Sunday, 18 February 2018

চিলের ছাদের ঘরে (গুলজারিশ- ১)

চিলের ছাদের ঘরে এখন আর কেউ থাকেনা,
কবে থেকে বন্ধ পরে আছে।
যে চব্বিশটা সিঁড়ি ওই ঘর অবধি যেতো, ওইসব সিঁড়িতে ধুলো জমেছে আজকাল;
কেউ আর যায়না!
ওই ঘরে আমার অজস্র ধূসর স্মৃতি ভীড় করে আছে,
গতজন্মের কোনো কিশোরবেলার স্বপ্নের মতো।
এলোমেলো খেলনাপাতি
একটা পুরনো বাক্সে ভরে রেখেছিলাম কবে!
তার মধ্যে কতক গিয়েছিলো ভেঙেচুরে,
আর কিছু এদিক ওদিক কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো
কালের চোরাস্রোতে!
ছেলেবেলার সবচেয়ে দামী
সম্পদ---
পাতলা চটি একগোছা ইন্দ্রজাল কমিকস,
কিছুর মলাট ছেঁড়া হাতে হাতে ঘুরে;
কয়েকটা সেযুগের শুকতারা, সন্দেশ; সদ্য বেরুনো হাঁদা ভোঁদা বাঁটুলের বই
সাদা কালো গোলাপির ভিড়
পাতায় পাতায়।
কে এক বন্ধু ছিলো, জীবনের সায়াহ্নে নামও মনে পড়েনা এখন;
তখন নিকটে ছিলো---রোজ দুপুরে হানা ওইঘরটাতে
ইন্দ্রজাল কমিকস আর
চুরি করা আমচুরের লোভে।
ওইঘরের সামনে সেই ছাদটা
এখনো আছে,
আমার মায়ের শাড়ি, দিদির পোশাক রোদ্দুরে কখনো
মেলা থাকতো সারা দিন ধরে।
সে আমার কোন শৈশবের কথা!
এখন ওই ছাদ একা একা পরে
আছে;
চিলেকোঠা বন্ধ বহুদিন, চাবিও হারিয়েছে কোথাও!
ওই ছাদ, যেখানে চাঁদের আলোয় কত রাত সন্ধে জুড়ে
দাদাইয়ের কোল ঘেঁষে ভাইবোনেদের ভিড়;
বড়দাদু ধরাতেন অম্বুরি তামাক
দিদার হাতে সেকেলে একটা
হ্যারিকেন---সেটাও কতবছর
বন্দি ওই ঘরটায়, গাঢ় হলুদ
আলো কাঁপা কাঁপা দিদার চশমায়;
চাঁদের সাদাটে আলো
আর হ্যারিকেনের আলো
মিলে গিয়ে বড় বড় ছায়া ছাদ জুড়ে,
মাঝে মাঝে দক্ষিণে বা পূবে হাওয়া সুপুরিগাছের
মাথায় মাথায় তোলপাড়!
আকাশ জুড়ে নক্ষত্রেরা
টিমটিম করে জ্বলে যেতো সারারাত! দিদা বলতো, তাকিয়ে থাকলে পরী আর চাঁদের বুড়ি দুই'ই দেখা দেয়!
দাদাইয়ের গলায় মায়াময়
কবেকার হেমন্ত মুখুজ্জের গান;
অন্য জন্মের কোনো গল্প
মনে হয়!
আমার বাড়ির থেকে হাফ মাইল হাঁটা পথে অতিথিশালা;
আমেরিকা থেকে কখনো নাতি এলে সেখানেই থেকে যায়!
অতিরিক্ত ঘরের অভাবে!!
সে ছেলে যতবার আসে
মনে হয় অন্য কোনো মানুষ;
এভাবে চোখের সামনে
তার চেহারা বদলে যায় দিনে দিনে,
আমার কোলেতে চড়ে যে ছেলেটা আকাশের তারা দেখে
পিটার প্যানকে খুঁজতো,
সেই ছেলে হঠাৎ যেন
অনেকটা বড় হয়ে গেলো;
মাঝে মাঝে মনে হয়
একই জন্মে আমি অনেক
জন্ম পার হলাম কীভাবে?
