বাপ্পাদা সিঙাড়ায় একটা বড় কামড় দিয়েই গরমের জন্য ʼউঁ হুঁ হুঁ হুঁʼ করে উঠলো, প্লেটের গরম সিঙাড়ায় কামড় দিয়ে আমাদেরও একইরকম শোচনীয় অবস্থা। বাপ্পাদা গরমটা একটু সামলে নিয়ে বললো, "উঁহুঁহুঁ, বেড়ে ঝাল দিয়েছে রে। তবে যাই বলিস, রবিবারের আড্ডা এই মঙ্গলদার সিঙাড়া ছাড়া কিন্তু একদম আনসাক্সেসফুল।ʼʼ বিশ্বজিৎদা বললো, "একদম ঠিক বলেছিস বাপ্পা, আগেরবার আমার সাউথ ইন্ডিয়ায় শিফটিং ছিলোনা? ওখানেও অজস্র সিঙাড়ার দোকান ছিলো, ওরা আবার বলে ʼসামোসাʼ। একবার খেয়েছিলাম; ধুর ধুর! কোথায় লাগে আমার কলকাতার সিঙাড়ার কাছে? বেঁচে থাক মঙ্গল।ʼʼ রবিবারের আড্ডায় আজ আমাদের সবাই মোটামুটি উপস্থিত ছিলো, এমনকী বিবেকদাও। বিবেকদা রবিবারের আড্ডায় থাকলে সেদিন আলাদা মাত্রা যোগ হয়, ও কলকাতায় ফেরে আট-নʼমাস বাদে বাদে হপ্তা দুয়েকের জন্য। এককথায় বলা যায় ও একজন ক্রিপটোজুলজিস্ট, বিভিন্ন অভিযাত্রী দলের সাথে বিভিন্ন বার বেড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দিকে; আর যখনই ফেরে রবিবারের আড্ডায় ক্লাবে আসবেই আসবে। তো সেই বিবেকদা একমনে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলো, সবাইই আমরা বিবেকদার এবারের অভিযানের গল্প শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে যাচ্ছিলাম ভেতর ভেতর; অবশেষে মন্টে বা অয়ন নীরবতা ভঙ্গ করলো, "বিবেকদা, কিগো? তুমি পুরো চুপ করে আছো যে! কিছু বলো।ʼʼ ছোট্টু বা অঙ্কুশও এবার গলা মেলালো, "হ্যাঁ বিবেকদা, আমরা ওয়েট করছি কখন থেকে তোমার গল্প শুনবো বলে।ʼʼ বিবেকদা কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে হেসে বললো, "কিভাবে বলবো সেটাই ভাবছি। এইবারে একটা এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেটা গুছিয়ে কিভাবে শুরু করা যায় নিজেই....বুঝতে পারছিনা।ʼʼ বিশ্বজিৎদা একটা সিগারেট ধরিয়ে বিবেকদাকে অফার করে বললো, "বল বল, বলে ফ্যাল। নইলে দেখবি পেট ফুলে উঠবে, আর রাতে বাড়ি গিয়ে পাঁঠার মাংস খাওয়া হবেনা; ক্লাবে আসার পথে দেখে এলাম মাটন করছেন জেঠিমা।ʼʼ বিবেকদা হাসতে হাসতে বললো, "ভালো বলেছিস বিশু। বেশ, চল বলছি।ʼʼ সিগারেটটায় লাইটারে অগ্নিসংযোগ করতে করতে ও বললো, "এদিক ওদিক ঘুরতে হয় বলে মোটামুটি সিগার আর চুরুটই খাই, সিগারেট সবসময় সম্ভব হয়না। তবে কি জানিস বাপ্পা, এই গোল্ডফ্লেকের মতো আরাম কিস্যুতে নেই।ʼʼ সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে শুরু করলো বিবেকদা।
এবারের আমাদের মিশনটা ছিল ʼআহুলʼ এর। আহুল কি তোরা বোধহয় জানিসনা, ইন্দোনেশিয়ার জাভা সুমাত্রার কিছু অরণ্যে এই কিংবদন্তী প্রাণীর কথা শোনা যায়। যাকে পৌরাণিক বা লোককথায় পাওয়া যায় বলে এই প্রাণী ক্রিপটিড পর্যায়ে পড়ে। অনেকটা বাদুড় আর প্যাঁচার সংমিশ্রণ বলা যায় প্রাণীটাকে, দানবের মতো বিশাল; মানুষ, গরু, ছাগলের ঘাড়ে মুখ দিয়ে নাকি রক্ত শুষে নেয়। তা যাই হোক, এই অভিযানে আমার সঙ্গী ছিলেন এক আমেরিকান প্রৌড় ভদ্রলোক, নাম প্রফেসর এরিক রোজারিও। অদ্ভুত মানুষ; সমস্ত দেশের ইতিহাস, পুরাণ, লোককথা, সংস্কারের বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্য। কেউ কেউ ওঁকে নাকি বলে ʼপাগলা প্রফেসরʼ; চেহারাটাও বেশ আকর্ষণীয়, ক্লিন শেভড, হলুদ কাঁধ ছাপানো লম্বা চুল, আর চোখে সোনালী ফ্রেমের গোল গোল চশমার জন্য হঠাৎ কররে নিউটনের মতো লাগে। যাই হোক, ভদ্রলোক নিজেই মেইল করেছিলেন আমায় ওঁর বাড়ি ইনভাইট করে, আমি