Sunday, 18 February 2018

চিলের ছাদের ঘরে (গুলজারিশ- ১)

চিলের ছাদের ঘরে এখন আর কেউ থাকেনা,
কবে থেকে বন্ধ পরে আছে।
যে চব্বিশটা সিঁড়ি ওই ঘর অবধি যেতো, ওইসব সিঁড়িতে ধুলো জমেছে আজকাল;
কেউ আর যায়না!
ওই ঘরে আমার অজস্র ধূসর স্মৃতি ভীড় করে আছে,
গতজন্মের কোনো কিশোরবেলার স্বপ্নের মতো।
এলোমেলো খেলনাপাতি
একটা পুরনো বাক্সে ভরে রেখেছিলাম কবে!
তার মধ্যে কতক গিয়েছিলো ভেঙেচুরে,
আর কিছু এদিক ওদিক কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো
কালের চোরাস্রোতে!
ছেলেবেলার সবচেয়ে দামী
সম্পদ---
পাতলা চটি একগোছা ইন্দ্রজাল কমিকস,
কিছুর মলাট ছেঁড়া হাতে হাতে ঘুরে;
কয়েকটা সেযুগের শুকতারা, সন্দেশ; সদ্য বেরুনো হাঁদা ভোঁদা বাঁটুলের বই
সাদা কালো গোলাপির ভিড়
পাতায় পাতায়।
কে এক বন্ধু ছিলো, জীবনের সায়াহ্নে নামও মনে পড়েনা এখন;
তখন নিকটে ছিলো---রোজ দুপুরে হানা ওইঘরটাতে
ইন্দ্রজাল কমিকস আর
চুরি করা আমচুরের লোভে।
ওইঘরের সামনে সেই ছাদটা
এখনো আছে,
আমার মায়ের শাড়ি, দিদির পোশাক রোদ্দুরে কখনো
মেলা থাকতো সারা দিন ধরে।
সে আমার কোন শৈশবের কথা!
এখন ওই ছাদ একা একা পরে
আছে;
চিলেকোঠা বন্ধ বহুদিন, চাবিও হারিয়েছে কোথাও!
ওই ছাদ, যেখানে চাঁদের আলোয় কত রাত সন্ধে জুড়ে
দাদাইয়ের কোল ঘেঁষে ভাইবোনেদের ভিড়;
বড়দাদু ধরাতেন অম্বুরি তামাক
দিদার হাতে সেকেলে একটা
হ্যারিকেন---সেটাও কতবছর
বন্দি ওই ঘরটায়, গাঢ় হলুদ
আলো কাঁপা কাঁপা দিদার চশমায়;
চাঁদের সাদাটে আলো
আর হ্যারিকেনের আলো
মিলে গিয়ে বড় বড় ছায়া ছাদ জুড়ে,
মাঝে মাঝে দক্ষিণে বা পূবে হাওয়া সুপুরিগাছের
মাথায় মাথায় তোলপাড়!
আকাশ জুড়ে নক্ষত্রেরা
টিমটিম করে জ্বলে যেতো সারারাত! দিদা বলতো, তাকিয়ে থাকলে পরী আর চাঁদের বুড়ি দুই'ই দেখা দেয়!
দাদাইয়ের গলায় মায়াময়
কবেকার হেমন্ত মুখুজ্জের গান;
অন্য জন্মের কোনো গল্প
মনে হয়!
আমার বাড়ির থেকে হাফ মাইল হাঁটা পথে অতিথিশালা;
আমেরিকা থেকে কখনো নাতি এলে সেখানেই থেকে যায়!
অতিরিক্ত ঘরের অভাবে!!
সে ছেলে যতবার আসে
মনে হয় অন্য কোনো মানুষ;
এভাবে চোখের সামনে
তার চেহারা বদলে যায় দিনে দিনে,
আমার কোলেতে চড়ে যে ছেলেটা আকাশের তারা দেখে
পিটার প্যানকে খুঁজতো,
সেই ছেলে হঠাৎ যেন
অনেকটা বড় হয়ে গেলো;
মাঝে মাঝে মনে হয়
একই জন্মে আমি অনেক
জন্ম পার হলাম কীভাবে?
ছেলেমেয়েরা কোনোদিনও