ছেলেমেয়েরা কোনোদিনও
চিলের ছাদের ঘরে আসেনি
আমার! আমার স্বপ্নের সেই
চিলের ছাদের ঘর; ওদের
স্বপ্নের হতে পারেনি কোনোদিন!
ওরা থাকে নীচতলায়
যেখানে ড্রয়িংরুমে
এখনো আমার মায়ের
সাধের হারমোনিয়াম
রাখা আছে!
কখনো কখনো
সন্ধের মুখে
চুল বেঁধে সিঁদুর পরে
হারমোনিয়ামটা টেনে
মা গাইতো রবীন্দ্রনাথ
বা নজরুলের গান;
কখনো বা অতুলপ্রসাদ!
এই ধুলো পড়া হারমোনিয়াম
কোনোদিন বড় বেশি প্রিয়
ছিলো মা'র!
এখন রিডগুলো নষ্ট হয়েছে
বহুদিনের অযত্নের ফলে,
বাজানোও যায়না আর
বৌমা তো কবে থেকে বলে
এইবারে বেচে দিলেই হয়
কিলোদরে!
ওই সেই ড্রয়িংরুম, বেশ
করে অ্যাকোরিয়াম আর
দামী দামী আসবাবে সাজিয়ে নিয়েছে বটে
দুই ছেলে আর বৌমারা!
ওইখানে কোনোদিন আমাকে ন্যাংটো করে
স্নানের আগে সারাগায়ে তেল মাখাতো
আমার মা।
ছোট্ট সে কোলের ছেলে....
সেসব অন্য জন্মের কথা!
বড়ছেলের যে ঘরটা
কিছুদিন আগে রঙ হলো,
পুরনো আসবাব আর সেভাবে কিছুই
অবশিষ্ট নেই।
ওইঘরে একদিন উল বুনতো
চুল বাঁধার সময় গুণ গুণ গান গাইতো
জ্বরের রাতে ছোটছেলের মাথায়
জলপট্টি দিতো আমার স্ত্রী!
আমি তো একাই এখন বছর তিন হলো,
একা বুড়ো মানুষের অতবড় ঘরে কী
দরকার? এখন একাই থাকি
দুইছেলের শৈশব জড়িয়ে রয়েছে
যে ঘরে, সেইঘরে আমার বসবাস!
বাড়ির বাগানের দিকে
যে ঘরটা খালি পরে আছে
কতকাল,
একটা আলোও জ্বলেনা
কোনো সন্ধ্যায়!
ওইঘরে কখনো থাকতো অঞ্জলীমাসি।
আমাদের ভাইবোনেদের মানুষ
করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিলো বুড়ি,
কত যে বয়স ছিলো
ঈশ্বর জানেন শুধু!
মাথায় একটিচুলও পাকেনি
শেষদিন অবধি; বেঁটে খাটো
মানুষটি আমার বাবারও মাসি,
আমাদেরও মাসি!
এতগুলো বছরের সাক্ষী
সে বুড়ির, একটি চিহ্নও নেই
এ বাড়ির কোনো কোণাতেও।
ওই ঘর এখন স্টোর রুম
ছেলেদের কৃপায়।
এখন দুপুরবেলা কোনো কোনো
দিন হঠাৎই, হঠাৎ ফিরেই আসে
আমার শৈশব ওই ছাদে;
আমার ছেলেবেলা অন্য এক জন্মের
ঘুমোচ্ছে ওই চিলেকোঠায়!
বন্দি আছে এক বছর বারোর
কিশোর চিরতরে ওই ঘরের
প্রতিটি কোণায়!
ওই সেই ঘর, যে ঘরে কখনো
এক এলোমেলো বিকেলে
প্রথম কৈশোরে প্রথম চুমুর স্বাদ
আলতো করেই ছোঁয়া আরেক
অধর, ছেলেবেলার সেই ফ্রক পরা
খেলার সাথীর চেহারাও স্পষ্ট নয়
আজ আর প্রতারক স্মৃতির খাঁচায়।
চিলের ছাদের ঘরে এখন আর কেউ থাকেনা
কবে থেকে বন্ধ পরে আছে।।
                            