গেছিলাম ওঁর বাড়ি। রোজারিও থাকেন চিকাগো থেকে ২৫০ কিমি দূরে নেপারভিল নামের একটা শহরতলি এলাকায়; বেশ মনোরম পরিবেশ। ছোট্ট কাঠের ঘর চারপাশে সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে, উনি আর ওঁর স্ত্রী ডরোথি থাকেন শুধু। তা ওখান থেকেই আমরা সোজাসুজি প্ল্যান অনুসারে জাকর্তায় এসে পৌঁছলাম; ওখান থেকেই দুজন কুলি আর একজন গাইড পাওয়া গেলো। গাইড লোকটি বেশ অমায়িক, নাম আয়াপ্পা। প্রথম আলাপেই হাতজোড় করে বললো, "সেনাং বেরটেমু ডেঙ্গাংমু।ʼʼ অর্থাৎ, আলাপ করে ভালো লাগলো। রোজারিও বেশ ভালো বাহাসা ভাষা জানেন, ওঁ হেসে বললেন, "টেরিমা কাসি।ʼʼ অর্থাৎ, ধন্যবাদ।আমরা জাকর্তা থেকে প্রথমে প্যারাহানগান উচ্চভূমির একটি ছোট্ট গ্রাম বান্দুং-এ এলাম, ওখান থেকে দুটো ঘোড়া ভাড়া করে চারদিনের দিন জাভার অরণ্যে, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ʼহুটানʼ। ওখানকার ওয়েদার খুব বিচ্ছিরিরকম, বুঝলি বাবাই? ওরকম স্যাঁতস্যাঁতে জঙ্গল আমি আগে দেখিনি, চারদিকে ছোটো ছোটো সবুজ টিলা; সবসময় ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, দূরে সবুজ রঙের সেমেরু শৃঙ্গ, আর সোলো নদী বয়ে যাচ্ছে কুল কুল করে। সেদিনও আমরা দুজন বসে ছিলাম তাঁবুর ভেতরে, বিয়ার খাওয়া চলছিলো অল্প অল্প আর আহুল সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিলো। রোজারিও বলছিলেন, আমরা পরদিন সকালে আরো পশ্চিম দিকে যাবো; ওখানে জঙ্গল নাকি আরো গভীর, ওঁর বন্ধু ড.আর্নেস্ট ব্যাটেল নাকি নাইন্টি এইটে ওখানেই আহুলকে দেখেন ইত্যাদি ইত্যাদি। ইন্দোনেশিয়ার অরণ্যে রাত তোরা কল্পনা করতে পারবিনা মন্টে; টুপ টুপ করে গাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ার শব্দ, ঝিপ ঝিপ করে একটানা বৃষ্টির শব্দ, স্পটেড আউলের ভুত ভূতুম ডাক, মাঝে মাঝে মাটিতে পচা পাতার ওপর কোমোডো বা মাউস ডিয়ারের পায়ের খস খস শব্দ। হঠাৎ---বাইরে কুলিদের একটা শোরগোল শোনা গেলো, কি ব্যাপার? আমি বললাম, "কি ব্যাপার বলুন তো রোজারিও? এতো শোরগোল কীসের?ʼʼ রোজারিও চমকে উঠে বললেন, "সর্বনাশ! জাভাʼস রাইনো নয়তো? চৌধুরী....চলো বাইরে যাই! রাইফেলটা নাও।ʼʼ জাভাʼস রাইনো খুব ভয়ানক প্রাণী, বুঝলি বিশু? বলতে পারিস জাভার অরণ্যের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জন্তুই হলো জাভাʼস রাইনো। আমরা তাঁবু থেকে রাইফেল নিয়ে বেড়িয়ে এসে দেখলাম পূবদিকের ঝোপ জঙ্গল খুব কাঁপছে; মনে হয় কোনো বড় প্রাণী এদিকেই এগিয়ে আসছে....। কুলিরা প্রত্যেকে হাতে ছোটো খাটো কোনো না কোনো অস্ত্র তুলে নিয়েছে, রোজারিও ঠোঁটে আঙুল রেখে সবাইকে চুপ করতে বললেন; তারপর হাতে রাইফেলটা উঁচিয়ে ধরলেন সেদিকে, ওঁর মুখে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিলো। ঠিক তখনই ক্যালোফাঈলাম নেওবাডিকামের জঙ্গল হঠাৎ একবার সজোড়ে দুলে উঠলো; রোজারিও ট্রিগারে দ্রুত তর্জনী ঠেকালেন, কিন্তু পরক্ষণেই একটা কন্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলাম আমরা সবাই, "প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার!ʼʼ আমাদের অবাক করে জঙ্গল ভেদ করে বেড়িয়ে এলো একজন পর্টুগিজ মানুষ; রোজারিও আপনা থেকেই রাইফেল ধরা হাতটা নামিয়ে নিলেন। আমি প্রশ্ন করলাম, "হু আর ঈউ?ʼʼ লোকটি হাঁফাতে হাঁফাতে মাটিতে বসে পড়লো, কোনোমতে বড় করে দম নিয়ে শুধু একবার বললো, "জ.....জল!ʼʼ পরক্ষণেই চোখ দুটো বুজে এলো ওর, মাথাটা লুটিয়ে পড়লো একপাশে। আমি চমকে উঠে বললাম, "রোজারিও....ও মরে গেলো নাকি?ʼʼ রোজারিও দুʼদিকে মাথা নেড়ে বললেন, "নাঃ! অজ্ঞান হয়ে গেছে। মনে হয়, উনি ভীষণ ক্লান্ত; আয়াপ্পা ওঁকে টেন্টের ভেতরে নিয়ে যাও।ʼʼ