চিলের ছাদের ঘরে আসেনি
আমার! আমার স্বপ্নের সেই
চিলের ছাদের ঘর; ওদের
স্বপ্নের হতে পারেনি কোনোদিন!
ওরা থাকে নীচতলায়
যেখানে ড্রয়িংরুমে
এখনো আমার মায়ের
সাধের হারমোনিয়াম
রাখা আছে!
কখনো কখনো
সন্ধের মুখে
চুল বেঁধে সিঁদুর পরে
হারমোনিয়ামটা টেনে
মা গাইতো রবীন্দ্রনাথ
বা নজরুলের গান;
কখনো বা অতুলপ্রসাদ!
এই ধুলো পড়া হারমোনিয়াম
কোনোদিন বড় বেশি প্রিয়
ছিলো মা'র!
এখন রিডগুলো নষ্ট হয়েছে
বহুদিনের অযত্নের ফলে,
বাজানোও যায়না আর
বৌমা তো কবে থেকে বলে
এইবারে বেচে দিলেই হয়
কিলোদরে!
ওই সেই ড্রয়িংরুম, বেশ
করে অ্যাকোরিয়াম আর
দামী দামী আসবাবে সাজিয়ে নিয়েছে বটে
দুই ছেলে আর বৌমারা!
ওইখানে কোনোদিন আমাকে ন্যাংটো করে
স্নানের আগে সারাগায়ে তেল মাখাতো
আমার মা।
ছোট্ট সে কোলের ছেলে....
সেসব অন্য জন্মের কথা!
বড়ছেলের যে ঘরটা
কিছুদিন আগে রঙ হলো,
পুরনো আসবাব আর সেভাবে কিছুই
অবশিষ্ট নেই।
ওইঘরে একদিন উল বুনতো
চুল বাঁধার সময় গুণ গুণ গান গাইতো
জ্বরের রাতে ছোটছেলের মাথায়
জলপট্টি দিতো আমার স্ত্রী!
আমি তো একাই এখন বছর তিন হলো,
একা বুড়ো মানুষের অতবড় ঘরে কী
দরকার? এখন একাই থাকি
দুইছেলের শৈশব জড়িয়ে রয়েছে
যে ঘরে, সেইঘরে আমার বসবাস!
বাড়ির বাগানের দিকে
যে ঘরটা খালি পরে আছে
কতকাল,
একটা আলোও জ্বলেনা
কোনো সন্ধ্যায়!
ওইঘরে কখনো থাকতো অঞ্জলীমাসি।
আমাদের ভাইবোনেদের মানুষ
করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিলো বুড়ি,
কত যে বয়স ছিলো
ঈশ্বর জানেন শুধু!
মাথায় একটিচুলও পাকেনি
শেষদিন অবধি; বেঁটে খাটো
মানুষটি আমার বাবারও মাসি,
আমাদেরও মাসি!
এতগুলো বছরের সাক্ষী
সে বুড়ির, একটি চিহ্নও নেই
এ বাড়ির কোনো কোণাতেও।
ওই ঘর এখন স্টোর রুম
ছেলেদের কৃপায়।
এখন দুপুরবেলা কোনো কোনো
দিন হঠাৎই, হঠাৎ ফিরেই আসে
আমার শৈশব ওই ছাদে;
আমার ছেলেবেলা অন্য এক জন্মের
ঘুমোচ্ছে ওই চিলেকোঠায়!
বন্দি আছে এক বছর বারোর
কিশোর চিরতরে ওই ঘরের
প্রতিটি কোণায়!
ওই সেই ঘর, যে ঘরে কখনো
এক এলোমেলো বিকেলে
প্রথম কৈশোরে প্রথম চুমুর স্বাদ
আলতো করেই ছোঁয়া আরেক
অধর, ছেলেবেলার সেই ফ্রক পরা
খেলার সাথীর চেহারাও স্পষ্ট নয়
আজ আর প্রতারক স্মৃতির খাঁচায়।
চিলের ছাদের ঘরে এখন আর কেউ থাকেনা
কবে থেকে বন্ধ পরে আছে।।
                            

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...