Thursday, 8 February 2018

লোকটা

একটা লোক প্রেম করতো কখনো,
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর দোরগোড়ায়!
একটা লোক, যে একদিন সংসার করেছিলো;
আর পাঁচজনের মতো সাজানো সংসার,
স্বাধীনতার পরে বাংলাজুড়ে রায়টের সময়
পালিয়ে এসেছিলো কলকাতায়!
কৈশোর থেকে যার জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়া,
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে!
একটা লোক, যে একদিন নিয়মিত বাজারে যেতো
মাছ সবজি কিনতো দর করে;
আজ লোকটা বিছানায় নিজের মৃত্যুর সঙ্গে দরাদরি করছে শেষবেলায়।
একটা লোক, যে একদিন সকালে ভাত খেয়ে
পান চিবিয়ে ট্রেন ধরতে ছুটতো প্রত্যহ;
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর আলিঙ্গনপাশে
নিজেকে জড়িয়ে নিতে ছুটছে মনে মনে।
একটা লোক, যে একদিন যুবক ছিলো
তারপর মধ্যবয়স্ক, চার পাঁচটি ছেলেমেয়েকে
মানুষ করতে হিমশিম মধ্যবিত্ত ঘরে!
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যু আর রোগযন্ত্রণাকে
এক ও অভিন্ন দেখার জন্যে হিমশিম।
একটা লোক, যে রোজ সন্ধে হলে
এইট বি বাস ধরে ক্লান্ত পায়ে ফিরতো
নিজের ছোট্ট ঘরে।
আজ লোকটা বিছানায় ক্লান্ত পায়ে
পথ ধরেছে মৃত্যুর অভিমুখে।
ওই লোকটাও মানুষ ছিলো
তোমার আমার মতো।
সবার চোখে মূল্য ছিলো,
উপার্জন করতো মাসে মাসে।
ঘরের মধ্যে স্ত্রী ছিলো,
ছেলেমেয়েরা ইস্কুল কলেজে।
একাত্তরে দাঙ্গা হলো,
চাকরি গেলো
কংগ্রেসের কোপ।
বাপ পিতেমোর পৈতে ছিলো
পুজো আর্চ্চা করতে সম্বল।
রক্ত বিক্রি করে সংসার
চালিয়েছিলো পরপর দু'মাস;
দেশের অবক্ষয়ের আঁচড়
লাগতে দেয়নি সংসারে একদিনও।
মেঘে মেঘে সময় গেলো,
পাঁঠার মাংস মাসে কী দু'মাসে;
সপ্তাহান্তে একদিন শুধু মাছ!
ধরে সামলে চলার শুরু
ধনে পুত্র লক্ষ্মী লোকসান।
একটা লোক, জীবনযুদ্ধ করে
সংসারে টিঁকে রইলো চিরদিন,
বাকিদেরও বাঁচিয়ে রাখলো ঢেকে রাখলো
নিজের ছোট্ট বেগুন গাছের মতো ছায়া দিয়ে।
আজ লোকটা বিছানায়, নিজের ছোট্ট ছায়া নিয়ে
ছুটির দরখাস্ত হাতে তার স্রষ্টার কাছে।
অনেক অনেকদিন হয়ে গেলো, ঘেঁষটে ঘেঁষটে
বিপত্নীকও হয়েছে বহুদিন।
অনেক ঝড় এসেছিলো, কিছু ঝড় সামলে নিলো
কিছু দিলো নুইয়ে একেবারে!
দৃষ্টিশক্তি খোয়া গেছে বছর দশেক,
খাদ্যগ্রহণ বা প্রাকৃতিক ক্রিয়া
সবই আজ পরনির্ভর।
তিরানব্বুই বছর ধরে
স্রষ্টার সৃষ্টি করা অফিসেতে
লড়ে যাচ্ছে খেটে যাচ্ছে
জীবনের সঙ্গে একটানা।
আজ লোকটা বিছানায়
ছুটির দরখাস্ত চেয়ে হাঁ করে
বসে আছে বড়বাবুর প্রত্যুত্তরের
অপেক্ষায়! বোকা লোকটা জানেওনা
এই নিষ্ঠুর অফিসেতে, যে যার
নিজের কাজ সামলাবে ইচ্ছেমতোন।
কেউ করবে তার মতো সংসার সংসার,
কেউবা স্লোগান দেবে; নিজের আখের গুছিয়ে
সংসার টানতে টানতেও ধান্দাবাজি করে
বলবে দেশের কথা, রাজনীতির কথা।
এই লোকটা দেশ বা দশের জন্যে কখনো
কিচ্ছু করেনি; নিজের নিজের করে গেছে
শুধু সংকীর্ণ মনে।
এই লোকটার পরিশ্রম ছিলো ছেলেমেয়েদের
মুখে ভাত জোগাবে বলে।
তাই আজ লোকটা বিছানায়, লোকটার
মৃত্যু হলে কেউ তাকে মনে রাখবেনা।
কোনো খবরের কাগজে ওরজন্যে
লেখা হবেনা একটি লাইনও;
ঘন্টাখানেক কিছু ভণ্ড বুদ্ধিজীবী
শোকসভা করবেনা নিউজ চ্যানেলে।
গান স্যালুট, হাস্যকর! সেসবও হবেনা;
এই লোকটা ইঁদুরের মতো মরেছে
বিছানায়! এই লোকটা কোনোদিনও
সীমান্ত দেখেনি।
এই লোকটা মরে গেলে চোদ্দদিনে
মাছভাত খাবে গুটিকতক লোক,
দু চারজন ন্যাকা ন্যাকা
করবে "আহা! উহু!" সম্বোধন।
একটা লোক, নিজের সমস্ত
সাধ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে
ছটা পেট চালিয়েছে চরাই উৎরাইয়ের
পলিটিকাল পশ্চিমবাংলায়!
রক্ত বেচে মুখ বুজে
সংসার চালিয়েছে টানা দুইমাস!
এই লোকটা না শিখেই ঠাকুর গড়তো
ঠিক পোটোদের মতো।
কাঠ দিয়ে গড়ে তুলতো পাখির খাঁচা,
ছবি বাঁধাতো, রান্নার হাত ছিলো
ভারী চমৎকার।
লোকটা বৃহৎ স্বার্থ বুঝতোনা,
দেশের স্বার্থ চিনতোনা,
গান শুনতো গ্রামোফোনে
রাধাগোবিন্দের পুজো করতো
প্রাচীন মন্দিরে!
আজ লোকটা বিছানায়,
কাল যদি মরে যায়
কেউ তাকে মনে রাখবেনা।।
                           