"আপনারা....প্লিজ আমাকে হেল্প করুন!ʼʼ বলছিলেন আগন্তুক অতিথি ওরফে রিড ওয়াগনার। এখনো অবধী তাঁর সঠিক পরিচয় আমরা পাইনি, শুধু জানি কোনো এক বিশেষ উদ্দেশ্যে তিনদিন ধরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এই জঙ্গলের পথে উদ্দেশ্যহীনের মতো ছুটে চলেছেন সুবাং শহরের দিকে। ওঁর সারা শরীরে অজস্র ক্ষত, বাম হাঁটুতেও একটা গভীর ক্ষত তৈরী হয়েছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো ফার্স্ট এইড দিয়েছি ওঁকে। রোজারিও নরম পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, "আপনি সব কিছু খুলে না বললে আমরা কীকরে আপনাকে হেল্প করবো বলুন তো!ʼʼ ওয়াগনার মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, "প্রফেসর রোজারিও, আমি আপনার নাম বহুবার শুনেছি। আই থিঙ্ক, ঈশ্বরের অসীম কৃপায় আমি সঠিক লোকেরই দেখা পেয়েছি। দেখুন, আমি স্যার ভিক্টর মরগ্যানের পারশোন্যাল অ্যাসিস্ট। আপনি নিশ্চয়ই তাঁকে চেনেন।ʼʼ আমরা দুজনেই একসাথে বলে উঠলাম, "ভিক্টর মরগ্যান!ʼʼ শুধু রোজারিও নয়, আমিও তাঁর নাম অনেক শুনেছি। একজন বিশিষ্ট অভিযাত্রী ও ট্রাইব বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভিক্টর মরগ্যান অত্যন্ত পরিচিত নাম। রোজারিও বিস্ময়ের সাথে বললেন, "হ্যাঁ, ভিক্টর আমার বন্ধু ছিলো ইউনিভার্সিটিʼতে। আমি লাস্ট তার খবর পেয়েছিলাম বছরখানেক আগে, সে জাভায় কি যেন একটা গবেষণার কাজে এসেছে; না?ʼʼ রিড একটা বড় দম নিয়ে বললেন, "হ্-হহ্যাঁ। উনি সবচেয়ে ছোটো মাপের আইমিন খর্বাকৃতি ট্রাইব খুঁজে বেড়াচ্ছেন এখানে....এই জাভার জঙ্গলে।ʼʼ আমি এবার একটু অবাক গলায় বললাম, "খর্বাকৃতি বামন ট্রাইব? কিন্তু সে তো আফ্রিকার পিগমি বলে শুনেছি। এখানে কিকরে...?ʼʼ রিড দুʼদিকে মাথা নেড়ে বললেন, "না না। পিগমি তো চার-সাড়ে চার ফুট, স্যার খুঁজছিলেন আরো খর্বাকৃতি ট্রাইবেল। আর এই সুন্দা, সুমাত্রাতেই নাকি ওই বামন ট্রাইবদের দেখা মেলে।ʼʼ আমি আরো অবাক হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই রোজারিও বললেন, "হ্যাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি কি বলতে চাও তুমি। হোমো ফ্লোরেনসিয়েসিস! প্রাচীন ইন্দোনেশিয়ান মাইথোলজিতে পাওয়া যায় এই জাভার ফ্লোরেস দ্বীপে এক ছোট্ট মানুষদের কথা, যাকে মানুষ ক্রিপটিড হিসেবেই জানে। কিন্তু কয়েকবছর আগে ফ্লোরেসের লিয়াং বুয়া গুহায় নৃতত্ত্ববিদরা কয়েকটি ছোট্ট ছোট্ট মানুষের কঙ্কাল খুঁজে পায়, যার মাপ বড়জোড় তিনফুট। বিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে সত্তর আশি হাজার বছর বা তারও আগে এই দ্বীপে ওই ছোট্ট ধীবর মানুষেরা থাকতো। তাই তো?ʼʼ রিড মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন, "কিন্তু আমার সমস্যা অন্য প্রফেসার রোজারিও! স্যার আজ একহপ্তা হলো একটা অদ্ভুত রোগে ভুগছেন.....। কি ধরণের প্লেগ জানিনা; তবে স্যারকে বাঁচানো দরকার। আর...তার জন্য স্যারকে শহরে নিয়ে যেতেই হবে। কিন্তু আমি কীকরে একা....!ʼʼ "কিন্তু ওঁর অসুখটা কি?ʼʼ প্রশ্ন করলাম আমি। রিড দুটো আঙুল দিয়ে নিজের কপাল টিপে ধরে দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, "সেটা তো বুঝতে পারছিনা মি.