোমার ছায়া লুটোয় সেখানেতে
যৌবনের অমৃতা নয় সে মেয়ে,
আমার মনে মেয়েবেলার তুমি।
চপলতার ফাঁকে হঠাৎ দেখা
চোখের কোণে আলোর ঝিলিক নাকি?
দুচোখ তোমার রোদ্দুরের কণা
যেমন শুধু মেয়েবেলাতেই মানায়।
সে আমবাগান আজ অস্তিত্বও নেই,
শেষ প্রমাণটা রিয়েল এস্টেটই নিলো
শৈশব তবে স্বপ্নই শুধু তবে?
কী জানি; হয়তো কূহক মায়াই হবে।
আমাকে তুমি ডেকেছিলে একদিন-
সেই আমবাগান আজ হারিয়ে দুঃখ হয়,
সবকিছু নিয়ে সেটুকুও মুছে গেছে;
যে বাগান শুধু শৈশবেতেই মানায়।।
                                    

কবিতা ৩/

সুনীল, তুমি অমৃতার মুখোমুখি হয়োনা অমন
আমি সহ্য করতে পারিনা!
সুনীল....তুমি প্রেমিক হলে কীকরে?
তোমার পোশাক ফিটফাট,
শার্টের সবকটা বোতামের ঘর আছে;
চেহারায় আভিজাত্য,
গলায় আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া!
তুমি প্রেমিক নও,
প্রেমিকের গলায় এ বিশ্বাস থাকেনা এমন;
তোমার বিশ্বাস শুধু তোমার আভিজাত্যে
অর্থে, চেহারায়।
সুনীল, তুমি প্রেমিক হলে কীকরে?
তুমি সুমন শোনোনা,
কবিতা পড়োনা,
সংস্কৃতির বোধে পাশ্চাত্যের ছাইপাঁশ;
কালো কোট গোলাপের তোড়া
হাঁটু গেড়ে বিদেশী ভঙ্গিতে প্রেম দান
অমৃতার চোখে মুখে তোমার বীরত্বে বিস্ময়!
সুনীল তুমি প্রেমিক হতে পারোনা!
তোমার রক্তে আছে ক্ষণিকের মোহ আর কাম
ওভাবে হাত ধরে হাঁটছো দুজনে ফুটপাথে
আমার হিংসে হয় খুব।
আমার পোশাক তো আজও শুধু পাঞ্জাবী জিন্স,
এখনো ফিটফাট হওয়া হলোনা;
স্পাইক করতে শিখলামনা চুলে
বয়স বেশিই লাগে এলোমেলো দাড়ি আর
চোখের পুরু ফ্রেম চশমা।
আমার চুল এখনো এলোমেলো,
আমি এখনো সুমনই শুনি;
আমি বোধহয় পুরুষ নই
প্রেমিক বলা চলে।
বিশ্বাস করো সুনীল,
অমৃতাকে আমি খুঁজি
ডিলানের গানে,
সুমনের ঝঙ্কারে,
কবিতার অবোধ্যতায়
আর সিগারেট তিনপেগ মদে।
বিদেশী ভঙ্গি নিয়ে
এনরিকিউয়ের গান ঠোঁটে গেয়ে গেয়ে,
তোমার মতোন আমি কালো কোটে
গোলাপের তোড়া হাতে হাঁটুগেড়ে
প্রেম নিবেদনে অক্ষম।
সুনীল, তোমার ছায়া অমৃতার পেছনে হঠাৎ
কলমের তীর আমি লক্ষ্য স্থির করি তোমার বুকের;
অমৃতা বলে ওঠে, "মা নিষাদ, ওকে আমি ভালবাসি!''
কলম নামিয়ে রাখি, তোমরা দুজন হেঁটে যাও পাশাপাশি,
সুনীল; তুমি প্রেমিক হলে কীকরে??

                 ------------------------------

Monday, 24 July 2017

নতুন বছর; আর....