Friday, 26 January 2018

Wednesday, 17 January 2018

পুষ্পিতা....আবারও তোমার জন্যেই!!

আমি হয়তো পাগল হয়ে যাবো,
অথবা আত্মহত্যা করবো!
পাতার পর পাতা লিখে যাচ্ছি
মাথামুণ্ডুহীন!
যেসব কবিতা পড়লে উচ্চশ্রেণীর
সাহিত্যবোদ্ধা সমালোচকরা
নাক সিঁটকোবে।
আমি তো এমন ছিলামনা!
আমিও ছিলাম কিছু বিশিষ্ট
প্রকাশক সম্পাদকদের
ধান্দাবাজ স্তাবকবৃন্দের দলে।
আমি তো বরাবরই বামপন্থী;
যে হৃদয়ের চেয়ে মস্তিষ্ককে
প্রাধান্য দিয়ে গেছে বেশি।
তবে একি হলো আমার?
দুর্ভিক্ষপীড়িত মুখ আজকাল
মনে আসছেনা কেন?
পলিটিকাল ঝাঁঝালো আলোচনা
অর্থহীন লাগছে হঠাৎ!
আমার যুক্তিবাদী বামদিক
হঠাৎ স্লোগান তুলছে,
"পুষ্পিতা! পুষ্পিতা!"
আমার অলিন্দ আর নিলয়ে
রক্তের টাগ অফ ওয়ার,
একটাই জিগির তুলছে
"পুষ্পিতা! পুষ্পিতা!''
আমার রক্তের প্রত্যেকটি
এরিথ্রোসাইট-মনোসাইট-লিম্ফোসাইট
আর্তনাদে পাগল করে তুলছে আমাকে,
"পুষ্পিতা! পুষ্পিতা!''
আমার শিরা আর ধমনীর টিপটিপ
রক্তের বয়ে চলা, একটাই নাম ধরে
স্রোত বয়ে দিচ্ছে একটানা,
"পুষ্পিতা! পুষ্পিতা!''
এ আমার কী সর্বনাশ হলো?
তোমার বিদ্রুপ তোমার অবহেলায়
আমি ক্ষতবিক্ষত হই প্রতিনিয়ত!
আমি স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন দেখি আজকাল;
শবযাত্রীদের ভিড়ে সাদা বিছানায়
ফুলে ফুলে ঢেকে আছে আমার শরীর!
আমার শরীর নিয়ে কাটাছেঁড়া করে ডাক্তার
লাশকাটা ঘরে!!
আমাকে দিয়ে এইসব জঘন্য পাগলামি
লিখিয়ে নিচ্ছে তোমার কৌতুকময় চোখ!
আমি কিসে শান্তি পাবো?
সুমনের গান আজ অসহ্য মনে হয় নিদারুণ!!
লেনিন ভুলে লালন হলাম আজ হঠাৎ!
সমাজের ওষুধ খোঁজা ছেড়ে
মনের মানুষের খোঁজে পাগল করলে আমাকে!
পুষ্পিতা,আমি কী করে মুক্তি পাবো?
তোমার অবহেলায় সব পাতা ঝরেছে আমার,
নগ্ন শুষ্ক ডাল কোথায় লুকোই
এই ভীষণ সর্বনাশা উত্তুরে হাওয়ার মরশুমে!!
                                                    -দেবসেনাপতি