চৌধুরী! আজ দুʼহপ্তা ধরে রোজ রোজ জ্বর সারাদিন, সবসময় টেন্টে শুয়ে জ্বরের ঘোরে ভুল বকছেন; সারা গায়ে খুব বড় বড় কার্বাঙ্কলের মতো বেড়োচ্ছে রোজ রোজ। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা!ʼʼ রোজারিও ভ্রু কুঁচকে বললেন, "কার্বাঙ্কলের মতো! কোনো অ্যালার্জিটিক গুটি মনে হচ্ছে আমার!ʼʼ রিড বললেন, "কিন্তু রোজই চার-পাঁচটা করে নতুন গজাচ্ছে যে!ʼʼ আমি বললাম, "কিন্তু....আগের গুলো শুকিয়ে যাচ্ছেনা? বা বসে যাচ্ছেনা?ʼʼ রিড কিছুক্ষণ চুপ করে আমার দিকে চেয়ে থেকে মাথা নীচু করে বললেন, "নাঃ! সেটা বোঝার উপায় নেই, কারণ স্যার ছুরি দিয়ে ওগুলো কেটে ফেলেন।ʼʼ"কি???ʼʼ রোজারিও আর আমি একসাথে বলে উঠলাম। বলেন কি ইনি? রিড মাথানেড়ে বললেন, "হ্যাঁ প্রফেসার, আমি নিজে একদিন দেখেছি পর্দার আড়াল থেকে। কিন্তু গত পাঁচদিন আগে থেকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু হল!ʼʼ রিড একটু থেমে নিজের হ্যাভারস্যাক থেকে একটা বিয়ারের বোতল বের করে অল্প গলায় ঢেলে একটুক্ষণ দুʼচোখ বুজিয়ে দুদিকে মাথা নেড়ে আবার শুরু করলো, "মি. চৌধুরী; সেদিন রাতেও আমি টেন্টের ভেতর স্লিপিং ব্যাগে শুয়েছিলাম। বাইরে বেশ জোড়ে বৃষ্টি হচ্ছিলো ঝিপ ঝিপ করে, স্যারের টেন্টের পাশেই আমার টেন্ট। প্রায় ঘুমের আঠা জড়িয়ে এসেছে চোখে; হঠাৎ----বাইরে থেকে কুলিদের পেমিমপিন মানে সর্দ্দার নীচুগলায় ডাকলো আমাকে, ʼটুয়ান, টুয়ান! একবার বাইরে আসুন....টুয়ান।ʼ লোকটার গলা শুনে মনে হলো বেশ ভয় পেয়েছে, অথচ বাহামা পেমিমপিনরা অনেক বেশী নির্ভীক হয়। আমি তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে এলাম টেন্ট থেকে, দেখি চার-পাঁচজন কুলি জড়ো হয়েছে আমার টেন্টের সামনে। বললাম, ʼকি হয়েছে?ʼ পেমিমপিন ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চোখ বড় বড় করে ফিসফিস করে বললো, ʼশশশশ....টুয়ান! শুনুন।ʼ কান খাড়া করে শুনলাম....হ্যাঁ! শোনা যাচ্ছে বটে। স্যার কথা বলছেন ওঁর টেন্টের ভেতর, হয়তো জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছেন....কিন্তু নাঃ! তা নয়; বরং একটা অদ্ভুত শব্দ। মানে---ব্যাপারটা আপনাদের ঠিক বোঝাতে পারছিনা প্রফেসর; তবে টেন্টের ভেতর যেন স্যার দুʼরকম কন্ঠে কথা বলছেন! একটা স্যারের নিজস্ব গম্ভীর জেদী গলা, কিন্তু অন্যটা....একটা খুব সরু ফিসফিসে শিসের মতো কন্ঠস্বর। মানে---কোনো প্রবীণ মানুষই অতটা সরু কন্ঠস্বর করতে পারেননা; আর স্যারের কন্ঠস্বর তো যথেষ্ঠ গম্ভীর! খুব ভালো করে শুনলে বোঝা যায়, স্যার ডুয়েল পার্সোনালিটিতে কথোপকথন চালাচ্ছেন বাহাসা ভাষায়। আমি স্যারের জন্যই সামান্য কিছুটা বাহাসা ভাষা জানি, তাই কিছু কিছু শব্দের অর্থ বুঝলাম! যেমন মেনগুটুক, পেনাইহির, হান্টু, ডুকুন, মালাম বুলান। মানে; অভিশাপ, ডাকিনীবিদ্যা, প্রেতাত্মা, ওঝা, আর শেষরাতের চাঁদ! আর----এই কথাগুলো থেকেই বিদ্যুতের মতো মাসছয়েক আগের একটা ঘটনা আমার মাথায় খেলে গেলো।ʼʼ একটু থেমে বড় দম নিলেন রিড; আমাদের দুজনের চোখে মুখেই উৎকন্ঠা। রোজারিও বললেন, "কি ঘটনা?ʼʼ রিড একটা সিগার ধরিয়ে বললেন, "মাসছয়েক আগে..... ওই সময় আমরা ʼআস্কারি অফ গডʼ দ্বীপে ঘোরাঘুরি করছিলাম। ওই দ্বীপটায় সবসময় খুব সতর্ক থাকতে হয়, কারণ দ্বীপটা জংলী ট্রাইব্যালদের; ওর থেকে দুʼমাইল দুরেই ʼওরা আইল্যান্ডʼ। ʼওরাʼ দ্বীপের কোমোডো ড্রাগনদের ওরা ভগবান মনে করে, পুজো করে; সেই ঈশ্বরের রক্ষী হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেয়। আমরা ওই দ্বীপে ঘুরতে ঘুরতে তৃতীয় দিন সন্ধ্যার দিকে একটা পুরনো শিব মন্দিরের কাছে পৌঁছোলাম, স্যার ঠিক করলেন ওখানেই রাত কাটিয়ে দেবো। ওই দ্বীপে ইন্ডিয়ান দেবতা শিবের টেম্পল কীভাবে এলো, সেটা সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার। যদিও.....