আজ সন্ধ্যা নামছে বড্ড তাড়াতাড়ি,
সুর্য ডুবছে ভিক্টোরিয়া'র মাথায়
দহন বাতাসে চোখে মুখে ধূলো বালি
কেউ ফুটপাত ধরে একলা ফিরছে বাড়ি।
দূরে ধানক্ষেতে উষ্ণ বাতাস খেলে
বৃষ্টি আসবে অপেক্ষাতে চাষা;
চন্দন বনে একবার যদি আসো
সার্থক হবে আমার বাংলা ভাষা।
এই বছরটা বড় একঘেয়ে গেলো,
যদিও আলতো স্মৃতি বড় দূঃসহ;
শেষ কথা হলো এ'বছর জৈষ্টিতে
সেই স্মৃতি আজ আলপথে এলোমেলো।
বছর আসবে যাবে এতে কার কিইবা হবে?
সময়ের হিসেব এছাড়া কিছু তো নয়;
আর কোনো দিনই ফিরবেনা তুমি জানো
বছর বছর অপেক্ষা হবে ক্ষয়।
তুমি সুখি জানি সুখের অসুখ হয়ে
আমি পড়ে আছি অপদার্থের দলে
জানুয়ারির প্রথম দিনটা মানো,
আমার হৃদয় 'বাংলায় কথা বলে।।

Wednesday, 19 July 2017

প্রেতচক্র

"দিদিমণির শরীর খারাপ দাদাবাবু!''
"কি হয়েছে মানদামাসি?'' কথাটা বলে ভ্রু কুঁচকে লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরালো মল্লার। বুড়ি মানদা মুখ গোমড়া করে বললো, "জানিনা; আপনি বুঝতে পারেননা দাদাবাবু? দিন দিন দিদিমণি আমার শুকিয়ে যাচ্চে কেমন যেন....আপনাদের রোজ রোজ এই পিচাশ নিয়ে টানাটানি আমার মোটে পছন্দ হয়না দাদাবাবু!'' মল্লার সিগারেটে টান দিয়ে অধৈর্য স্বরে বললো, "আহ! মানদামাসি; ওসব তোমার পিচাশ টিচাশ নয়, এটা জাস্ট প্ল্যানচেট। একটা ক্যাজুয়াল ব্যাপার!'' মানদা দুদিকে মাথা নেড়ে বললো, "না দাদাবাবু, সে তুমি যাই বলো; এসব মোটেও ভালো জিনিষ নয়। আমাদের গাঁয়ের শশী মন্ডলের মা নিস্তারিণীর অমাবস্যেয় এরম পিচাশের ভর হতো; রোজ রোজ এরকম ভর হয়ে দিদিমণি দিনদিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে।'' মল্লার সোফায় বসে পড়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, "হ্যাঁ-হ, এটা অবশ্য তুমি ভুল বলোনি। প্ল্যানচেটের সময় মিডিয়ামের ওপর ভীষণ চাপ পড়ে,তার জন্যই কমলিকা ভীষণ টায়ার্ড হয়ে পড়েছে। আচ্ছা, আজকের পরে অন্তত ওয়ান উইক আমরা আর চক্রে বসবোনা; প্রমিস ইট।'' মানদা মুখ গোমড়া করে বললো, "ওঃ; তাহলে আজও বসবে? যা খুশি করো গে।'' এইসময় দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলো কমলিকা; ওর চুলগুলো অযত্নে খোলা, চোখের নীচে কালি পড়ে গিয়েছে যেন, ওকে খুব বিধ্বস্ত আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। মল্লার সোফা ছেড়ে উঠে ছুটে গিয়ে ওর হাতটা ধরলো, উদ্বিগ্ন গলায় বললো, "কমলিকা; একী? কি হয়েছে তোমার? এতো টায়ার্ড লাগছে কেন তোমায়!!'' কমলিকা হাত দিয়ে কপালের ওপরের এলোমেলো চুলের গোছাটা সরিয়ে ক্লান্ত গলায় বললো, "কিছু নয় সোনা....