Tuesday, 16 January 2018

পুষ্পিতা তোমাকে বলছি..!!

পুষ্পিতা, দ্যাখো ঝড়ের দাপটে লণ্ডভণ্ড হচ্ছে আমার ভেতর ও বাইরে;
কোন গানে কোন কবিতায় আমি শান্তি পাবো?
আমার ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছো
এ কোন বিদ্রুপের আগুনে?
আমি অকালবৈশাখীতে মাঘের রাতে
একটা শীতার্ত গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
কোন জমে যাওয়া স্থবির আঁধারে!
পুষ্পিতা, এ কেমন বিদ্রুপের ঝড়?
আমার শুষ্ক শীতের ডালপালা থেকে
হু হু ঝড়ে সমস্ত আবরণ শুকনো পাতারা
ঝরে যাচ্ছে দ্রুত সেই হাওয়ায়!
আমার জীবনের একেকটি অধ্যায়
গান কবিতা গল্পেরা আমাকে ছেড়ে
উড়ে যাচ্ছে রুদ্ধ ঝড়ের দাপটে!
শুষ্ক ডালপালার সমস্ত আবরণ
খসিয়ে দিচ্ছে তোমার তোলা এই তাণ্ডব!
পুষ্পিতা, এ কেমন বিদ্রুপের ঝড়?
আমাকে নগ্ন করে দিলো
সমস্ত পাতা ঝরিয়ে দিয়ে
আমাকে নগ্ন করলো সম্পূর্ণ!
আমার সমস্ত গৌরব এক ফূঁয়ে
উড়িয়ে দিলে তুমি!
ভ্রু পল্লবে এ কেমন তীক্ষ্ম কৌতুক?
আমার কবিতা, আমার গল্প,
আমার রাজনীতি, গান, সিগারেট....
যা কিছু আমার ছিলো গর্ব করার মতো!
সবকিছু অর্থহীন করে দিলে তুমি।
শরীরে অক্সিজেন আগের মতোই প্রতিনিয়ত,
বাইরে এখনো আমি বসন্তের চিরসবুজ গাছ!
কিন্তু বুকের ভেতর উত্তুরে হু হু হাওয়া
আমাকে শুষ্ক করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে দ্রুত!
শীতের এই সর্বনাশা হাওয়ায়
অরণ্যে জ্বলে ওঠে দাবানল!!
জানোনা তুমি?
আমার বহু যত্নে সাজানো
কবিতা গান গল্প নাটক আর রাজনীতিদের
ক্ষতবিক্ষত করে দিলে আজ কঠিন বিদ্রুপে!
আমাকে জ্বালিয়ে দাও ভ্রু পল্লবে মিশে থাকা
কৌতুকের আঁচে;
কবীর সুমনের পায়ে সাজাও আমার চিতা কাঠ,
নিঃশেষ করে দিয়েছো তো আমায়!
এখন রিক্ত শরীরে উত্তুরে শুকনো হাওয়ায়
দ্রুত জ্বলে উঠবে আগুন;
তোমার দু'চোখে তো তীক্ষ্ম বারুদ!!
সে আগুনে ঘৃতাহুতি কবীরের গান,
আমার সমাধী পরিপূর্ণ হোক অমোঘ চিতায়।।
                                                  