চতুর্দশ শতাব্দীতে হিন্দু রাজবংশ তারুমাঙ্গারা জাভায় রাজত্ব করেছিলো, আর ʼজাভাʼ অপভ্রংশ ʼজবাʼও ওদেরই নামকরণ; সেইসূত্রে হয়তো বা....। যাই হোক, সেদিন মধ্যরাতে হঠাৎ স্যার আমায় ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন; আমি ঘুম ভাঙতেই স্যার খুব সন্তর্পণে আমায় ওঁর পিছু পিছু বেড়িয়ে আসতে বললেন, আমি রিভলবার নিয়ে মন্দির থেকে বেড়িয়ে এসে চমকে উঠলাম! মন্দিরের বাইরে অগ্নিকুন্ড করে কয়েকজন আদিম ট্রাইব্যাল করছেটা কি? তারপর যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গেলো। একটা ছোট্ট জংলি ছেলেকে মাটিতে পোঁতা একটা খুঁটির সাথে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে ওরা, আর দূরে দাঁড়িয়ে একটি অদ্ভুত মুখোশ পরা লোক হাতে একটা হাড় আর একটা গরু বা এই ধরণের কোনো প্রাণীর করোটি নিয়ে বিড়বিড় করে বাহাসা ভাষায় কি যেন মন্ত্রোচ্চারণ করছে। স্যার ফিসফিস করে বললেন, ʼওয়াগন্যার, মনে হচ্ছে এই লোকটা ওদের ডুকুন অর্থাৎ ওঝা। কোনো তুকতাক করা হচ্ছে বোধহয়।ʼ স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই বন্য মানুষগুলো দ্রুত দুʼপাশে সরে গেলো বাচ্চাটার থেকে, আর----জঙ্গল ভেদ করে বিশাল চেহারার একটা কোমোডো বেড়িয়ে এলো; আর চোখের নিমেষে ওই বাচ্চাটাকে ঘৃণ্য ছুরির মতো দাঁতে ছিঁড়ে ফেললো। এতো বড় মাপের ড্রাগন আমি সত্যিই আগে কখনো দেখিনি, আমার মুখ দিয়ে এই নৃশংস দৃশ্য দেখে অজান্তেই একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো। স্যার চিরদিনই রক্তগরম মানুষ, চোখের সামনে এই বর্বর অন্যায় দেখে সরাসরি আকাশের দিকে রিভলবার তুলে একটা ফাঁকা ফায়ার করলেন; চমকে গেলো লোকগুলো। কুলিদের পেমিমপিন স্যারের পা জড়িয়ে ধরে বললো, ʼছেড়ে দিন টুয়ান, ছেড়ে দিন! ডুকুনরা সেটানের(শয়তান) পুজো করে, ছেড়ে দিন!ʼ কিন্তু স্যার ছাড়ার মানুষ নন, উনি ছুটে গেলেন ওদের দিকে, আরো দুটো ফাঁকা ফায়ার করলেন আকাশে। বর্বর মানুষগুলো সম্ভবত কখনো আগ্নেয়াস্ত্র দেখেনি, ওরা ছুটে পালালো তৎক্ষণাৎ! কিন্তু---ওঝা পালালোনা, স্যার লোকটাকে একধাক্কায় মাটিতে ফেলে ওর ওপর ফায়ার করে দিলেন হঠাৎ করে; আমাদের কুলিরা আঁতকে উঠলো ভয়ে! কিন্তু প্রফেসর....ওই মূহুর্তটা আমি কোনোদিনও ভুলবোনা। বুড়ো ওঝা মাটিতে বুক চেপে ধরে পড়ে গোঙাচ্ছে, বুক থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে হু হু করে! হঠাৎ----লোকটা বিষধর সাপের মতো চাউনিতে স্যারের দিকে তাকালো, কি ভয়ঙ্কর ঘা খাওয়া জন্তুর মতো দৃষ্টি আপনারা কল্পনা করতে পারবেননা! লোকটা ঘরঘরে গলায় ফিসফিস করে ভাঙা ভাঙা বাহাসা ভাষায় যা বললো, তা গুছিয়ে সাজালে হয়; ʼতোমার শরীরে শত শত প্রেতাত্না আশ্রয় নেবে। এই অভিশাপ তোমাকে সেদিন অবধী বহন করতে হবে ততদিন যতদিন না এক শেষরাতে পূর্ণিমার চাঁদের অস্তের সময় তোমার মৃত্যু ঘটে।ʼ উফঃ! আজো আমার কানে বাজে ওই কন্ঠস্বরটা!ʼʼ রোজারিও বললেন, "কিন্তু রিড....আপনি নিশ্চয়ই আমাকে এটা বিশ্বাস করতে বলেননা, যে ওই ওঝা বুড়োর অভিশাপের ফলে ভিক্টরের এই রোগের প্রাদুর্ভাব?