আমি ঠিক আছি!'' মল্লার ওর গালে একটা একটা আলতো চুমু খেয়ে ওকে সোফায় ধরে ধরে বসাতে বসাতে বললো, "না কমলিকা; তুমি ঠিক নেই! বলো কী হয়েছে?'' মানদা মল্লারের দিকে একবার বিরক্তভঙ্গিতে চেয়ে কোমরে শাড়ির আঁচলটা গুঁজতে গুঁজতে কিচেনে ঢুকে গেলো। মল্লার কমলিকার পিঠে হাত বুলিয়ে বললো, "বলো সোনা, কী হয়েছে বলো? তুমি কি টায়ার্ড?'' কমলিকা নীচের দিকে চেয়ে আস্তে আস্তে বললো, "হ্যাঁ মল্লার....মিডিয়াম হতে হতে আমি....টায়ার্ড! আমি আর পারছিনা নিজের ওপর এই প্রেশারটা সহ্য নিতে; এখন মাঝে মাঝে মনে হয় এই জীবনটা কার্সড হয়ে গিয়েছে আমার......অভিশপ্ত!! আমি মুক্তি চাই মল্লার, মুক্তি চাই!'' মল্লার ওর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতেই বললো, "আমি তো তোমাকে কথা দিয়েছি কমলিকা; নেক্সট ডিসেম্বরে আমাদের বিয়ের পর আমরা আর কোনোদিন চক্রে বসবোনা! সবাই জানে; এই সাউথ কলকাতার মধ্যে তোমার মতো সাক্সেসফুল মিডিয়াম আর নেই....।'' কমলিকা দু'দিকে মাথা নেড়ে অধৈর্য গলায় বললো, "কিন্তু তুমি জাস্ট একজন স্পিরিচুয়ালিস্ট মল্লার; কোনোদিনও মিডিয়াম তোমাকে হতে হয়নি! তাই....তুমি অনেক কিছু জানোনা মিডিয়ামের জীবন সম্পর্কে; আমার সবসময় মনে হয় ওইসব মৃত আত্মারা আমাকে ঘিরে থাকে, যাদের আমরা চক্রে নামিয়েছিলাম....!'' মল্লার ওর মাথার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললো, "পরপর তিনদিন মিডিয়াম হয়ে তুমি ভীষণ টায়ার্ড হয়ে পড়েছো কমলিকা....তাই তোমার এরকম ইল্যুশন হচ্ছে। আচ্ছা; আমি প্রমিস করছি...তোমাকে এখন একমাস আর বসতে হবেনা।'' কমলিকা এবার চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে, মল্লার অবাক হয়ে দেখলো কমলিকার বড়বড় চোখদুটো জলে ছলছল করছে; ও বললো, "মল্লার....আমি আর সহ্য করতে পারছিনা! তুমি আমাকে বাঁচাও মল্লার.....এই জীবনটা থেকে মুক্তি দাও!'' বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো ও, মল্লার ওকে জড়িয়ে ধরে পিঠে, চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, "কিচ্ছু হবেনা তোমার সোনা....কিচ্ছু হবেনা! এইতো আমি আছি তোমার পাশে.....লাভ য়্যু সোনা! আজকের পর তোমাকে আর কোনোদিনও চক্রে বসতে হবেনা, আই প্রমিস ইট।'' সাথে সাথে ছিটকে সরে গেলো কমলিকা, জলভরা চোখে মল্লারের দিকে চেয়ে বললো, "আজ!!'' মল্লার নরম গলায় বললো, "হ্যাঁ, তোমার মনে নেই? মিসেস.হাজরা; রেবা হাজরা।'' সঙ্গে সঙ্গে কমলিকার মুখে একটা ভয়ের ছায়া নেমে এলো যেন, শুকনো ঠোঁটদুটো ফাঁক করে বললো, "মিসেস.হাজরা!! তাইতো! মল্লার....একটা কথা বলি...!'' কমলিকা ফিসফিস করে বললো, "আমার.....মিসেস হাজরাকে ভয় করে!!''
"কমলিকা!'' মল্লার মৃদু ধমকের সুরে চেঁচিয়ে উঠলো, ওর ভ্রু কুঁচকে গেছে; চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। কমলিকা মাথা নেড়ে বললো, "জানি মল্লার...। তুমি অবাক হবে, বিরক্ত হবে আমার ওপর! কারণ আফটার অল উনি একজন মা.....!''