Monday, 15 January 2018

নিকৃষ্টান্ধকার

এতো ঘৃণা সুন্দরের চোখে?
আমি কী জীবাণু নাকি সরীসৃপ?
নাকি গলিত স্থবির অন্ধকার?
যেমন অন্ধকার শীতের সন্ধ্যায়
শীতল পুকুরে জমে আসে!
এমন পুকুরে....পচা পানা জমে বহুদিন!
দুর্গন্ধে পরিত্যক্ত সেই ঘাট....
গা ঘিনঘিনে কটকটে স্বরে কবেকার ইঁটের
ফোকরে ডাকে বুড়ো তক্ষক!
সন্ধ্যার গাঢ় নীল ছুঁয়ে ফেলে পুকুরের জল।
দু দণ্ড স্থাণু হয় ঢোঁড়াসাপ...ডুব দেয় পুকুরের
সবুজ নোংরা অন্ধকারে!!
আমি সেই নগ্ন গহীন অন্ধকার!
যার প্রতি সুতীব্র ঘেন্নায় সুন্দরের চোখ লাল হলো।
নিজের নগ্ন শরীরটুকু অন্ধকার করে নিয়ে
তবে ডুব দেওয়া ভালো সবুজ পানার অন্ধকারে!
দু একটা মাছ শুধু ঝুপঝুপ করে নিক চারপাশে,
আমাকে মিশিয়ে দিক জলেতে মাটির তল পেয়ে।
পায়ের পাতার নীচে ঠাণ্ডা ভিজে মাটি,
পুকুরের ঘাটজুড়ে কেউ আসবেনা এখানে;
কেউ না! শুধু আমি আদি ও অনন্তকাল
অন্ধকার হয়ে মিশে থাকবো এখানে।
কেউ না জানুক, সেই ভালো!
সুন্দর খুশি হোক, যেখানে যা কিছু আছে
অতীব জঘন্যও দেখা দিক সুপুরুষ হয়ে।
সুন্দরের চোখে এতো আলো,
যে আলোয় লজ্জিত হয়ে
নগ্ন মহাকাশের আঁধার আজ এতটুকু হয়ে
মিশে গিয়ে হারাতে চায় পরিত্যক্ত এক
পুকুরের সবুজ অন্ধকার শরীরে!
আমি সেই মহাকাশ, আমার ছায়াটুকুও
মিশে যাক আমার শরীরে;
অন্ধকারের বুকে কোনো ছায়া অভিন্ন হবেনা!
নিজের ছায়াকেও আমি ভয় পাই আজকাল,
যদি তার ছোঁয়াচেতে সুন্দরের ঘৃণা জেগে ওঠে।
ঘৃণার আলোয় আমি অন্ধকার হবো,
মহাকাশ ছিলাম আমি, অখণ্ড গাঢ় মহাকাশ!
বুঝিনি এ নগ্নতা কোনোদিনও গৌরব নয়,
মহাকাশ উলঙ্গ পুরুষাঙ্গে কাপড় কোথায়?
ওই ঘৃণার আগুন আঁচ আলো,
আমার শরীরের সব অন্ধকার জ্বলে গেলো,
এতো জ্বালা নিয়ে আমি কোথায় লুকোবো?
তাই দারুণ অবসাদে কিংবা সুতীব্র যন্ত্রণা নিয়ে
পুকুরের জলে আজ এতটুকু অন্ধকার নিয়ে
মহাকাশ ডুব দিলো নিজেকে উজাড় করে দিয়ে!
এতো তারা বুকে যার, সেও একা হয়ে যায়
সুন্দরের দুচোখের দাউদাউ ঘৃণার আগুনে!
দুনিয়ার সবচেয়ে ভীতু কাপুরুষও বুঝি
আমার চেয়ে উৎকৃষ্টতম
সুন্দরের চোখে!
আমার অপরাধ আমি কোনোদিনও
মেকি আলো হয়ে মিথ্যে গৌরব নিয়ে
দাঁড়াতে পারিনি সুন্দরের সামনে!
বরং যা আমি, আমার যা পরিচয়
সেই গাঢ় মহাকাশ হয়েই আমার বুকেতে জমা
সমস্ত তারাদের নিয়ে গৌরব করে গেছি আজীবন।
সবুজ অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে বুঝলাম আজ;
আমাকে ভালবাসা কী ভীষণ জঘন্য কাজ!!
                                                  