ʼʼ রিড ভ্রু কুঁচকে বললেন, "আমি কিছুই বলছিনা, আমি শুধু আপনাদের হেল্প চাই প্রফেসর রোজারিও। যেভাবে হোক স্যারকে শহরে নিয়ে যেতেই হবে!ʼʼ আমি বললাম, "দেখুন মি.ওয়াগন্যার, আমরা নিজেরাও কিন্তু একটা বিশেষ ক্রিপটিডের সন্ধানে এসেছি এই অরণ্যে। আমরা আহুল অনুসন্ধান করছি এখানে.....!ʼʼ রিড একটা হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "বুঝতে পারছি। কিন্তু মি.চৌধুরী, আমি শুধুমাত্র আমার স্যারের প্রাণ রক্ষার জন্য তিনদিন ধরে উদ্দেশ্যহীনের মতো এই জঙ্গলের পথে ছুটে বেড়িয়েছি; সারা গায়ে অজস্র কাটা ছড়া, হাঁটুতেও যথেষ্ঠ ক্ষত পড়ে গিয়ে। আপনারা কি এটুকু হেল্প করবেননা আমাকে? দেখুন, আমি আপনাদের এমন একটা জিনিষ দেখাবো যেটা আপনাদের ইন্টারেস্ট জাগাবেই।ʼʼ রিড ওঁর হ্যাভারস্যাকের ভেতর থেকে দুটো বাদামী রঙের নারকোলে-কুল সাইজের গোল ফল বের করলেন। সেইদুটো প্রফেসর রোজারিওর হাতে দিয়ে বললেন, "দেখুন, এই দুটো আমি স্যারের টেন্টের ভেতরে পেয়েছি।ʼʼ রোজারিও ফলদুটো হাতে নিয়েই চমকে উঠলেন, একটা চাপা আর্তনাদের গলায় বললেন, "এ.....দুটো ফল নয়!! চৌধুরী; লুক অ্যাট দিজ!ʼʼ ওঁর হাতের জিনিষদুটোর দিকে চেয়ে....কি বলবো বাপ্পা; আমার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা বরফের কুচি গড়িয়ে নামলো! এতো অবাক আমি জীবনে কক্ষণো হইনি। ওদুটো কোনো ফল নয়----ছোটো ছোটো দুটো মানুষের মাথা! খুব ছোট্টো মাথাদুটোর ভেতর ছোট ছোট চোখ, কান, নাক সবই স্পষ্ট; এমনকি মাথার ওপর শোঁয়ার মতো চুলও কয়েকগাছা। আমি বললাম, "এ জিনিষ উনি কোথায় পেয়েছিলেন মি.ওয়াগন্যার?ʼʼ রিড দুʼদিকে মাথা নেড়ে বললেন, "জানিনা মি.চৌধুরী! স্যার প্রায়ই টেন্ট থেকে একা একা বেড়িয়ে যেতেন, ফিরতেন সন্ধ্যার মুখে; কোথায় যেতেন কী করতেন কিচ্ছু বলতেননা! একেক সময় দুʼদিন পরেও ফিরতেন, সম্ভবত-----তখনই কোথাও পেয়েছিলেন।ʼʼ রোজারিও দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন, "তারমানে....আহুল থাক আর না থাক, হোমো ফ্লোরেনসিয়েসিস নিশ্চয়ই আছে। রিড....!ʼʼ রিডের হাতদুটো চেপে ধরলেন রোজারিও; ঠোঁটের কোণে আলতো হেসে বললেন, "....আমরা আপনার সাথে যাবো। এই রহস্য সমাধান হওয়া প্রয়োজন; আর ভিক্টরকে সুস্থ করতেই হবে তার জন্য। তুমি কি বলো চৌধুরী?ʼʼ আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, "নিশ্চয়ই।ʼʼ
গলা অবধী একটা সাদা চাদর দেওয়া ভিক্টর মরগ্যানের, চোখদুটো বোজা। বাদামী ফ্রেঞ্চকাট দাড়িতে কিছুটা রুপোলি ছোঁয়া, তবে কি জানিস বিশু? ভদ্রলোকের স্বাস্থ্য কিন্তু খুব বেশী অবনতি ঘটেছে মনে হলোনা, দৃঢ় চিবুক একজন দক্ষ পর্টুগিজ অভিযাত্রীর পরিচয় দেয়। রোজারিও গায়ের চাদরটা সরালেন একটু, খালি গায়ে শুয়ে আছেন ভিক্টর; স্বাস্থ্য এখনো যথেষ্ঠ ভালো, বুকে হাতে পেটে ডুমো ডুমো মাংসপেশী। মানুষটার বুকের দুʼপাশে বেশ বড় প্রায় ছোটো খাটো ডিউইস বলের মাপের কালচে রঙের দুটো কার্বাঙ্কল গোছের ফোঁড়া বা টিউমার, পেটেও আরেকটু ছোটো মাপের আরেকটা। আমি অন্তত এতো বড় টিউমার বা কার্বাঙ্কল যাই হোক....কখনো দেখিনি। ভিক্টরের পাশে একটা হ্যাভারস্যাক, একটা স্যুপের বাটি আর চামচ, আর একটা বড়মাপের ছুরি রাখা। রোজারিও ছুরিটা তুলে নিয়ে বললেন, "এটা ওর কাছে রাখা যাবেনা। ভিক্টর যদি এই ফোঁড়া বা টিউমার ক্রমাগত কেটে ফেলতে থাকে, তাতে আরো বেশি সেপটিক হওয়ার সম্ভাবনা। হয়তো সেই কারণেই জ্বর আসছে; এটা এখন আপনার কাছে রাখুন রিড।