"এগজ্যাক্টলি!'' অধৈর্য ফুটে বেড়োচ্ছিলো মল্লারের গলায়, "উনি একজন মা কমলিকা! একজন মা নিজের তিনবছর বয়সের মৃতা মেয়ের আত্মাকে দেখতে আসেন তোমার কাছে.....তুমি একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মহিলার ব্যাপারে এরকম কথা বলছো কী করে? তুমি দ্যাখোনি? উনি কীভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন....!'' কমলিকা বললো, "জানি মল্লার....। কিন্তু আমি ওঁকে ভয় পাই; কী ভয়ংকর দেখতে ওঁকে....মাগো! মিসেস হাজরার হাতদুটো তুমি লক্ষ্য করেছো মল্লার? বলিষ্ঠ, পেশীবহুল.....ঠিক অতিকায় কোনো পুরুষের মতোন...উউফ!'' মল্লার এবার গলার স্বর নরম করে বললো, "তুমি খুব টায়ার্ড সোনা, তুমি প্লিজ একটু রেস্ট নাও....মিসেস হাজরার আসতে এখনো আধঘন্টা মতোন দেরী আছে।'' কমলিকা ওর কথাটা শুনতে পায়নি এমন ভঙ্গিতে বলে চললো, "তুমি জানোনা মল্লার, পৃথিবীতে আদিম কিছু শক্তি আছে....। যে শক্তি গুলোর কাছে কোনো শক্তিই পেরে ওঠেনা! সেরকম একটা শক্তিই 'মা'!  আমি 'মা' শব্দটাকে খুউব ভয় পাচ্ছি মল্লার; জানিনা কেন আমার মনে হচ্ছে মিসেস হাজরা খুব বড় কোনো সর্বনাশের দিকে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। তুমি বলছিলে না, আগের দিন নাকি দেহধারণ খুব স্পষ্ট হয়েছিলো?'' মল্লার দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মাথা নেড়ে বললো, "হুম! প্রথমদিন শুধু গলাটা শোনা গিয়েছিলো ওঁর বাচ্চার, কিন্তু সেকেন্ড দিন আই মিন আগের দিন ঝাপসা অবয়ব দেখা যাচ্ছিলো পর্দার এপাশে।'' কমলিকা শুকনো গলায় বললো, "আসলে চক্রের সময় কী হয়.....সেসব তো আমি জানতে পারিনা!'' মল্লার ম্লান হেসে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বললো, "সোনা যাও, মিনিট কুড়ি রেস্ট নিয়ে নাও....! তুমি ভীষণ টায়ার্ড।'' কমলিকা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অল্প একটু হেসে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেলো। মল্লার সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালো, মোবাইলের ইয়ারপিস কানে গুঁজে এফ.এম.টা চালিয়ে দিলো ও,
"সুনা সুনা লামহা লামহা, মেরী আঁহে ত্যনহা ত্যনহা, আ কার মুঝে তুম থাম লো...''
শ্রেয়া ঘোষালের গলায় গানটা শুনতে শুনতে চোখদুটো বুজে এলো ওর, চোখবুজে সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছিলো; এই গানটার মধ্যে একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নভাব আছে, মল্লার সেটা টের পায় যখনই শোনে। গানটা শেষ হয়ে আর.জে. নীলের আবেদনময়ী কন্ঠ শোনা যেতেই কলিংবেলটা বেজে উঠলো; মল্লার ইয়ারপিসটা কান থেকে খুলতে খুলতে চেঁচিয়ে ডাকলো, "মানদামাসি, মানদামাসি! দ্যাখো কে এলো।'' মানদা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উত্তর দিলো, "আমি ভাতের ফ্যান গালছি দাদাবাবু, আপনি একটু দ্যাখেন।'' জিভ দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক 'ছিক' 'ছিক' শব্দ করে মল্লার সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুললো, মিসেস হাজরা! মল্লার একমুহূর্তের জন্য চমকে উঠেছিলো, ও মুখে কমলিকাকে যাই বলুক না কেন; নিজেও জানে এই মহিলাকে দেখলে হঠাৎ করে গা ছমছম করে ওঠে। ভদ্রমহিলার মঙ্গোলীয়দের মতো মাজা পিতলের মতোন গায়ের রঙ; একটা ভায়োলেট কালারের শাড়ি আর কালো স্লিভলেস ব্লাউজ পরণে, মিসেস.