Friday, 5 January 2018

রোদ্দুর

বহুদিন রোদ্দুরে ভিজিনি আমি
বহুদিন----যেন কত শতাব্দী;
অথচ,ডালপালা বেয়ে আসা রোদ
আমার জানলায় এসে ছোঁয় আমাকে
আমি হাত বাড়াই; হাতে নিই একমুঠো রোদ!
আমার হাতের তালু পিছলে বেড়িয়ে যায়
রোদের সোনালি কণাটুকু।
এই রোদ----বড় আপন ছিলো আমার;
হেমন্তের শেষে তপ্ত যে রোদের জন্য
আমি সারা হেমন্ত অপেক্ষায় থাকি
সেই রোদ এতো কাছে এসেও
আমাকে ছুঁলোনা এ বছর।
এমন শীতের রোদেই মিশে ছিলো
আমার মৃত প্রিয়জনেদের হাসিমুখ,
স্নেহপ্রদত্ত হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি
মৃত ডাকনাম আমার!
গোলকোণ্ডার ছাদে এই পড়ন্ত রোদই
ভিজিয়েছিলো একদিন সেই যুবতীকে।
বলেছিলাম, "আমার রোদ্দুরে ভিজতে ভাললাগে!''
আমার শরীর....কোনো মৃতজীবী
জলজ উদ্ভিদের মতো স্থাণু;
স্যাঁতসেঁতে পৃথিবীর এককোণে!
আমি একটু উষ্ণতার লোভে
জানলায় হাত বাড়িয়ে দিই,
তপ্ত করতে চাই হাতের তালুটুকু!
পড়ন্ত রোদটুকু হারিয়ে যায়
দূরের সুপারির সারীর পেছনে ধীরে ধীরে;
অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে স্থবির হয়
ঠাণ্ডা সরীসৃপের মতো।
নিজেকে আজকাল সরীসৃপ মনে হয়;
কিংবা কুয়োর নীচে লুকোনো কোনো ব্যাঙ!
যারা কোনোদিনও রোদ্দুর পায়নি!
কোনো শতাব্দীতেও.....!
আমার ভেতরে কোনো উষ্ণতা নেই।
যে রোদ্দুরকে আমি সাজিয়ে তুলেছিলাম
আমবাগানে হেমন্তের সকালে
কিশোরীর বেশে,
কখনো বা শরতের নিথর পুকুরে
মুখ দেখা উদাসিনী মেয়েটির মতো।
প্রতারক রোদ্দুর---আজকের ভুলেছে আমায়।।
                                                     -দেবসেনাপতি

Monday, 1 January 2018

এই দেশ

সোনাইয়ের নাম ধরে
আজও কাঁদে প্রেমিক মাধব,
ভোরের গাঙুরে চাঁদ সদাগর
ভাসালেন মধুকর ডিঙা উৎসব!
পূবের আকাশ থেকে রক্ত ঝরিয়ে দিয়ে
লাল হলো বেহুলার সিঁথি,
বাংলার পথে ঘাটে আজও আমি
তোমাদের সাথী।
######
সহসা হ্রেষ্বাধ্বনি, ছুটে আসে বল্লাল সেন
রামপ্রসাদের গান শুনে শ্যামা কিশোরী হলেন!
সে কিশোরী খেলে যায় বাংলার মাঠে ঘাটে পথে
লালন ধরেন গান দরিয়ায় আচম্বিতে!
ভোরের সূর্যে লাল গাঙুরের বুকে ভাসে
ভাষা শহীদের সেই স্মৃতি.....
বাংলার পথে ঘাটে আজও আমি
তোমাদের সাথী।
######
সিরাজের সমাধী প্রথম আলোয় করে স্নান,
মাধুকরী কীর্তনে মিলে যায় ভোরের আজান!
সূর্যোদয়ের রাগে কন্ঠ মেলান মহাকাল,
মায়ের কাজল আজও প্রহরায় শিশুর কপাল।
শ্যাম শামসুল ভাইয়ে দাঙ্গার শেষে সম্প্রীতি,
বাংলার মাঠবনে চিরকাল রবো আমি
তোমাদের সাথী।।

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...