ʼʼ হঠাৎ ভিক্টরের চোখদুটো খুলে গেলো, উনি আমাদের সামনে দেখেই কেমন চমকে উঠলেন চোখ খুলে। আতঙ্কিত মুখ করে ঘরঘরে গলায় বললেন, "কে-ক্কে তোমরা? কে?ʼʼ রোজারিও ওঁর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "ভিক্টর; লুক অ্যাট মি। লুক লুক! তুমি আমাকে চিনতে পারছোনা? আমি রোজারিও; রোজারিও। এরিক রোজারিও; মনে পড়ে? আমরা একসাথে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি।ʼʼ ভিক্টর মরগ্যানের মুখের পেশিগুলো নরম হয়ে এলো, মনে হলো ওঁকে চিনতে পেরেছেন। ফিসফিস করে বললেন, "রো....রোজারিও!! তুমি! হা ঈশ্বর.....তুমি সঠিক মানুষকেই আমার কাছে পাঠিয়েছো.....। রোজারিও.......রোজারিও; আমার হাতে আর বেশিক্ষণ নেই! আমার শরীরটা অজস্র হান্টু(প্রেত) আশ্রয় করেছে.....। ডুকুনের শেষ মেনগুটুক(ওঝার শেষ অভিশাপ).....! ডুকুনের.....শেষ......মেনগুটুক!ʼʼ ভিক্টরের চোখদুটো আবার বুজে গেলো ধীরে ধীরে। রোজারিও দুʼদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে ক্লান্ত স্বরে বললেন, "রিড, আমরা----পাশের টেন্টে থাকবো। ভিক্টর কথা শুরু করলেই আপনি অবশ্যই আমাদের খবর দেবেন।ʼʼ আমরা ধীরপায়ে বেড়িয়ে এলাম টেন্ট থেকে, একটুক্ষণ আগেও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো; এখন আকাশে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে জল ঝরে পড়ছে, মাঝে মাঝে দূের কোনো গােছ ʼস্পটেড আউলʼ ডেকে উঠছে। আমরা নিজেদের টেন্টে এসে বসলাম, রোজারিও বললেন, "আজ রাতে ঘুমোনো হবেনা চৌধুরী। সজাগ থাকা জরুরী।ʼʼ আমি বললাম, "আচ্ছা রোজারিও, আপনার কি মনে হয়? ভিক্টর হঠাৎ ওই কথাগুলো বললেন কেন? ওঁর রোগটাই বা আসলে কি?ʼʼ রোজারিও ভ্রু কুঁচকে বললেন, "জানিনা চৌধুরী। তবে মনে হয় খুব শিগগিরই এর কিনারা করতে পারবো কিছুটা। আচ্ছা চৌধুরী, তোমার ওই ছোট্ট মাথাদুটো সম্পর্কে কি মত বলোতো?ʼʼ আমি একটুক্ষণ ভেবেও বিশেষ কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারলামনা, বললাম, "বুঝতে পারছিনা রোজারিও। আপনার কি মত?ʼʼ রোজারিও স্টোভে কফি চাপিয়েছিলেন, বললেন, "আমিও জানিনা। তবে একটা সন্দেহ হয়, কিন্তু....এক্ষুণি কিছু বলবোনা।ʼʼ রাত বাড়ছিলো, আমাদের তিনপ্রস্থ কফিপর্ব হয়ে গেলো। এর মধ্যে একবার টেন্টের গা ঘেঁষে ভারী পায়ে কোনো প্রাণীর ছুটে যাওয়ার শব্দ হলো, রোজারিও বললেন টাপির। টাপির কি জানিস তো? ছোট্ট শূঁড়ওয়ালা বিরাট চেহারার একপ্রকার শূকরের মতো প্রাণী, এমনিতে খুব নিরীহ। যাই হোক, আমরা মধ্যরাত অবধী প্রায় জেগে রইলাম; কিছুই হলোনা। শেষরাতের দিকে একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিলো আমার, হঠাৎ-----রোজারিওর ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো, "চৌধুরী, ওঠো। ওঠো, শোনো!ʼʼধড়মড় করে উঠে বসতেই রোজারিও ফিসফিস করে বললেন, "শ শ শ.....! শুনতে পাচ্ছো?ʼʼ কান খাড়া করে শুনলাম, হ্যাঁ; একটা খুব আলতো কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে বটে। ভিক্টরের টেন্ট থেকেই কি? হ্যাঁ.....ওখান থেকেই! কিন্তু----একি?? একি শুধুই ভিক্টর মরগ্যানের কন্ঠ? নাকি দুজনের কন্ঠ? ভিক্টরের ধমকের সুরে বাহাসা ভাষায় ফিসফিস করে কথার উত্তরে একটা কাটা কাটা শিসের মতো হিসহিসে খুব সরু কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছেনা? রোজারিওর দিকে চেয়ে দেখলাম, ওঁর কপালে গলায় ঘাম জমেছে বিন্দু বিন্দু; ভ্রু কোঁচকানো। বড় টর্চʼটা হ্যাভারসেক থেকে বের করে হাতে তুলে নিয়ে বললাম, "আসুন, বাইরে যাই।