হাজরা বেশ মোটা, পুরুষদের মতো বলিষ্ঠ চেহারা, গালে বসন্তের দাগ, ঠোঁটের ওপর অল্প গোঁফের মতোন লোম। পুরু তামাটে ঠোঁট আর গোলগোল দুটো চোখ দেখলে হঠাৎ করে শিউরে উঠতে হয়। মাথায় বয়কাট চুলে বার্গান্ডির ছোঁয়া; চোখে বড়মাপের গোগো গ্লাস, কপালে বড় কালো টিপ। কপালে সিঁদুরের ছোঁয়াও নেই, মিসেস হাজরা আটমাস হলো ডিভোর্সি; আর ডিভোর্সের পর থেকেই ওঁকে আরো বেশী করে তিনবছর বয়সে মৃত মেয়ের স্মৃতিগুলো জড়িয়ে ধরেছে, বোধহয় কিছুটা সাইকোও হয়ে পড়েছে। মিসেস হাজরা এই সিঁয়াস বা চক্রের মাধ্যমে নিজের মেয়ের আত্মাকে ডেকে আনেন পৃথিবীতে, আর সেজন্য উনি সাহায্য নেন স্পিরিচুয়ালিস্ট মল্লার বোস আর ওর প্রেমিকা মিডিয়াম কমলিকা সেনগুপ্তর। মিসেস হাজরা চোখের গ্লাসটা খুলে বললেন, "কী মি.বোস? আজ বসবেন তো?'' একটু ইতস্তত করে মল্লার বললো, "হ্যাঁ-হ; আপনি প্লিজ ভেতরে আসুন।'' মহিলা পায়ের হাইহিল শু পায়ে পড়েই ভেতরে ঢুকে সোফায় বসে পড়লেন; হাতের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা লেডিজ রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছলেন আলতো করে। মল্লারের কেন জানেনা; আজ হঠাৎ মহিলাকে দেখে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে, কমলিকার কথাটা শুনেই কী? বোধহয় তাই; ভুলভাল চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে আবার একটা সিগারেট ধরালো ও, মল্লার দিনদিন বড় বেশী চেন স্মোকার হয়ে পড়ছে, দিনে চব্বিশ পঁচিশটা সিগারেট হয়ে যায় একেকদিন। সিগারেটে একটা লম্বাটে টান দিয়েই ও দেখলো, মিডিয়ামের পোশাক পড়ে বেড়িয়ে এসেছে কমলিকা। সুপার ন্যাচারাল ক্যায়রিং এই ড্রেসটা অদ্ভুত দেখতে, মিডিয়াম হওয়ার সময়েই এই পোশাকটা ইউজ করতে হয়। গলা থেকে হাঁটু অবধী স্লিভলেস সাদা স্কিনটাইট পোশাক, অনেকটা সার্কাসের মেয়েরা যেরকম পড়ে। খোলা চুলের ঢলের মাঝে কমলিকার ছোট্ট মুখটা কেমন নিরাপত্তাহীন ভিতু দেখাচ্ছিলো; ও ক্লান্ত গলায় বললো, "আসুন মিসেস হাজরা, সিঁয়াসে বসা যাক।'' রেবা হাজরা ঠোঁটের ফাঁকে একটা অদ্ভুত গা ছমছমে হাসি হেসে বললেন, "আসুন।'' হঠাৎ---কী এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠলো মল্লারের, ও আতঙ্কের গলায় বললো, "কমলিকা.....আজ থাক! তুমি ঠিক নেই..।'' রেবা হাজরা ওঁর পুরুষালি গলায় চাপা হুঙ্কারের মতো বললেন, "মি. বোস; আপনারা আমাকে কথা দিয়েছিলেন!'' কমলিকা কাঠ কাঠ হেসে বললো, "আপনি চিন্তা করবেননা মিসেস হাজরা, আপনার সিয়াঁস হবে...আজই! আর তাছাড়া...'' মল্লারের দিকে চেয়ে ম্লান হেসে বললো ও, "...আজই তো আমার শেষ সিয়াঁস। ভগবানকে ডাকি, আর এই সিয়াঁসে আমাকে যেন না বসতে হয়। তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছো মল্লার...।'' মল্লারের বুকের মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি পিটছিলো; একটা বীভৎস আশঙ্কা ওর গলা চেপে ধরছিলো যেন।
"কী হলো মি. বোস? আসুন!''
