Thursday, 8 February 2018

লোকটা

একটা লোক প্রেম করতো কখনো,
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর দোরগোড়ায়!
একটা লোক, যে একদিন সংসার করেছিলো;
আর পাঁচজনের মতো সাজানো সংসার,
স্বাধীনতার পরে বাংলাজুড়ে রায়টের সময়
পালিয়ে এসেছিলো কলকাতায়!
কৈশোর থেকে যার জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়া,
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে!
একটা লোক, যে একদিন নিয়মিত বাজারে যেতো
মাছ সবজি কিনতো দর করে;
আজ লোকটা বিছানায় নিজের মৃত্যুর সঙ্গে দরাদরি করছে শেষবেলায়।
একটা লোক, যে একদিন সকালে ভাত খেয়ে
পান চিবিয়ে ট্রেন ধরতে ছুটতো প্রত্যহ;
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যুর আলিঙ্গনপাশে
নিজেকে জড়িয়ে নিতে ছুটছে মনে মনে।
একটা লোক, যে একদিন যুবক ছিলো
তারপর মধ্যবয়স্ক, চার পাঁচটি ছেলেমেয়েকে
মানুষ করতে হিমশিম মধ্যবিত্ত ঘরে!
আজ লোকটা বিছানায় মৃত্যু আর রোগযন্ত্রণাকে
এক ও অভিন্ন দেখার জন্যে হিমশিম।
একটা লোক, যে রোজ সন্ধে হলে
এইট বি বাস ধরে ক্লান্ত পায়ে ফিরতো
নিজের ছোট্ট ঘরে।
আজ লোকটা বিছানায় ক্লান্ত পায়ে
পথ ধরেছে মৃত্যুর অভিমুখে।
ওই লোকটাও মানুষ ছিলো
তোমার আমার মতো।
সবার চোখে মূল্য ছিলো,
উপার্জন করতো মাসে মাসে।
ঘরের মধ্যে স্ত্রী ছিলো,
ছেলেমেয়েরা ইস্কুল কলেজে।
একাত্তরে দাঙ্গা হলো,
চাকরি গেলো
কংগ্রেসের কোপ।
বাপ পিতেমোর পৈতে ছিলো
পুজো আর্চ্চা করতে সম্বল।
রক্ত বিক্রি করে সংসার
চালিয়েছিলো পরপর দু'মাস;
দেশের অবক্ষয়ের আঁচড়
লাগতে দেয়নি সংসারে একদিনও।
মেঘে মেঘে সময় গেলো,
পাঁঠার মাংস মাসে কী দু'মাসে;
সপ্তাহান্তে একদিন শুধু মাছ!
ধরে সামলে চলার শুরু
ধনে পুত্র লক্ষ্মী লোকসান।
একটা লোক, জীবনযুদ্ধ করে
সংসারে টিঁকে রইলো চিরদিন,
বাকিদেরও বাঁচিয়ে রাখলো ঢেকে রাখলো
নিজের ছোট্ট বেগুন গাছের মতো ছায়া দিয়ে।
আজ লোকটা বিছানায়, নিজের ছোট্ট ছায়া নিয়ে
ছুটির দরখাস্ত হাতে তার স্রষ্টার কাছে।
অনেক অনেকদিন হয়ে গেলো, ঘেঁষটে ঘেঁষটে
বিপত্নীকও হয়েছে বহুদিন।
অনেক ঝড় এসেছিলো, কিছু ঝড় সামলে নিলো
কিছু দিলো নুইয়ে একেবারে!
দৃষ্টিশক্তি খোয়া গেছে বছর দশেক,
খাদ্যগ্রহণ বা প্রাকৃতিক ক্রিয়া
সবই আজ পরনির্ভর।
তিরানব্বুই বছর ধরে
স্রষ্টার সৃষ্টি করা অফিসেতে
লড়ে যাচ্ছে খেটে যাচ্ছে
জীবনের সঙ্গে একটানা।
আজ লোকটা বিছানায়
ছুটির দরখাস্ত চেয়ে হাঁ করে
বসে আছে বড়বাবুর প্রত্যুত্তরের
অপেক্ষায়! বোকা লোকটা জানেওনা
এই নিষ্ঠুর অফিসেতে, যে যার
নিজের কাজ সামলাবে ইচ্ছেমতোন।
কেউ করবে তার মতো সংসার সংসার,
কেউবা স্লোগান দেবে; নিজের আখের গুছিয়ে
সংসার টানতে টানতেও ধান্দাবাজি করে
বলবে দেশের কথা, রাজনীতির কথা।
এই লোকটা দেশ বা দশের জন্যে কখনো
কিচ্ছু করেনি; নিজের নিজের করে গেছে
শুধু সংকীর্ণ মনে।
এই লোকটার পরিশ্রম ছিলো ছেলেমেয়েদের
মুখে ভাত জোগাবে বলে।
তাই আজ লোকটা বিছানায়, লোকটার
মৃত্যু হলে কেউ তাকে মনে রাখবেনা।
কোনো খবরের কাগজে ওরজন্যে
লেখা হবেনা একটি লাইনও;
ঘন্টাখানেক কিছু ভণ্ড বুদ্ধিজীবী
শোকসভা করবেনা নিউজ চ্যানেলে।
গান স্যালুট, হাস্যকর! সেসবও হবেনা;
এই লোকটা ইঁদুরের মতো মরেছে
বিছানায়! এই লোকটা কোনোদিনও
সীমান্ত দেখেনি।
এই লোকটা মরে গেলে চোদ্দদিনে
মাছভাত খাবে গুটিকতক লোক,
দু চারজন ন্যাকা ন্যাকা
করবে "আহা! উহু!" সম্বোধন।
একটা লোক, নিজের সমস্ত
সাধ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়ে
ছটা পেট চালিয়েছে চরাই উৎরাইয়ের
পলিটিকাল পশ্চিমবাংলায়!
রক্ত বেচে মুখ বুজে
সংসার চালিয়েছে টানা দুইমাস!
এই লোকটা না শিখেই ঠাকুর গড়তো
ঠিক পোটোদের মতো।
কাঠ দিয়ে গড়ে তুলতো পাখির খাঁচা,
ছবি বাঁধাতো, রান্নার হাত ছিলো
ভারী চমৎকার।
লোকটা বৃহৎ স্বার্থ বুঝতোনা,
দেশের স্বার্থ চিনতোনা,
গান শুনতো গ্রামোফোনে
রাধাগোবিন্দের পুজো করতো
প্রাচীন মন্দিরে!
আজ লোকটা বিছানায়,
কাল যদি মরে যায়
কেউ তাকে মনে রাখবেনা।।
                           

No comments:

Post a Comment

শীত গতপ্রায়

আবার একটা শীত গতপ্রায়; এই শীতেও তুমি জানলেনা হেমন্তের জাতক এক তোমাকে চাইতো অকারণ! মাঘের শেষবেলায় এ শহর অধিক কুয়াশায় ঢেকে যাবে, হু হু উত...