ʼʼ আমরা বাইরে বেড়িয়ে এলাম; মেঘমুক্ত আকাশে ফটফটে জ্যোৎস্না, যা ইন্দোনেশিয়ার আকাশে বিরল। চাঁদটা পশ্চিম আকাশে ঢলে এসেছে; বাইরে এসে দেখলাম বাকি টেন্ট থেকে কেউ বেড়িয়ে আসেনি, এমনকী রিডও নয়। সারাদিনের পরিশ্রমে সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলো; রোজারিও বললেন, "টর্চটা বন্ধ করে দাও চৌধুরী, এসো এদিকে।ʼʼ আমরা ভিক্টর মরগ্যানের তাঁবুর পর্দা সরিয়ে উঁকি দিলাম, সব অন্ধকার; শুধু স্পষ্ট ফিসফিসে বাহাসা কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি। ভিক্টর নিজের কন্ঠে বললেন, "আ.....আমি আর সহ্য করতে পারছিনা! আমার মুক্তি কখন?ʼʼ তারপরেই সেই হিসহিসে শিসের মতো কন্ঠে উত্তর, "আর বেশিক্ষণ নয়, আপনার শেষ মূহুর্ত উপস্থিত টুয়ান।ʼʼ আমি ফিসফিস করে বললাম, "কি হচ্ছে বলুন তো রোজারিও? ভিক্টর ডুয়েল পার্সনালিটিতে কথা বলছেন?ʼʼ রোজারিও বললেন, "এ কিছুতেই ভিক্টরের কন্ঠ হতে পারেনা, যা হয় হোক; টর্চ জ্বালো চৌধুরী।ʼʼ টর্চের সুইচ টিপে দিলাম সাথে সাথে, আর তক্ষুণি যা দেখলাম তা তোরা কল্পনাও করতে পারবিনা বাপ্পা! আমি এতো ভয় জীবনে কক্ষণো পাইনি; আমার রক্ত যেন শরীরের ভেতর জল হয়ে গেলো একমূহুর্তে! ভিক্টর মরগ্যানের গায়ের চাদরটা খোলা; আর সন্ধ্যায় যে টিউমার গুলো দেখেছিলাম, সেগুলো আসলে ছিলো খুব ছোট্ট ছোট্ট মানুষের মাথা। এখন সেই বীভৎস জীবগুলো বেড়িয়ে আসছে ভিক্টরের শরীর ফুঁড়ে, ওদের পিঠের শিরদাঁড়া অবধী স্পষ্ট! ঘৃণ্য কালো রঙের সরীসৃপের মতো তিনটি মানুষের কোমর অবধী এখন দেখা যাচ্ছে, ওরা ধীরে ধীরে উঠে আসছে। ভিক্টর ফিসফিস করে বললেন, "আমায় কি সেতান ক্ষমা করবেন?ʼʼ বুকের কাছের সরীসৃপটা ওর ছোট্ট লাল টকটকে একটা বীভৎস জিভ বের করে বললো, "যতদিন আকাশে বুলান উঠবে, কোটি কোটি তারা থাকবে; ততদিন ক্ষমা পাবেননা টুয়ান!ʼʼ ভিক্টর মরগ্যান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলেন, ওঁর মাথাটা হেলে গেলো একদিকে; বোঝাই যায় ওঁর দেহের শেষ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে গেলো। রোজারিও বোধহয় আর সহ্য করতে পারলেননা, ওঁর রিভলবারটা তুলে ধরলেন ওই ঘৃণ্য সরীসৃপের মতো প্রাণীগুলোর ওপর। ঠিক তখনই----আমাদের চমকে দিয়ে রোজারিওকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উন্মাদের মতো টেন্টের ভেতর ছিটকে ঢুকে এলেন রিড, আর এলোপাথাড়ি তীক্ষ্ম ছুরিটা চালিয়ে দিলেন তিনটে বীভৎস প্রাণীর ওপর; কালো থকথকে রক্ত ছিটকে গেলো এদিক ওদিক। রিড হাঁটুগেড়ে বসে পড়লেন ভিক্টরের দেহের পাশে, তারপর আমাদের অবাক করে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ওঁ। ভিক্টরের মাথার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে জড়ানো গলায় বারবার ডাকছিলেন, "স্যার, স্যার!!ʼʼ রোজারিও মাথা নিচু করে বেড়িয়ে এলেন টেন্টের ভেতর থেকে, তাঁর পেছন পেছন আমিও। আকাশে আবার মেঘ জমে উঠেছে, বৃষ্টি নামবে এক্ষুণি।
গল্প শেষ করে আরেকটা সিঙাড়া তুলে নিলো বিবেকদা। দেওয়ালে একটা পেটমোটা টিকটিকি একটা উচ্চিংড়েকে অনেকক্ষণ থেকে টার্গেট করছে, সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মন্টে বললো, "তাহলে ডুকুনের অভিশাপই সত্যি হলো। কিন্তু সেই তিনটে শরীর কোথায় গেছিলো বিবেকদা?ʼʼ বিবেকদা বললো, "ওই তিনটে রোজারিওর বাড়িতেই আছে; ওয়্যাটস অ্যাপে ফটো পাঠাতে বলবোʼখন।ʼʼ
___________
অলঙ্করণ- পুষ্পেন মণ্ডল
Sundar laglo😀tobe online charao boi akareo chai 😀
ReplyDelete