মিসেস হাজরার ডাকে সম্বিত ফিরলো মল্লারের, "হ্যাঁ-হ; চলুন।'' সিয়াঁসের ঘরটা অদ্ভুত, একটা আলতো নীল বাল্ব ছাড়া আর কোনো আলো নেই ঘরটায়, তাই এই সন্ধে সাতটার সময়েই ঘরে ঢুকে একটা অদ্ভুত গা ছমছমে অনুভূতি হয়; দৈর্ঘ্যে ছোট প্রস্থে বড় ঘরটার মাঝবরাবর একটা কাঠের টেবিল আর দুদিকে দুটো চেয়ার রাখা আছে। তবে ডানদিকের চেয়ারটা আর টেবিলটার মাঝে ওপর থেকে একটা বড় আর ভারী কালো পর্দা টাঙানো, এই পর্দার পেছনেই চেয়ার পেতে বসবে মিডিয়াম কমলিকা, আর পর্দার এপ্রান্তে চেয়ারে ক্লায়েন্ট অর্থাৎ আজকের রেবা হাজরা। আর দরজার উল্টোদিকে দেওয়াল ঘেঁষে আরেকটা চেয়ার রাখা আছে হাতলভাঙা, এখানে বসে থাকে মল্লার বোস। নীল আলোটা জ্বেলে দিয়ে লাইটার দিয়ে টেবিলে মোমবাতি জ্বালাচ্ছিলো মল্লার, পাশে দাঁড়িয়ে কমলিকা।
"মি.বোস!'' হঠাৎ চাপা গর্জনের মতো বললেন রেবা হাজরা, "আপনি যে কোনো সিল্যুয়েটের এফেক্ট সেট করেননি ওই কালো পর্দাটায়, তার কী প্রমাণ আছে?''
"মিসেস হাজরা!!'' গলা চড়ে গেলো মল্লারের; পানপরাগের ছোপ পড়া দাঁত বের করে হেসে রেবা বললেন, "উঁহুহু; উত্তেজিত হচ্ছেন কেন? ভয় করছে নাকি?'' মল্লারের মুখটা রাগে অপমানে লাল হয়ে উঠলো, ও চিৎকার করে বললো, "ইউ আর ক্রস ইওর লিমিট মিসেস হাজরা; জাস্ট গেট আউট!!'' কমলিকা ভ্রু কুঁচকে দেখছিলো মহিলাকে, ওর মনে হচ্ছিলো রেবা হাজরা নয়; ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোনো পিশাচীমূর্তি। রেবা মল্লারের কাঁধ ছুঁয়ে বললেন, "আহাহা, রাগ করছেন কেন ভাই? যদি সত্যিই পাবলিককে ব্লাফ না দেন; চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিননা আমি যা বলছি!'' মল্লারের ঠোঁটের কোণায় হাসি খেলে গেলো একচিলতে, অবজ্ঞার ভঙ্গিতে বলল, "বেশ; আমি রাজি। বলুন, কী প্রুভ চান আপনি?'' কমলিকার বুকটা ধুকপুক করছিলো হাপরের মতো, কোন চাল চালছে এই পিশাচিনী? মল্লার কী দেখছেনা ওর কুতকুতে দুটো চোখ কেমন ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে? পানপরাগের ছোপ দাঁতে পৈশাচিক হাসি? বা দানবের মতো দুটো হাত, একটা ঘড়িও নেই রিস্টে! রেবা হাজরা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একগাছা সরু অথচ শক্ত নাইলনের দড়ি বের করলেন, "এই যে মিস্টার বোস; ওই চেয়ারটায় আপনাকে বেঁধে রাখবো...যতক্ষণ সিয়াঁস চলবে।'' মল্লারের মুখে একমুহূর্তের জন্য অপমানের একটা কালোছায়া পড়েই মিলিয়ে গেলো; দাঁতে দাঁত চেপে বললো, "ডান, আমি রাজি।''
"মল্লার নাঃ! খবর্দার!! তুমি এই মহিলার কথা শুনবেনা...'' কমলিকা চেঁচিয়ে উঠলো, মল্লার ভ্রু কুঁচকে বললো, "কী বলছো কমলিকা? উনি আমাদের ফ্রড বলছেন; জোচ্চোর বলছেন....!'' কমলিকা উত্তেজিত গলায় বললো, "বলুন! কিন্তু তুমি ওঁর কথা শুনবেনা মল্লার! প্লিজ...!'' লালচে দাঁতগুলো বের করে 'খ্যা খ্যা' করে হেসে রেবা বীভৎস বিদ্রুপের সুরে বললেন, "এহেহে দেখুন মিস দাশগুপ্ত; ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? মনে হচ্ছে যেন...!'' মল্লার হাত মুঠো করে তালুতে দু'বার ঘুষি মেরে বললো, "ডোন্ট জোক মিসেস হাজরা; আপনি কিন্তু আমাদের অপমান করছেন....! আমি রাজি আছি; আসুন!'' রেবা হাজরা যেন এই কথাটার জন্যই ওয়েট করছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বললেন, "আপনি তাহলে চেয়ারটায় বসে পড়ুন।'' মল্লারের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিলো; ও গিয়ে বসলো চেয়ারে। মিসেস হাজরা নাইলন দড়ি দিয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে দিলেন ওর হাতদুটো; কমলিকা যেন কিছুটা বিহ্বল হয়ে পড়ছিলো, মল্লার উত্তেজিত গলায় বললো, "কমলিকা, সিট ডাউন! প্লিজ স্টার্ট দ্য সিয়াঁসে.....প্লিজ।'' কমলিকা কিছুটা হতভম্ব ভাবেই লাইটটা নিভিয়ে পর্দাটা সরিয়ে গিয়ে বসলো চেয়ারে; দৃঢ় গলায় বললো, "মিসেস হাজরা, আপনার মেয়ের ফোটোটা বের করুন।''
"হ্যাঁ, নিশ্চয়ই!'' ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হাতড়ে হাতড়ে একটা ছোট্ট পোস্টকার্ড সাইজের ফটো বের করে টেবিলে রাখলেন রেবা হাজরা; মোমবাতির আলোয় দেখা যাচ্ছিলো একটা বছর চারেকের বাচ্চা মেয়ের ছবি, সোনালি রঙের স্লিভলেস ফ্রক পরা, মাথায় ছোট্ট দুটো পনিটেল, ফরসা গোলগাল বাচ্চা মেয়েটা একটা বাগানের ভেতর ব্যাডমিন্টন ব্যাট হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে, রোদে চোখ কোঁচকানো। কমলিকা টানা টানা গলায় বললো, "এবারে কনসেন্ট্রেট করুন মিসেস হাজরা, ফোটোর দিকে চেয়ে একমনে আপনার মেয়ের কথা ভাবুন; চুল.....চোখ....নাক...ঠোঁট....ড্রেস...ও কী খাবার লাইক করতো....কী বলতো....এমনকি গলার তিলটাও....!'' মহিলা ফটোর দিকে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টে; এই দুপুরবেলায় মনে হচ্ছে মধ্যরাত এই ঘরটায়, মোম গলছে টেবিলে, শুধু তিনটে মানুষের নিঃশ্বাসের গাঢ় শব্দ। মল্লারের বুকের মধ্যে একটানা হাতুড়ি পিটছিলো কেউ; ওর অস্বস্তি ভাবটা কাটছিলোনা কিছুতেই, হাতে নাইলনের দড়ি কেটে বসছিলো। হঠাৎ---সব শব্দ যেন বন্ধ হয়ে গেলো একনিমেষে; মোমবাতিটা একফোঁটা হাওয়া ছাড়াই দপ করে নিভে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে অমানুষিক অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা চেপে বসলো, দমবন্ধ হয়ে আসছিলো মল্লারের। সহসা......একটা আলতো মৃদু ডাক শোনা গেলো শিশুকন্ঠে, "ম..মা!'' চমকে উঠলো মল্লার; অন্ধকার ঘরে যেটুকু ঝাপসা আলো ছিলো তাতেই দেখা গেলো কালো মোটা পর্দার ওপরে একটা আবছা অবয়ব, একটা বাচ্চা মেয়ের সিল্যুয়েট ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছিলো; আর ওর গা থেকে ফসফরাসের মত একটা আলো বেড়োচ্ছিলো ঝাপসা।
"মা...!'' আবার একবার ডাক, সাথে সাথে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠলেন রেবা হাজরা, "মিঠি....সোনা!''
"মা...!''
মহিলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ আর কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, "মিঠি....সোনা আমার কোলে আয়!'' মল্লার আঁতকে উঠে বললো, "খবর্দার মিসেস হাজরা....সংযত হোন আপনি! স্পিরিটকে টাচ করবেননা!'' মিসেস হাজরা ওকে পাত্তা না দিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়লেন অবয়বটার ওপরে, কালো পর্দার পেছনে রক্তজল করা আর্তনাদ করে উঠলো কমলিকা; মল্লার চেয়ারে বসে ছটফট করে উঠলো, ভাঙাচোরা গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, "দোহাই মিসেস হাজরা....মিডিয়ামের সর্বনাশ হয়ে যাবে, এরকম করবেননা! প্লিজ!!''
"আমি বসে আছি আপনার মিডিয়ামের কথা ভাবতে!'' হিসহিসে সাপের মতো গলায় বললেন রেবা হাজরা। আত্মার শরীরটাকে কোলে তুলে নিলেন উনি; "মা...!'' আরেকবার ডেকে উঠলো বাচ্চাটা, রেবা হাজরা পাগলের মতো কোলে তুলে নিয়ে বাইরে ছুটলেন দরজা ঠেলে; মল্লার পাগলের মতো হাতদুটো নাড়াচ্ছিলো, কিন্তু দড়িগুলো আরো চেপে বসছিলো। পর্দার পেছনে হিস্টিরিয়া রোগীর মতো একটানা রক্তজল করা গোঙানোর মতো আর্তনাদ করে যাচ্ছিলো কমলিকা, মল্লার পাগলের মতোন চিৎকার করে উঠলো ভাঙা গলায়, "মানদামাসি...! মা-ন-দা-মা-সি!! তাড়াতাড়ি এসো মাসি...তাড়াতাড়ি!!'' শেষের কথাগুলোর সময় কান্নায় ভেঙেচুরে গেলো ওর গলাটা, খুব অসহায় দেখাচ্ছিলো ওকে।
"দাদাবাবু....একী?'' ঘরে ছুটে ঢুকে এসেছে মানদা; লাইটটা জ্বেলে দিয়েছে সুইচটা দিয়ে। মল্লার কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বললো, "মাসি...তাড়াতাড়ি ওকে বাঁচাও মাসি; বাঁচাও!!'' কমলিকা শেষবারের মতোন একবার মরণযন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে থেমে গেলো, 'ঘটাং' করে চেয়ার ওলটানোর শব্দ।  মানদা ছুটে গিয়েই চেঁচিয়ে উঠলো, "ওমাগো....রক্ত!'' কালো পর্দার নীচে দিয়ে ঘনকালো রক্তের স্রোত গড়িয়ে বেড়িয়ে আসছে এদিকে; বন্ধ ঘরে তাজা রক্তের আঁশটে গন্ধ পাক খাচ্ছে। কালো পর্দাটা সরিয়েই বিকট গলায় আর্তনাদ করে উঠলো মানদা, মল্লার চিৎকার করে উঠলো, "কি হলো মানদামাসি? বলো!! কি হলো!!'' মানদার মুখ দিয়ে কথা বেড়োচ্ছিলোনা তখন, ভয়ে বিস্ময়ে ওর মুখটা হাঁ হয়ে গিয়েছিলো; চোখদুটো বিস্ফারিত! কারণ ওর সামনে থকথকে রক্তের মধ্যে পড়ে থাকা  মৃতদেহটা অস্বাভাবিক রকম ছোট.....।।
   
                  -----------------------------
(বিদেশী কাহিনীর ছায়াবলম্বনে)

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...